
মাছ কেটে দৈনিক আয় দেড় হাজার টাকা!
ডেস্ক প্রতিবেদ, এগ্রিকেয়ার২৪.কম:
দা, বটি নিয়ে বেশ কয়েকজন লোক কাঠের পিঁড়িতে বসে আবার কেউ দাঁড়িয়ে কাজ করছেন। পাশে রাখা আছে ছাঁই। অনেকে ব্যাগ ভর্তি মাছ তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। মাছগুলো সযত্নে কেটে আবার তাদের ব্যাগে ভরে দিচ্ছেন। এমন দৃশ্য দেখা যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় পৌর শহরের সড়ক বাজার মাছ বাজারে। জীবিকার প্রয়োজনে মাছ কুটতেই শুরু হয় তাদের দিন। মাছ কেটে যা আয় হয় এতেই চলে তাদের সংসার।
কথায় আছে মাছে মাছে ভাতে বাঙালি। ছোট বড় সবার কাছে মাছ খুবই প্রিয়। অনেকেই ছোট বড় মাছ কিনতে চায় কিন্তু কাটতে সমস্যা ওইগুলো বাড়ি নিতে চায় না। বর্তমানে মাছ কাটার মধ্যেও যেন আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। বাজার থেকে মাছ ক্রয় করে সেখান থেকে টাকার বিনিময়ে কেটে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। দিন দিন মাছ কাটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পৌর শহরের সড়ক বাজারে রয়েছে মাছ বাজার। এই বাজারে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নানা প্রজাতির মাছ বিক্রি হচ্ছে। সকাল থেকেই জমে উঠে এই বাজার। দৈনন্দিন বাসা বাড়িতে খাবারের পাশাপাশি ছোট-বড় যেকোনো অনুষ্ঠানের জন্য লোকজন এই বাজার থেকে মাছ ক্রয় করছেন। তবে বেশিরভাগ লোকজন তাদের ক্রয়করা মাছগুলো কেটে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতি কেজি মাছ কাটতে মজুরি ১৫ টাকা নিচ্ছেন। দৈনিক এভাবে মাছ কেটে প্রত্যেকে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা আয় করছেন।
বাজারে আসা একাধিক কর্মব্যস্ত লোকজনরা জানান, এমনিতেই সারা দিন তাদের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। বাসায় কাজের লোকের সমস্যা রয়েছে। দৈনিক স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের কাজ, কেনাকাটা আর রান্নাবান্নার মতো জরুরি কাজ করে তারা এক প্রকার হাঁপিয়ে উঠছেন। তাই সময় বাঁচাতে বাজার থেকে মাছ কিনে সেখান থেকেই কেটে বাসায় নিয়ে যায়। এতে আর কোনো বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয় না।
মাছ কাটার সঙ্গে জড়িত প্রসেনজিৎ বলেন, এক সময় মাছের আড়তে শ্রমিকের কাজ করতাম। সংসারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় চলা খুবই কষ্ট হয়ে যায়। তাই এই পেশা ছেড়ে দিয়ে বাজারে মাছ কাটার কাজ করছি। প্রতিদিন সকাল ৮ থেকে দুপুর পর্যন্ত মাছ কাটার কাজ করছি। চাকরীজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ মাছ কিনে তাদের বাসা বাড়িতে কেটে নিয়ে যায়। প্রতি কেজি মাছ ১৫ টাকা নেয়া হয়। প্রতিদিন এভাবে মাছ কেটে নিচে দেড় হাজার টাকা আয় হয়।
তিনি আরো বলেন, সপ্তাহে ছুটির দিন শুক্রবার কিংবা বিভিন্ন দিবসে বাজারে ক্রেতা সমাগম বেশি হওয়ায় ব্যস্তা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এই কাজের সহযোগিতার জন্য দোকানে একজন শ্রমিক রাখা হয়েছে। প্রতিমাসে দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিক বেতন ,অন্যান্য খরচ বাদে ২০ হাজার টাকা আয় হয়।
সুহেল বলেন, এই বাজারে মাছ কাটার ভালো চাহিদা রয়েছে। যারা চাকরিসহ নানা কাজ করছেন এবং বাসা বাড়িতে কাজ করার লোকজন নেই তারাই মূলত মাছ কুটে নিচ্ছেন। মাঝারি ও বড় আকারের মাছই বেশি কাটা হয়। কারণ ওইসব মাছে ঝামেলা কম ও স্বল্প সময়ে কাটা যায়। দৈনিক মাছ কেটে দেড় হাজার টাকা আয় হয়। আর ভাগ্য ভালো হলে বেশিও হয়।
পৌর শহরের কলেজপাড়া এলাকার গৃহিণী আয়েশা আক্তার বলেন, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। স্বামী ঢাকায় কাজ করেন। সংসারে এক ছেলে এক মেয়ে রয়েছে। আমার কর্মস্থল ব্রাহ্মণবাড়িয়া হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই বাসা থেকে বের হতে হয়। বর্তমানে বাসায় কোনো কাজের লোক নেই। সব কাজ এক হাতে করতে হয়। তাই সময় বাঁচাতে, বাজার থেকে মাছ কিনে কেটে নিয়ে যাচ্ছি। এতে করে বাড়তি কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না।
রাধানগর এলাকার মো. আশরাফুল আলম বলেন, আমি একটি ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত আছি। বাসায় স্ত্রী ও এক ছেলে রয়েছে। কাজের লোক না থাকায় মাছ কুটতে অনেক সমস্যা হয়। ইচ্ছে থাকা সত্বেও মাছ খাওয়া যাচ্ছে না। তাই বাজার থেকে কিনে সেখান থেকে কেটে নিচ্ছি। এজন্য প্রতি কেজিতে ১৫ টাকা করে দিতে হয়।
মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমি ঢাকায় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছি। পরিবার রাধানগরে রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে আসি। বাড়িতে বাজার করার লোকজন না থাকায় প্রতি সপ্তাহের বাজার করতে হয়। তাই বাজার থেকে এক সঙ্গে ১০ কেজি রুই, কাতল মাছ ক্রয় করেছি। মাছ বেশি হওয়ায় ঝামেলা এড়াতে বাজার থেকেই কুটে নিয়েছি।
সড়ক বাজারের ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম বলেন, স্ত্রী বেশ কিছু দিন ধরে অসুস্থ। বাসায় কাজের লোক ছিল সে অসুস্থ হওয়ায় চলে গেছে। যখন বাজার থেকে মাছ কেনা হয় তখন এগুলো কেটে নেয়া হয়। এই ব্যবস্থা না থাকলে আমাদের মতো পরিবারগুলো যেন মাছ খাওয়া ছেড়ে দিতে হতো। মাছ কাটার ঝামেলা না থাকায় এখন রীতিমতো মাছ কিনে খাওয়া যাচ্ছে।
শিক্ষক আফরোজা আক্তার বলেন, আমার স্বামী ঢাকায় ব্যবসা করেন। এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে আখাউড়ায় আছি। বাসায় মেহমান আসবে বলে বাজার থেকে ৫ কেজি ওজনের একটি মাছ কেনে কাটার কাজটি সেখান থেকে করা হয়।
তিনি বলেন, আমরা যারা নানা পেশায় কাজ করি সময় না থাকায় মাছ কাটা খুবই কষ্টকর। যারা এ পেশায় কাজ করছেন আসলেই আমাদের অনেক উপকার হচ্ছে।
























