ডেস্ক প্রতিবেদন, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: শীত মৌসুমের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ আমবাগান এখন মুকুলের ঘ্রাণে মুখর। গাছে গাছে আগাম মুকুলের প্রাচুর্য দেখে চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলনের স্বপ্ন দেখছেন আমচাষিরা। প্রাথমিক পর্যায়ে মুকুলের আধিক্য ভালো উৎপাদনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। তবে শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের ওপরই নির্ভর করছে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহী অঞ্চলে ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়। এতে উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ মেট্রিক টন আম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য একই পরিমাণ জমিতে চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন।

বাগানে বাগানে মুকুলের সমারোহ

বাঘা, চারঘাট ও পুঠিয়া উপজেলার বিভিন্ন আমবাগানে ইতোমধ্যে মুকুলের আধিক্য চোখে পড়ছে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে মুকুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। মুকুল আসার আগেই চাষিরা গাছের ছাঁটাই, সার প্রয়োগ ও পরিচর্যার কাজ শেষ করেছেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী মুকুলকে রোগবালাই ও পোকামাকড় থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় কীটনাশকও প্রয়োগ করা হয়েছে।

চারঘাট উপজেলার কালুহাটি গ্রামের আমচাষি মোজাফফর হোসেন বলেন, “এবার বাগানে আগেভাগেই মুকুল এসেছে। যদি অতিরিক্ত কুয়াশা বা ঝড় না হয়, তাহলে বিপুল আম উৎপাদন হবে বলে আশা করছি।”

একই উপজেলার আমচাষি মাহফুজ আলী জানান, সারাবছর নিয়মিত পরিচর্যা করায় তিনি ভালো ফলন পান। তিনি বলেন, “এ বছরও সময়মতো সার ও ওষুধ প্রয়োগ করেছি। কয়েকটি গাছে ইতোমধ্যে ফুল এসেছে। তবে হপার বা শোষক পোকা নিয়ন্ত্রণে না রাখলে উৎপাদন কমে যেতে পারে।”

বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্র-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম জানান, এবার কিছু গাছে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আগেই মুকুল এসেছে। তবে সব গাছে সমানভাবে মুকুল আসবে কিনা, তা নিশ্চিত হতে আরও সময় লাগবে।

তিনি বলেন, “কৃষকদের নিয়মিত বাগান পরিদর্শন ও প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কুয়াশা বা অকালবৃষ্টিতে বড় ধরনের ক্ষতি না হলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব।”

নতুন জাত ও চাষের বিস্তার

রাজশাহী অঞ্চলে প্রতিবছরই নতুন আমবাগান গড়ে উঠছে। বিশেষ করে নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আমচাষ দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। আম্রপালি, বারি আম-৩ ও বারি আম-৪ জাতের চাষ বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে নওগাঁয় আমচাষের জমি প্রায় দেড়গুণ বেড়েছে। এ সময়ে নওগাঁয় আমবাগানের জমি বেড়েছে ১৪ হাজার ৯২৫ হেক্টর, যেখানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বেড়েছে ৯ হাজার ৫২০ হেক্টর। গত বছর নওগাঁ সর্বাধিক আম উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিতি পায়, যদিও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এখনও সর্বাধিক জমিতে আমবাগান রয়েছে।

চাষপদ্ধতিতে পরিবর্তন

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জমির পরিমাণই বাড়ছে না—পরিবর্তন আসছে চাষপদ্ধতিতেও। আগে শতবর্ষী বাগান তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও এখন অনেক কৃষক ৮ থেকে ১০ বছরের লক্ষ্য ধরে উচ্চফলনশীল জাতের বাগান করছেন। ঘন রোপণ পদ্ধতি, সুষম সার ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ কৌশল ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে।

সব মিলিয়ে আগাম মুকুলের সমারোহে রাজশাহী অঞ্চলের আমবাগানগুলোতে এখন আশাবাদের আবহ। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং সময়মতো পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে চলতি মৌসুমে আমের বাম্পার ফলন পেতে পারেন কৃষকরা—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।

এগ্রিকেয়ার২৪.কম:/ আরিফ