
এগ্রিকেয়ার ডেস্ক: আর কিছুদিন পরই শুরু হবে আমের মৌসুম। ইতিমধ্যে গাছে মুকুল এসেছে, কোথাও কোথাও ছোট ফলও ধরেছে। কিন্তু এমন সময়েও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক আমগাছ কেটে ফেলছেন চাষিরা। তাঁদের দাবি, সড়কে অতিরিক্ত টোল আদায় ও পরিবহন জটিলতায় আমের ন্যায্য মূল্য পান না। এ কারণে অনেকেই আমগাছ কেটে বিকল্প ফল বা সবজি চাষের পরিকল্পনা করছেন।
খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে গোলাবাড়ি ইউনিয়নের তুন্যমাছড়া গ্রাম। সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার আমগাছ লাগিয়েছিলেন জ্ঞান জ্যোতি চাকমা। মৌসুম এলেই তাঁর বাগান ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো। শ্রমিকদের ব্যস্ততা, পাইকারদের আনাগোনা আর আমবোঝাই ঝুড়িতে সরগরম থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু এবার তিনি বাগানের একটি অংশের গাছ কেটে ফেলেছেন।
সম্প্রতি তাঁর বাগানে গিয়ে দেখা গেছে, একের পর এক আমগাছ কাটছেন তিনি। বাগানে রাংগুই, আম্রপালি, বারি–৪সহ বিভিন্ন জাতের আমগাছ রয়েছে। তিনি জানান, ইতিমধ্যে ১ হাজার ২০০টি আমগাছ কেটে ফেলেছেন। তাঁর ভাষায়, আম পরিবহনের সময় টোল আদায়ের নামে জেলা পরিষদের চাঁদা, বাজার ফান্ড, পৌরসভার বিভিন্ন সড়কে টোল—সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে লাভ তো দূরের কথা, এখন খরচই ওঠে না। এর ওপর বাজারেও ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়েই অনেক আমবাগান মালিক গাছ কেটে ফেলছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জেলায় ৪ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। চলতি বছরের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। গত বছর জেলায় ৬২ হাজার ১৭৯ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়েছিল। পাহাড়ি ঢাল ও সমতল মিলিয়ে গত এক যুগে খাগড়াছড়িতে আম চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে রাংগুই ও আম্রপালি জাতের আমের চাষ বেশি।
বাগানমালিকদের দাবি, সার, কীটনাশক, সেচ, পরিচর্যা ও শ্রমিকের মজুরিসহ সব ধরনের উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। আগে যেখানে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ছিল ২০০ থেকে ৪০০ টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়। দুর্গম এলাকার কারণে শ্রমিকসংকটও দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত টোল। এসব কারণে ধীরে ধীরে অনেকেই আমের বাণিজ্যিক চাষ কমিয়ে দিচ্ছেন।
পেরাছড়া এলাকার বাগানমালিক মিত্র চাকমা বলেন, তাঁর বাগানে প্রায় ১০০টি রাংগুই আমগাছ ছিল। কয়েক বছর ধরে বাগান থেকে শ্রমিকদের মজুরিও ওঠে না। মৌসুম শেষে হিসাব করলে ঋণই বাড়তে থাকে। তাই অনেকটা অভিমান করেই গাছগুলো কেটে ফেলেছেন।
চলতি বছরের আমের মৌসুম এখনো শুরু হয়নি। তাই এ বছরের টোল আদায়ের হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে গত বছরের টোলের চিত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, খাগড়াছড়ি থেকে অন্য জেলায় আম পরিবহনের সময় পৌরসভা একবার টোল আদায় করে। তারা প্রতি ক্রেট (২০ থেকে ২২ কেজি) আমে ১০ টাকা করে নেয়। সে হিসাবে দুই হাজার কেজি আমবাহী একটি পিকআপে টোল দিতে হয় প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা।
