
ডেস্ক প্রতিবেদন, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: ধানের পর বাংলাদেশে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দানাজাতীয় ফসল গম। দেশের শহরাঞ্চলে প্রতিদিনের নাস্তার টেবিলে রুটি, পরোটা, নান, বিস্কুট—সবকিছুর প্রধান উপাদান আটা ও ময়দা, যা আসে গম থেকে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় দেশে গম উৎপাদন এখনও কম। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমিত জমিতেই যদি সঠিক সময়ে বপন, উন্নত জাত নির্বাচন ও আধুনিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে গমের ফলন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সম্ভব।
চাষের সময় ও উপযুক্ত জাত নির্বাচন
গম বপনের উত্তম সময় কার্তিকের শেষ থেকে অগ্রহায়ণের তৃতীয় সপ্তাহ, অর্থাৎ ১৫ থেকে ৩০ নভেম্বর। এ সময় বোনা যায় এমন উচ্চ ফলনশীল জাতের মধ্যে রয়েছে— কাঞ্চন, আকবর, অগ্রণী, প্রতিভা, সৌরভ, গৌরব ও সোনালিকা। তবে তাপ সহনশীল জাত যেমন— সুফি, বিজয় ও প্রদীপ ডিসেম্বরের ১৫-২০ তারিখ পর্যন্ত বপন করা যায়।
কৃষি গবেষণায় উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতগুলোর মধ্যে বারি গম-২১ (শতাব্দী), বারি গম-২২ (সুফি), বারি গম-২৩ (বিজয়), বারি গম-২৪ (প্রদীপ), বারি গম-২৫ ও বারি গম-২৬ বর্তমানে বেশি জনপ্রিয়। পাতা ঝলসানো রোগের কারণে কাঞ্চন জাতের ফলন কমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় এ জাত চাষ নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত সময়ের পর গম বুনলে প্রতিদিন গড়ে ১.৩ শতাংশ হারে ফলন কমে যায়। তাই সময়মতো বপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু ও মাটির উপযোগিতা
গম গ্রীষ্ম, অবগ্রীষ্মমণ্ডলীয় থেকে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলেও ভালো জন্মে। বার্ষিক ৩৮০ থেকে ১১৪৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত গমের জন্য উপযোগী হলেও এর চেয়ে কম-বেশি বৃষ্টিতেও গম টিকে থাকে। তবে ফুল ফোটার সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রা দানার গঠন ব্যাহত করতে পারে।
উঁচু ও মাঝারি দো-আঁশ এবং বেলে দো-আঁশ মাটি গম চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো। লবণাক্ত জমিতে ফলন কম হয়। সহজে পানি নিষ্কাশন হয়—এমন জমি নির্বাচন করা উচিত।
বীজ ব্যবস্থাপনা ও বপন পদ্ধতি
একরপ্রতি প্রয়োজন প্রায় ৪৮ কেজি (বিঘাপ্রতি ১৬ কেজি) বীজ। বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ৮০-৮৫ শতাংশের কম হলে অতিরিক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে; ৭০ শতাংশের নিচে হলে সেই বীজ ব্যবহার না করাই উত্তম।
বপনের আগে প্রতি কেজি বীজে ৩ গ্রাম হারে প্রোভেক্স-২০০ অথবা ২ গ্রাম কার্বেন্ডাজিম মিশিয়ে শোধন করলে বীজবাহিত রোগ কমে এবং ফলন ১০-১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
লাইনে বপন করলে ২০ সেন্টিমিটার দূরত্বে ও ৪-৫ সেন্টিমিটার গভীরে বীজ বপন উত্তম। বর্তমানে পাওয়ার টিলারচালিত বীজ বপন যন্ত্রের মাধ্যমে জমি চাষ, বীজ বপন ও মই—সব কাজ একসঙ্গে করা সম্ভব হচ্ছে।
সার ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা
ভালো ফলনের জন্য জৈব ও রাসায়নিক সারের সুষম ব্যবহার জরুরি। প্রতি বিঘায় প্রায় ২৪-২৫ কেজি ইউরিয়া, ১৮-১৯ কেজি টিএসপি, ৫-৬ কেজি এমওপি, ১৪-১৫ কেজি জিপসাম এবং ১.৩ কেজি বোরাক্স প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়। ইউরিয়ার একাংশ প্রথম সেচের সময় উপরি প্রয়োগ করতে হয়।
মাটির পিএইচ ৪.০-৫.০ হলে শতকপ্রতি ৮ কেজি এবং ৫.০-৬.০ হলে ৪ কেজি ডলোচুন বপনের অন্তত ১৫-২০ দিন আগে প্রয়োগ করতে হবে। এতে ফলন ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
দস্তা বা বোরনের ঘাটতি থাকলে নির্ধারিত মাত্রায় জিংক সালফেট ও বোরিক এসিড প্রয়োগ করলে চিটা সমস্যা দূর হয়।
সেচ ও আগাছা দমন
ধানের তুলনায় গমে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পানি লাগে। প্রথম সেচ চারার তিন পাতা হলে (১৭-২১ দিন), দ্বিতীয় সেচ শীষ বের হওয়ার সময় (৫৫-৬০ দিন) এবং তৃতীয় সেচ দানা গঠনের সময় (৭৫-৮০ দিন) দিতে হয়। সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি বাড়ানো সম্ভব বলে কৃষিবিদরা জানিয়েছেন।
আগাছা নিয়ন্ত্রণে বপনের ২৫-৩০ দিনের মধ্যে নিড়ানি দিতে হবে। সারিতে বপন করলে আগাছা দমন সহজ হয়।
রোগ-পোকা ও ইঁদুর দমন
গমে পাতার মরিচা ও পাতার দাগ রোগ বেশি দেখা যায়। শীষ বের হওয়ার সময় টিল্ট ২৫০ ইসি ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করলে রোগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ফলন ১৫-২০ শতাংশ বাড়তে পারে।
মাজরা পোকার আক্রমণ হলে ডায়াজিনন ৬০ ইসি প্রয়োগ করতে হয়। ইঁদুর দমনে ফাঁদ, গর্তে পানি বা অনুমোদিত বিষটোপ ব্যবহার করা যেতে পারে।
সম্ভাব্য ফলন ও সংগ্রহ
উন্নত পরিচর্যা নিশ্চিত করলে একরপ্রতি ১.৪৫ থেকে ১.৯৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। গম পেকে হলুদ রঙ ধারণ করলে রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে কেটে দুপুরে মাড়াই করা উত্তম।
পানি সাশ্রয়ী ফসল হিসেবে গম
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেখানে বোরো ধানে হেক্টরপ্রতি ৫৫-৬০ একর ইঞ্চি পানি লাগে, সেখানে গমে লাগে মাত্র ১৫ একর ইঞ্চি। ফলে পানিসংকটপূর্ণ অঞ্চলে গম হতে পারে টেকসই বিকল্প ফসল।
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা বলছেন, “সময়মতো বপন, উন্নত জাত নির্বাচন ও সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে গমে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।” দেশের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারে তাই এখনই গমের ক্ষেতের দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
এগ্রিকেয়ার২৪.কম:/ আরিফ
























