আব্দুল হাকিম, রাজশাহী: পাট চাষে আগ্রহ বাড়ছে রাজশাহীর চাষিদের। লাভজনক হওয়ায় দিন দিন পাট চাষের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন এ জেলার কৃষকরা। বিগত বছরগুলোতে পাটের চাষে লাভবান হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে এমন আগ্রহ বেড়েছে।

আগামীতে আরও বেশি পরিমাণ জমিতে পাটের চাষ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কথায় আছে, পাটের টাকা পায়টে (শ্রমিক) খায়। পাট চাষ করে যা টাকা আসে তা দিয়ে শ্রমিকের খরচই উঠে না কৃষকদের এমন অভিযোগ আর নেই। এ বছর দাম ভালো থাকায় রাজশাহীতে বেশি পরিমাণ পাট চাষের সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলার ৯ টি উপজেলায় পাটের বীজ বপনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৯’শ হেক্টর জমি। এখন পর্যন্ত মোট ১৩ হাজার ১৩ হেক্টর জমিতে বীজ বপন করা হয়েছে। অন্যদিকে গত বছর বপন করা হয়েছিলো ১৪ হাজার ৭৯৬ হেক্টর জমিতে। এ বছর উৎপাদন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৩৫০ বেল। (সাড়ে চার মণে এক বেল)।

এবার রাজশাহীর কৃষকরা ও-৯৮৯৭, ও-৭২, জেআরও ৫২৪ জাত ও রবি-১ জাতের পাট বপন করছে। এদিকে কয়েক বছর থেকে শ্রম দিয়ে, টাকা খরচ করে পাট চাষ করে দাম পেতেন না রাজশাহীর কৃষকরা। তবে পরিস্থিতি পাল্টেছে। এবার ভালো দামে বাজারে পাট বিক্রি করছেন তাঁরা। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভও পাচ্ছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তাই এবার কৃষকের মুখে হাসি।

পুঠিয়া উপজেলার কাপাশিয়া এলাকার কৃষক আলিম বলেন , গত বছর ধরে পাটের দাম বেশি হওয়ায় অনেক কৃষক আবার পাট চাষের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে পাট চাষ ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাঁরাও এ বছর অল্প করে পাট চাষে ঝুঁকেছেন। রাজশাহীতে বিগত বছরের চেয়ে এ বছর বেশি পরিমাণ জমিতে পাটবীজ বপন করা হচ্ছে। গত বছর থেকে আবহাওয়া ভালো থাকায় এবারও বেশি পরিমাণে পাটের বীজ বপন করেছে কৃষকরা। এবার আবহাওয়া ভালো থাকলে পাটের বাম্পার ফলন আশা করছে কৃষকরা।

পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর এলাকার পাট ব্যবসায়ী আসলাম বলেন, হাটে এখন চার হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হচ্ছে। গত মাসে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হয়েছে। তাই এ বছর নতুন করে অনেক কৃষক পাট চাষ করছে। আগের চেয়ে এখন কৃষি উপকরণের পাশাপাশি দিনমজুরের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। তার মধ্যে বীজ বপন থেকে পাট কেটে প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত এক বিঘা জমিতে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার মত খরচ হয়। গত কয়েক বছর যাবত বাজার মন্দা থাকায় পাট বপন করে এলাকার অনেক চাষিদের লোকসান গুণতে হয়েছে। তবে গত বছর থেকে বাজারে পাটের চাহিদার পাশাপাশি দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। যার কারণে এবার অনেকেই পাট চাষে এগিয়ে আসছেন।

চারঘাট উপজেলার কৃষক মাইনুল হক জানান, সময়মত সঠিক পরিচর্যা ও বিছা-মাকড়সা প্রতিরোধ করতে পারলে এবার বিগত বছরের তুুলনায় পাটের ফলন অনেক বেড়ে যাবে। দাম ভালো থাকায় এবার আমাদের অনেক জমিতে পাট চাষ করা হচ্ছে।

একজন পাট ব্যবসায়ীর সাথে কথা হলে তিনি জানান, গত বছরের শুরু থেকেই প্রতিমণ পাট দু’হাজার থেকে শুরু করে তিন হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে বাজারে পাটের চাহিদার পাশাপাশি দামও বেড়েছে দ্বিগুণ। সর্বশেষ গত মাসে পাট কিনা বেচা হয়েছে প্রতিমণ ৬ হাজার টাকা দরে। সে অনুপাতে এবারো পাটের বাজার ভালো যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।বিগত বছর গুলোতে বৈরি আবহাওয়ার কারণে এই অঞ্চল সময়মত বৃষ্টিপাত অনেক কম হয়েছিল। চাষিরাও ছিল বৃষ্টি নির্ভর। আর বর্তমানে চাষিরা জমিতে সেচ ব্যবস্থায় চাষাবাদ করছেন। তাছাড়া পাটের চাহিদার পাশাপাশি দামও অনেক ভালো। যার কারণে পাট চাষে অনেক কৃষক এগিয়ে এসেছেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা উম্মে সালমা জানান, গত বছরে কৃষকরা পাটের ভালো দাম পেয়েছে। এখন পর্যন্ত হাটে বাজারে দাম ভালো আছে। তাই নতুন অনেক জমিতে কৃষক পাট চাষ করেছে। এবার কৃষকরা ও-৯৮৯৭, ও-৭২, জেআরও ৫২৪ জাত ও রবি ওয়ান জাতে পাট বপন করেছে। এখনো কিছু জমিতে বীজ বোপন করা বাঁকি আছে। এ সপ্তাহের মধ্যে হয়তো বোপন শেষ হয়ে যাবে। আমাদের উপজেলার সকল কৃষি বিভাগ কৃষকদের নানা ভাবে পরামর্শ দিচ্ছে। আশা করছি এবার পাটের বাম্পার ফলনের হবে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল আউয়াল বলেন, এ বছর ৯ টি উপজেলায় পাটের বীজ বপনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৯’শ হেক্টর জমি। এখন পর্যন্ত মোট ১৩ হাজার ১৩ হেক্টর জমিতে বীজ বপন করা হয়েছে। গত বছর বপন করা হয়েছিলো ১৪ হাজার ৭৯৬ হেক্টর জমিতে। এ বছর উৎপাদন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৩৫০ বেল। যার মানে সাড়ে চার মণ। ও-৯৮৯৭, ও-৭২, জেআরও ৫২৪ জাত ও রবি-১ জাতের পাট এবার রাজশাহীর কৃষকরা এবার বেশি বপন করছে।

এগ্রিকেয়ার/এমএইচ