এগ্রিকেয়ার২৪.কম ডেস্ক: ঋণের কিস্তি শোধ করতে বাড়ির পাশে জমি বন্ধক রাখেন যশোরের রতন মোল্লা (৫২)। এরপর সেখানে সবজি চাষ করেন। কিন্তু সবজিতে কিছুতেই লাভবান হতে পারছিলেন না তিনি। চিন্তা করলেন জমিতে ঘাস চাষ করবেন। এরপর ঐ জমিতে বুনে দেন নেপিয়ার ঘাস। এখন নেপিয়ার ঘাস বেচে চালান কিস্তি। সে টাকা দিয়েই চলছে সংসার, শোধ করা হচ্ছে কিস্তির টাকা। ঘাস বেচে মাসে আয় করছেন ৫০ হাজার টাকা।

অধিক ফলনশীল নেপিয়ার ঘাস চাষ করে রতন মোল্লা সফল হয়েছেন। এই ঘাসচাষির বাড়ি যশোর সদরের লেবুতলা ইউনিয়নের তেজরোল গ্রামে। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার। গত মাসে বড় ছেলেকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছেন তিনি। সেখানে কাজে যোগও দিয়েছে। কিন্তু টাকা পাঠানোর মতো উপার্জনে এখনও যেতে পারেনি বলে জানান রতন। অথচ কোন সমস্যা হচ্ছে না তার। কারণ ঘাস বেচে এখন মোটামুটি আয় করছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসারে সচ্ছলতা আনতে ঋণ করে গরুর একটি ফার্ম করেন রতন। গাভী ও বাছুরসহ ১৭টি গরু ছিল তার। কিন্তু খামারটা চালাতে পারেননি। খাজুরা বাজারে চা ও মুদি দোকান দেন। কোনও রকমে সেটি চলছে। তেজরোল গ্রামের মাঠে শিশিরভেজা ঘাস কেটে মুঠি বাঁধছিলেন রতন আর স্ত্রী চায়না খাতুন। সেখানে কথা হয় এই দম্পতির সঙ্গে। রতন মোল্লা একটু একটু করে জানান সংগ্রামী জীবনের গল্প।

তিনি বলেন, তেজরোল পূর্বপাড়ার মাঠে এক বিঘা জমি এক বছরের জন্য লিজ নিয়েছি ১৪ হাজার টাকায়। আরেক বিঘা দুই লাখ এবং আরও দেড় বিঘা দেড় লাখ টাকায় বন্ধক নিয়েছি। মোট সাড়ে তিন বিঘা জমিতে চাষ করেছি নেপিয়ার ঘাস। এই অঞ্চলের কৃষকরা গরু-ছাগলের জন্য প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আমার দোকান থেকে মুঠি করা ঘাস কিনে নিয়ে যান। প্রতিদিন সাড়ে ৩৫০-৪০০ মুঠি বিক্রি করি। প্রতি মুঠির দাম পাঁচ টাকা। মাসে ঘাস বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকার বেশি পাই।

এগ্রিকেয়ার২৪.কমের আরোও নিউজ পড়তে পারেন:

উন্নতজাতের অধিক ফলনশীল নেপিয়ার ঘাস চাষ পদ্ধতি

১৯টি দিয়ে শুরু করে ২০০ ছাগলের মালিক জাকারিয়া

ঘাস চাষ করেই কোটিপতি গফুর!

মাছ চাষে ফিডের পরিবর্তে ঘাস ব্যবহার পদ্ধতি

রতন মোল্লার স্ত্রী চায়না খাতুন মূলত ঘাস চাষ, কাটা ও মুঠি করার কাজ করেন। মাঝে মধ্যে বিক্রিও করেন।
রতন মোল্লা বলেন, মূলত ঘাস চাষের বিষয়টি দেখেন আমার স্ত্রী। সকালে ঘাস কাটা আর মুঠি করার কাজ তিনি করেন। মুঠি বাঁধা হলে শেষে আমি ইজিবাইকে সেগুলো বাজারে নিয়ে যাই। ছোট ছেলের কলেজ বন্ধ থাকলে দোকানে বসে। ওই সময় আমি ইজিবাইক চালাই। অনেক পরিশ্রম করতে হয় আমাদের। এভাবেই চলছে জীবন সংগ্রাম।

চায়না খাতুন জানান, তিনটি এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া আছে পাঁচ লাখ টাকা। একটি ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া আছে। প্রতি মাসে এনজিওর ঋণের কিস্তি দিই ৮০ হাজার, দোকান ভাড়া আড়াই হাজার টাকা আর বছরে ব্যাংকের সুদ এক লাখ সাত হাজার টাকা। ঘাস বিক্রি ও নিজেদের আয় থেকেই সুদ পরিশোধ করা হয়।

শুরুটা কীভাবে জানতে চাইলে রতন মোল্লা বলেন, মুদি দোকানের পাশে একজনের ক্ষেতে নেপিয়ার ঘাস প্রথম দেখি। ওই ব্যক্তি নিয়মিত ঘাস বিক্রি করতেন। বছর খানেক আগে ওই জমির মালিকের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকার ঘাসের ডাঁটা কিনি। প্রথমে ১৬ শতক জমিতে সেগুলো লাগাই। জমি তৈরি, সার সেচ বাবদ খরচ হয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। ঘাসে লাভ হওয়ায় ধীরে ধীরে জমির পরিমাণ বাড়াই। এখন সাড়ে তিন বিঘা জমিতে চাষ করছি।

তিনি বলেন, নেপিয়ার ঘাস খুব দ্রুত বাড়ে। প্রতি মাসে আমরা ঘাস কাটি। এক জমির ঘাস কাটতে কাটতে আরেক জমির ঘাস কাটার উপযোগী হয়। কাটা ঘাসের জমিতে সেচ ও মাসে দুবার ড্যাপ, ইউরিয়া আর সালফার সার প্রয়োগ করতে হয়।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যশোরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. আবু তালহা বলেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকরা নেপিয়ার, পারা, অস্ট্রেলিয়ান জাম্বু ইত্যাদি ঘাসের চাষ করেন। মূলত নেপিয়ার ঘাস বেশি চাষ হয়। এই ঘাস গবাদিপশুর খুব প্রিয়। চাষ পদ্ধতি সহজ। এতে পোকার আক্রমণ হয় না। জেলায় প্রায় ৫২০ হেক্টর জমিতে ঘাসের চাষ হয়। ঘাস চাষে এক হাজার ৪০০ কৃষক জড়িত। এতে অনেকে সফলতা পেয়েছেন। নেপিয়ার ঘাস বেচে চালান কিস্তি, মাসে আয় ৫০ হাজার সংবাদের তথ্য বাংলা ট্রিবিউন থেকে নেওয়া হয়েছে।

এগ্রিকেয়ার/এমএইচ