
নিজস্ব প্রতিবেদক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের বড় হাওরে আগাম জাতের ব্রি-২৮ ধানে ব্যাপক চিটা দেখা দিয়েছে। ধানের জমিতে দুই-তৃতীয়াংশ চিটা দেখে হতাশ চাষিরা। এটি মূলত চাষিদের ধানের জাত নির্বাচন ও রোপনের ভুলের কারণেই এমনটি হয়েছে বলে দাবি কৃষি বিভাগের। তারা বলছেন, প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধান চিটা হয়ে গেছে।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য, জানুয়ারি শুরুর এক সপ্তাহ পর ব্রি-২৮ ধান রোপণ করা উচিত। আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে ধানের স্বাভাবিক পরাগায়ন যাতে ব্যাহত না হয় সেজন্য এ পরামর্শ দেওয়া। এছাড়া ব্রি-২৮ ধান জাত পুরনো হয়েছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্তের হার বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে নেক ব্লাস্টের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। চাষিরা কৃষি বিভাগের পরামর্শ ছাড়াই এ ধান রোপন করেছে ফলে এ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও অফিস প্রধান ড. মো: ফজলুল ইসলামের সাথে। তিনি এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে বলেন, হাওরের ফসল ফলানো মূলত ‘জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ’ এরকম। কৃষকরা যদি সময়ের আগে ধান রোপন করে তাহলেও চিটা হয়ে যায় আবার পরে রোপন করলে পানিতে তলিয়ে যায়। এক্ষেতে কৃষকদের সঠিক সময় ও জাত নির্ধারণ করা একান্ত জরুরি।
তিনি বলেন, হাওরের জন্য ব্রি-২৮ ও স্বল্প মেয়াদী ধান রোপন করতে হবে। ধানের থোড় বের হওয়ার সময় যদি রাতের তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রির কম হয় তাহলে ধান চিটা হয়ে যায়। আবার ধানের ফুল ফোটা/ শীষ সম্পন্ন হওয়ার সময় যদি অতিরিক্ত তাপমাত্রার কবলে পড়ে অর্থ্যাৎ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয় তাহলে ঐ সময়ে বের হওয়া সব ধান চিটা হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে ধানের চারার বয়স ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে রোপন করতে হবে।
অষ্টগ্রামের অনেক কৃষক কৃষি কার্যালয়ের এসব বার্তা শোনেননি। ফলে ব্রি-২৮ ধান লাগানো উপজেলার তিন ভাগের দুই ভাগ জমিতে চিটা হয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অষ্টগ্রামে এবার বোরোর আবাদ হয়েছে ২৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ব্রি-২৮ ধানের জমির পরিমাণ ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর। এর মধ্যে অন্তত আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধানে কমবেশি চিটা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো কোনো জমির ধান নেক ব্লাস্ট রোগে সংক্রমিত হয়েছে।
ব্যাপকভাবে ফসল হারিয়েছেন এমন অধিকাংশ কৃষকের ধান রোপণের সময়-সংক্রান্ত জটিলতা আছে। আবার যেসব জমিতে চিটা নেই, তার সব কটির পেছনের গল্প সময়মতো রোপণ ও সঠিক পরিচর্যা। প্রতি হেক্টর জমির ব্রি-২৮ ধানের স্বাভাবিক ফলন ছয় থেকে সাত টন। ধারণা করা হচ্ছে, চিটার কারণে অন্তত পাঁচ হাজার টন ফসল কম হতে পারে। এখন চিটার আধিক্যের কারণ হিসেবে কৃষি বিভাগও সময়ের ব্যাপারটিকে সামনে আনছে।
কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, ব্রি-২৮ আগাম ধান। অন্য জাতের ধান চাষে ১৫০ দিন লাগলেও ব্রি-২৮ ধান ১৩৫ দিনেই কাটা যায়। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী জমির কৃষকেরা এ ধান চাষ করেন। উজানের ঢল বা নদীর পানি বেড়ে গেলে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। সেই কারণে আগে রোপণ করে ফলন আগে ঘরে তোলার জন্য ব্রি-২৮ আদর্শ।
তবে এ ধান স্পর্শকাতরও। বীজতলা থেকে শুরু করে রোপণ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি সময় ধরে ধরে সম্পন্ন করতে হয়। ব্যতিক্রম হলে ফলন কমে যায়। এবার বীজতলা করতে ১৫ থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা দিয়েছিল কৃষি বিভাগ। আর রোপণের সময় বলা হয়েছিল, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের পর থেকে। এক সপ্তাহ পর থেকে ব্রি-২৮ ধান পুরোদমে কাটা শুরু হবে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কৃষকদের আগাম ধান রোপণের দুটি প্রধান কারণ ছিল। প্রথমত বীজতলা থেকে রোপণ পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানির অভাব। পানির মাধ্যম সেচ। উৎস খাল, বিল, নদী। এবার নভেম্বরের শুরু থেকে হাওরের পানি দ্রুত শুকাতে শুরু করে। সম্ভাব্য সেচ দুর্ভোগ কমাতে অনেক কৃষক আগাম বীজতলা ও রোপণ দুই-ই করে ফেলেন। যেসব কৃষক আগাম ধান রোপণ করেছেন, তাঁদের জমিতে চিটা হয়েছে বেশি।
হাওরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে। ব্রি-২৮ ধানের জন্য দিনে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩৪ আর রাতে ১৮ ডিগ্রি সহনীয়। কিন্তু এবার দিনের তাপমাত্রা ঠিক থাকলেও রাতে কমে যেত। কখনো কখনো কুয়াশা পড়ত। এ ধরনের আবহাওয়ায় ধানের পরাগায়ন ব্যাহত হয়। ধানে চিটা হওয়ার এটিও একটি কারণ।
কৃষি বিভাগ জানায়, উপজেলাটির আট ইউপির মধ্যে কাস্তুল ও দেওঘর ইউপিতে চিটার হার সবচেয়ে বেশি। দেওঘর ইউনিয়নে এবার ৮৮২ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রি-২৮ ধান চাষ করা হয় ২২৫ হেক্টর জমিতে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, দিনে গরম আর রাতে কুয়াশা। এসব সমস্যায় ব্রি-২৮ থেকে ভালো ফলন পাওয়া কঠিন।
এ্গ্রিকেয়ার/এমএইচ
























