মেহেদী হাসান, নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী: রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে করোনা ইউনিটে ১ জুন থেকে ১৫ জুন সকাল ৮টা পর্যন্ত ১৫ দিনে মারা গেছেন ১৪৮ জন মানুষ। দীর্ঘ হতে দীঘতর্র হচ্ছে মৃত্যুর এ মিছিল। মহামারিতে এ অঞ্চলের জীবন জীবিকার সবচেয়ে বড় উৎস আমে আঘাত হেনেছে। এ যেন, কবরস্থানের পাশে আমের ঝুড়ি!

প্রতিবছর অর্ধকোটি টাকার আম কেনা-বেচা করেন জাইদুল ইসলাম। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, বগুড়াসহ দেশের অন্তত ১০টি স্থানে আম পাঠান তিনি। এবার করোনায় ব্যবসায় মন্দা। জীবনের মায়া কার না আছে? ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে শুধুমাত্র সিলেটে ও ঢাকায় আম পাঠিয়ে কোনমতে ইজ্জত রক্ষা করছেন বলে জানান আম ব্যবসায়ী ।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমের হাট বানেশ্বর। প্রতিবছর এখান থেকে আম কিনে ট্রাকযোগে পাঠান সিলেটে। ইবনে সিনা কোম্পানির প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে পৌঁছে ল্যাংড়া ও হিমসাগর আম। কোন পাইকার বা আড়তদারের কাছে আম বিক্রি না করে কৌশলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে দিলে বেশ লাভ করা যায়। ঢলনের প্রতিমণে ৬-৮ কেজি বেশি পাওয়া আমের দাম যোগ করে পুষিয়ে যায় বেশ।

জাইদুল ইসলাম এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে বলেন, “মরনের ভয় সবারই আছে। গতবছর থেকে কখন আতঙ্কে থাকতে থাকতে এখন খুববেশি ভয় লাগেনা। আমি আর আমার জামাই প্রতিবছর ৫০ লাখ টাকার বেশি আম কেনা-বেচা করি। এবার কিছুটা কম হবে। নিজেই ঝুঁকি নিয়ে বানেশ্বর বাজারে ঘর নিয়েছি। ব্যবসার ধরন পাল্টেছে। অনলাইনে আমের চাহিদা বেশ ভালো। বাইরের যেসব ব্যবসায়ীরা আসতেন তাদের বেশিরভাগ আসছেন না এবার। তবে, স্থানীয়দের মধ্যে নতুন ব্যবসায়ী হয়েছে; যারা বাইরে পুরাতন ব্যবসায়ীদের কাছে আম পাঠাচ্ছেন।”

তিনি আরো বলেন,“ মার খাচ্ছে বাগানমালিকরা। ল্যাংড়া ২ হাজার টাকা তাক করে বাগান কিনে এখন ১২’শ থেকে ১৩’শ টাকা, হিমসাগর গতবারে ২৮’শ টাকা মণ বিক্রি করলেও এবার ভালো আমের দাম ১৬’শ থেকে ১৮’শ টাকা। বাগান কিনে ধরা খেয়েছেন প্রায় সব ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা মার খাওয়ায় বাগানমালিকদের চুক্তির টাকা কম দিচ্ছে। সব মিলিয়ে করোনা একেবারে এবারেও একহাত দেখিয়ে দিলো।”

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ জেলায় চলতি মৌসুমে ৭৬ হাজার ২৮৭ হেক্টর আম বাগান রয়েছে। আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে ৭ লাখ ৯০ হাজার ২৬২ মেট্রিন টন। উৎপাদন ছাড়িয়ে যেতে পারে ৮ লাখ টন। এ আমের বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ছাড়িয়ে। আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে সর্বাধিক সাড়ে ৩ লাখ মেট্রিক টন আমের উৎপাদন হয়েছে বলে জানান কৃষি বিভাগ।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সিরাজুল ইসলাম এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে জানান, এবার আমের উৎপাদন ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গুনগত মানও ভালো। রাজশাহীর আম এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। সেই সঙ্গে অনলাইনে কেনাবেচাও বেড়েছে। তবে করোনার কারণে অন্যান্যবারের চেয়ে দাম কম পাচ্ছে চাষীরা। এ অবস্থায় বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে কি না? এটা নিয়ে সংশয় আছে।

কথা হয় আমব্যবসায়ী বারিউল হক, জাকিরুল ইসলাম, সাহেব আলীর সাথে। যারা প্রত্যেকেই লাখ লাখ টাকার আম কেনা-বেচা করেন। তারা বলছেন, আমে করোনার প্রভাব প্রকট। বাইরের আম ব্যবসায়ীরা যদি উন্মুক্তভাবে আম কিনতে আসতেন তাহলে আমের এমন দাম থাকত না। আগের বছরের তুলনায় প্রতিমণে নাই হয়ে গেছে ১ হাজার থেকে ১২’শ টাকা। এবার ল্যাংড়া আম ১৪’শ থেকে ১৬’শ টাকা দরে যা গতবছর ২৪’শ থেকে ২৮ ’শ টাকা দরে বিক্রি করেছি। গোপাল ভোগ ১৬’শ থেকে ১৮ ’শ টাকা দরে; যা গত বছর বিক্রি হয়েছে ২৬ থেকে ২৮’শ টাকা। ক্ষিরসাপাত ১৬ ’শ থেকে ১৮ বিক্রি হচ্ছে। গতবছর বিক্রি হয়েছে ২২’শ থেকে ২৪’শ টাকা দরে। এছাড়াও লখনা ৬’শ থেকে ৮’শ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যা গতবছর বিক্রি হয়েছে ১২’শ থেকে ১৪ ’শ টাকা দরে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ এই চার জেলার হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস আম।করোনা সংক্রমণ রোধে দফায় দফায় লকডাউন দেওয়ার কারণে দেশের অন্য এলাকার ব্যাপারীরা আসতে পারছেন না। অন্যদিকে সংক্রমণের ভয়ে আমপাড়া শ্রমিক পেতেও সমস্যা হচ্ছে। বানেশ্বর হাট ঘুরে দেখা যায়, চাষিরা আম আনলেও অভাব ক্রেতার। ফড়িয়া ও দালালরা কিছু আম কিনলেও দাম কম পাচ্ছেন চাষি ও বাগানিরা। প্রতিবছর আমের মৌসুমে দৈনিক সাড়ে পাঁচ’শ থেকে ৬’শ ট্রাক আম চালান হতো দেশের বিভিন্ন স্থানে। এবার এ সংখ্যা ৩০০ ট্রাকেরও কম। প্রশাসন থেকে আম সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যাতায়াতের বিষয়ে ছাড় দেওয়া হলেও কোথায় যেন একটা ফাঁক পড়ে রয়েছে!

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের উপ-পরিচালক কেজেএম আব্দুল আউয়াল এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে বলেন, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে ১৭ হাজার ৯৪৩ হেক্টর জমিতে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর ১৭ হাজার ৫৭৩ হেক্টর জমিতে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। বেড়েছে ৩৭৩ হেক্টর জমি। আম উৎপাদন হবে সম্ভাব্য ২ লাখ ১৯ মেট্রিকটন। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে হেক্টর প্রতি ১১ দশমিক ৯৫ মেট্রিক টন। প্রায় হাজার কোটির টাকার আম বিক্রি হওয়া সম্ভবনা রয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সমস্যা হবে না বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

এগ্রিকেয়ার/এমএইচ