পৌরসভার টোলের পর জেলা পরিষদকেও টোল দিতে হয়। জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বাজার ফান্ড’ চেঙ্গী সেতু এলাকায় রসিদ কেটে প্রতি ক্রেট আমে ১০ টাকা করে আদায় করা হয়। এখানেও দুই হাজার কেজি আমবাহী পিকআপে টোল দিতে হয় ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। একই সংস্থা খাগড়াছড়ি জেলা থেকে বের হওয়ার মুখে রামগড় সোনাইপুল ও মানিকছড়ির গাড়িটানা এলাকায় আবার টোল আদায় করে। সেখানে গাড়িপ্রতি নেওয়া হয় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠনও চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেয়।
বাগানমালিকদের অভিযোগ, আম পরিবহনের পথে একাধিক স্থানে টোল দিতে হয়। জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও বাজার কমিটি বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায় করে। এতে পাইকারদের খরচ বেড়ে যায় এবং সেই চাপ শেষ পর্যন্ত চাষিদের ওপর পড়ে। ফলে বাগান থেকেই কম দামে আম বিক্রি করতে বাধ্য হন তাঁরা।
মরাটিলা এলাকার চাষি সত্যজিৎ ত্রিপুরা বলেন, তাঁর বাগান দুর্গম এলাকায় হওয়ায় সেখান থেকে আম শহরে নিতে পরিবহন খরচই বেশি পড়ে। এর ওপর পৌরসভা ও বাজার ফান্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় অতিরিক্ত টোলের কারণে গত ছয়–সাত বছর ধরে ব্যবসায়ীরা সহজে আসতে চান না। কেউ এলেও দাম কম বলেন।
খাগড়াছড়ি বাগান মালিক সমিতির উপদেষ্টা অনিমেষ চাকমা বলেন, জেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যে পরিমাণ টোল আদায় করা হয়, দেশের অন্য কোথাও তা দেখা যায় না। এতে আমবাগানের মালিকেরা প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। এসব চাঁদা ও টোলের বিরুদ্ধে আগে মিটিং–মিছিল, সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন ও স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। তাই অনেক চাষি গাছ কেটে ফেলছেন।
প্রতি মৌসুমে খাগড়াছড়ির আমবাগানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজারো শ্রমিক। এ ছাড়া পরিবহনকর্মী, ঝুড়ি ও কার্টুন ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র দোকানদারসহ অনেকেই এ চাষের ওপর নির্ভরশীল। গাছ কমে যাওয়ায় তাঁরাও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। মরাটিলা এলাকার তৈফা ত্রিপুরা বলেন, আমের মৌসুমে বাগানে কাজ করে পরিবার চালানোর একটি বড় সুযোগ পাওয়া যায়। বাগান কমে গেলে মৌসুমি এই আয়ও বন্ধ হয়ে যাবে।
খাগড়াছড়ি বাজারের মৌসুমি ফল ব্যবসায়ী আবদুল মালেক বলেন, সঠিক সংরক্ষণাগার, গ্রেডিং ও প্যাকেজিং সুবিধা গড়ে তোলা গেলে খাগড়াছড়ির আম দেশের বড় শহরগুলোতে, এমনকি রপ্তানি বাজারেও জায়গা করে নিতে পারত। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রতি মৌসুমেই অনলাইনে আম বিক্রি করেন মো. মেহেদি ও উখ্যামং মারমা। তাঁদের মতে, খাগড়াছড়ির আমের মান ভালো এবং স্বাদও আলাদা। তবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এর সঙ্গে টোলের চাপও বাড়তি সমস্যা তৈরি করে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, কৃষকেরা গাছ কাটছেন—এমন তথ্য কৃষি বিভাগের কাছে নেই। কোনো কৃষক সহযোগিতা চাইলে তাঁদের গাছ না কাটার পরামর্শ দেওয়া হতো। গাছের নিচের ফাঁকা জায়গায় কী চাষ করা যায়, সে বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হতো। এরপরও যাঁরা গাছ কেটেছেন, তাঁদের খোঁজ নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, চাঁদা বা অতিরিক্ত টোল আদায়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অতীতেও টোলকেন্দ্রগুলোতে অভিযান চালানো হয়েছে এবং সামনে মৌসুমেও তা অব্যাহত থাকবে।
























