
ডেস্ক প্রতিবেদন, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: নওগাঁর মান্দা উপজেলার কালীগ্রাম। চারপাশে গাছপালায় ঘেরা এক নিভৃত পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে কৃষি ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন—‘শাহ কৃষি তথ্য পাঠাগার ও কৃষি জাদুঘর’। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে দেশের কৃষির অতীত, বর্তমান ও ঐতিহ্যের নানা উপকরণ।
রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম শাহ নিজের পৈতৃক ভিটায় প্রায় ২৭ বছর আগে শুরু করেছিলেন এ উদ্যোগ। বর্তমানে তাঁর গড়া এই পাঠাগার ও জাদুঘর প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
জাদুঘরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে সাজানো মাথাল, লাঙল, জোয়াল, গরুর গাড়ির ছই, সেচের যন্ত্র, মাছ ধরার চাঁই-পলো, ফসল মাড়াইয়ের কাঠি, নিড়ানি, করাতসহ অসংখ্য কৃষি উপকরণ। রয়েছে কৃষিপঞ্জিকা—যেখানে ১২ মাসের কৃষিকাজ, বীজ নির্বাচন, রোগবালাই দমন ও আবহাওয়ার নির্দেশনা একসঙ্গে লিপিবদ্ধ।
নিজের উদ্যোগের কথা জানিয়ে জাহাঙ্গীর আলম শাহ বলেন,
> “আমার শৈশব কেটেছে ধানের মাঠে, গোলার পাশে। লাঙল আর জোয়ালের সঙ্গে বড় হয়েছি। আজকের প্রজন্ম জানে না, কৃষি কীভাবে আমাদের সংস্কৃতি ছিল। তাই এই জাদুঘরের মাধ্যমে সেই ইতিহাস ধরে রাখার চেষ্টা করছি।”
জাদুঘরের পাশেই রয়েছে কৃষি তথ্য পাঠাগার। এখানে রয়েছে কৃষিবিষয়ক হাজারো বই, ম্যাগাজিন, গবেষণাপত্র ও ব্যবহারিক নির্দেশিকা। স্থানীয় কৃষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকরা প্রতিদিন এখানে এসে সময় কাটান।
স্থানীয় কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, “আমার ধানে পোকা ধরেছিল। এখানকার বই পড়ে জেনেছি কীভাবে ওষুধ দিতে হয়। আমাদের গ্রামের জন্য এটি আশীর্বাদ।”
সতীহাট জিএস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারিহা হোনে কৃপা বলেন, “বইয়ে যা পড়ি, এখানে এসে তা চোখের সামনে দেখতে পাই। মনে হয় ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠেছে।”
জাদুঘরের কেয়ারটেকার হজরত আলী জানান, দেশ-বিদেশ থেকেও অনেক দর্শনার্থী এখানে আসেন। কেউ বই দান করেন, কেউ আবার পুরোনো কৃষিযন্ত্র উপহার দেন।
২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কিডনি বিশেষজ্ঞ ড. স্টিভেন গেস্ট জাদুঘর পরিদর্শনে এসে বলেন,“এটি বাংলাদেশের মাটির গন্ধমাখা ইতিহাস, যা যে কোনো দেশের জন্য অনুপ্রেরণার।”
পরের বছর জাপানের চিকিৎসক কাতাসু হিরো ইয়ামাশিতা ও তাঁর স্ত্রী সেইকো ইয়ামাশিতা, এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মল্লিকা ব্যানার্জি ঘুরে গিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ হুমায়রা মণ্ডল বলেন, “শাহ কৃষি জাদুঘর ব্যক্তি উদ্যোগে হলেও এর গুরুত্ব জাতীয় পর্যায়ের। আধুনিক কৃষি যেমন প্রয়োজন, তেমনি কৃষির শিকড় জানা জরুরি। এই জাদুঘর সেই শিকড়ের সন্ধান দিচ্ছে।”
এই জাদুঘর কেবল কৃষিযন্ত্রের সংগ্রহশালা নয়, এটি বাংলাদেশের কৃষকের ঘাম, পরিশ্রম ও গর্বের এক জীবন্ত সাক্ষ্য—যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখবে।
সূত্র দৈনিক সমকাল
























