স্টাফ রিপোর্টার, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: নাটোরের নলডাঙ্গায় হৃদয়বিদারক এক চুরির ঘটনায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধা জরিনা বেগম। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসারের হাল ধরেছিলেন এই নারী। কিন্তু চোরের হাতে সেই সামান্য আশার সম্বলটুকুও হারিয়ে এখন পথে বসার উপক্রম তার। সোমবার (২৭ অক্টোবর) দিনগত রাত আড়াইটার দিকে উপজেলার মির্জাপুরদীঘা গ্রামে চুরির এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দেড় বছর আগে স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে জরিনা বেগম একটি গাভি কিনেছিলেন। সেই গাভির দুধ বিক্রি করেই এনজিওর কিস্তি শোধ করতেন এবং চার সদস্যের পরিবারের দৈনন্দিন খরচ চালাতেন। অনেক কষ্টে আর সঞ্চয়ে গাভি থেকে আরেকটি বাছুরও হয়েছিল, যা এখন তার সংসারের প্রধান আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সোমবার গভীর রাতে চোরেরা গোয়াল ঘরের তালা ভেঙে দুইটি গরুই চুরি করে নিয়ে যায়।

বৃদ্ধা জরিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি দরিদ্র মানুষ, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গরু কিনেছিলাম। সেই গাভির দুধ বিক্রি করে সংসার চালাতাম, কিস্তি দিতাম। এখন চোরেরা আমার দুইটা গরু নিয়ে গেছে। আমি তো পথে বসে গেলাম। এখন কীভাবে কিস্তির টাকা দেব, আর বাচ্চাদের খাওয়াব?”

তিনি আরও জানান, “রাত একটা নাগাদ বাইরে দরজার পাশে শব্দ শুনে উঠেছিলাম। বাইরে গিয়ে দেখি কয়েকজন লোক পালিয়ে যাচ্ছে। পরে আবার ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে উঠে দেখি গোয়াল ঘর ফাঁকা, আমার গরু নেই। তখন বুঝলাম—আমার সব শেষ।”

গ্রামের প্রতিবেশী আশিকুর রহমান বলেন, “জরিনা বেগমের পরিবারটি অত্যন্ত অসহায়। গাভির দুধ বিক্রির টাকায় তাদের সংসার চলতো। এখন গরু চুরি হওয়ায় তারা সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। আমরা স্থানীয়ভাবে কিছু সহায়তার চেষ্টা করছি, তবে বড় কোনো সাহায্য না পেলে তাদের টিকে থাকা কঠিন।”

বিপ্রবেলঘরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান আলী বলেন, “ঘটনাটি সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক। জরিনা বেগম একজন পরিশ্রমী নারী ছিলেন। নিজের পরিশ্রমে গরুর দুধ বিক্রি করে সংসার চালাতেন। এখন তার অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমি ইতিমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। আশা করছি কোনোভাবে তার পরিবারকে সহায়তা করা যাবে।”

চুরির ঘটনায় পুরো এলাকায় এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় চুরির ঘটনা বেড়ে গেছে। রাতের অন্ধকারে প্রায়ই গরু ও ছাগল চুরির ঘটনা ঘটছে, কিন্তু চোরচক্রকে এখনও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

নলডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, “ঘটনার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তাধীন। চোরদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। অপরাধীরা কেউ পার পাবে না।”

এদিকে, গরু হারিয়ে বৃদ্ধা জরিনা বেগম এখন মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছেন। সারাক্ষণ তার মুখে একটি কথাই— “আমার গরু দুটি এনে দাও, এটাই ছিল আমার সংসারের ভরসা।”

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, জরিনার মতো আরও অনেক দরিদ্র পরিবার এনজিও ঋণ নিয়ে গবাদিপশু পালন করে সংসার চালায়। তাই এ ধরনের চুরির ঘটনায় শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা গ্রামের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

গ্রামবাসী, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ—অসহায় জরিনা বেগমের চুরি যাওয়া গরুগুলো উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং তার পরিবারের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হোক।