ডেস্ক প্রতিবেদন, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরকার ও রাজনীতি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন সোহায়েল আল ফারুক। ২০১৭ সালে পড়াশোনা শেষে যখন বন্ধুরা চাকরির খোঁজে শহরমুখী, তখন তিনি ফিরেছিলেন নিজের গ্রামে। ধামরাই উপজেলার সদর ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামে এসে শুরু করেন এক ভিন্ন পথচলা।

চাকরির পিছনে না ছুটে নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন ‘ফাতেমা মাল্টি এগ্রো’ নামে একটি ছাগলের খামার। নিজ বসতবাড়ির পাশে মাত্র ৬ শতাংশ জায়গায় শুরু করেছিলেন ছোট পরিসরে। এখন সেই খামারে রয়েছে প্রায় ৬০টি ছাগল।

সোহায়েল বলেন, ‘শুরুতে মাত্র ৩০ হাজার টাকা মূলধন, চারটি ছাগল আর অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল আমার মূল শক্তি। আজ চার বছর পর সেই ছোট খামারই আমার জীবনের আশার আলো।’

তিনি জানান, খামারের ছাগলের দুধ ও মাংস শতভাগ বিশুদ্ধ। বছরে সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি আয় হয়। তিনি বলেন, ‘ছাগল পালন এখন শুধু আয় নয়, এক জীবনের গল্প। দেশের দুধ ও মাংসের চাহিদা মেটাতে বড় পরিসরে খামার করতে চাই।’

তবে সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় হতাশ সোহায়েল। তার অভিযোগ, ‘উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে টেকনিক্যাল সহায়তা মিললেও ঔষুধ বা ভ্যাকসিন পাই না। বাইরে থেকে সব কিনতে হয়। যদি সরকার এই সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়, তাহলে ছাগল পালন আরও লাভজনক হবে।’

সোহায়েল আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে ছাগলের চিকিৎসা সেবা খুব দুর্বল। বিদেশের মতো আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি চালু করা গেলে এই খাত অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারবে।’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সোহায়েলের খামারে ছাগলের খাবার, পরিচর্যা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। সেখানে একজন যুবক নিয়মিত কাজ করেন। ছাগল খাওয়ানো থেকে শুরু করে দেখাশোনার দায়িত্ব তার।

স্থানীয় বাসিন্দা রাকিব হাসান জয় বলেন, ‘সোহায়েল আল ফারুক একজন উচ্চশিক্ষিত যুবক। চাকরির পেছনে না ঘুরে ছাগলের খামার গড়ে সে প্রমাণ করেছে, পরিশ্রম করলে গ্রামের মাটিতেও সাফল্য আসে। তার মতো শিক্ষিত যুবকরা যদি খামার গড়ে তোলে, তাহলে কেউ বেকার থাকবে না।’

আরেক বাসিন্দা সোলাইমান বলেন, ‘সোহায়েল দেখিয়ে দিয়েছেন- সাফল্য শহরের আলোয় নয়, মাটির গন্ধেও জন্ম নেয়। যারা বেকার, তারা যদি তার মতো সাহস করে এগিয়ে আসে, তাহলে গ্রামেই কর্মসংস্থান সম্ভব।’

সোহায়েলের পিতা রফিক হোসেন ছেলের সাফল্যে গর্বিত। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ছাগলের খামার করছে- এটা নিয়ে আমি গর্ব করি। সে নিজের হাতে ঘাস কেটে ছাগল খাওয়ায়, গোসল করায়, দেখাশোনা করে। সততা ও পরিশ্রম থাকলে চাকরি ছাড়াও সফল হওয়া যায়।’

সোহায়েল বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, মেধা আর শ্রম দিলে সফলতা সম্ভব। বেকার যুবকদের বলব- চাকরির আশায় সময় নষ্ট না করে উদ্যোগ নাও। আমি যদি পারি, অন্যরাও পারবে। ছাগল পালন দেশের আমিষের ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘তেঁতুলিয়া গ্রামের সোহায়েল আল ফারুক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ২০২১ সালে মাত্র চারটি ছাগল নিয়ে খামার শুরু করেন। এখন সেখানে প্রায় ৬০টি ছাগল আছে। আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের টেকনিক্যাল সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফারুক এখন বছরে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা আয় করছেন। আমি চাই, বেকার যুবকরা চাকরির আশায় বসে না থেকে উদ্যোক্তা হোক। আমরা সরকারি পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। এতে শুধু তারা নয়, তাদের মাধ্যমে অন্যরাও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।’

ডা. মিজানুর রহমান মনে করেন, ‘সোহায়েল প্রমাণ করেছেন- কোনো কাজ ছোট নয়। সে এক অনুপ্রেরণা, এক নতুন দিগন্তের গল্প। স্বপ্ন, মেধা ও সততা নিয়ে এগোলে অসম্ভবও সম্ভব।’

এগ্রিকেয়ার/আরিফ