
দিনাজপুরে আগাম আলু চাষের মৌসুম শুরু হয়েছে। কৃষকেরা জমিতে আগাম জাতের আলু লাগানোতে ব্যস্ত থাকলেও, এবার আলুর বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রম খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে সরকারি মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ দামে সার ও বীজ কিনতে হচ্ছে, যা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
জানা যায়, এবার সরকারি যে আলুর বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে; সেই আলুর বীজ জাতভেদে ৫৭ টাকা থেকে শুরু করে ৬৬ টাকা পর্যন্ত কেজি নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরকারি বীজ অপ্রতুল। সূত্র জানায়, ২০-২৫ শতাংশ আলুর বীজ উৎপাদন করে বিএডিসি। বাকি আলু কৃষক তাদের ঘরে রাখেন ও বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও ও প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করে। সরকারি আলুবীজ পর্যাপ্ত না হওয়ায় কৃষক বাধ্য হয়ে বেশি দামে আলুবীজ কিনে থাকেন। গত বছর যে আলুবীজ ৫০-৬০ টাকায় কিনতে পেরেছিল কৃষক। সেই আলুবীজ এবার ৮০-৮৫ টাকা পর্যন্ত কিনতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের কৃষক জুয়েল ইসলাম বলেন, “এবার ১ একর জমিতে আলু চাষ করতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হবে। তবে বাজারে আলুর দাম না বাড়লে লোকসানের মুখে পড়তে হবে।” এ বিষয়ে জানতে চাইলে দিনাজপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নুরুজ্জামান জানান, “সার ও বীজ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে—এমন কোনো অভিযোগ পাননি, তবে খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিভিন্ন কৃষক আশা করছেন, আগাম আলু উচ্চ মূল্যে বিক্রি করতে পারলে তাদের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
ডিলার বলেন, ‘বিএডিসি বীজ আলুর মূল্যবৃদ্ধির জন্য ঢাকাতে এসি রুমে বসা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দোষারোপ করছেন ডিলাররা। কারণ হিসেবে তারা জানান, অপরিকল্পিতভাবে বীজ আলু শিফটিং করা। দিনাজপুর অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা থাকার পরও দিনাজপুর অঞ্চলে উৎপাদিত বীজ আলু শিফটিং করে অন্য হিমাগারে নেওয়া হয়। এ বছর দিনাজপুর অঞ্চলের ডিলারের মাঝে যে পরিমাণ বীজ-আলু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তার সিংহভাগ বীজ আলু বিএডিসির কাশিমপুর, মধুপুর, কুড়িগ্রাম ও রংপুর হিমাগার থেকে নিতে হচ্ছে। এতে বেড়েছে পরিবহন খরচসহ অন্যান্য খরচ। অথচ বিএডিসির দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় হিমাগারে বীজ আলুর বরাদ্দ দেওয়া হলে কমে আসতো পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ।
আরো পড়ুন: সাতক্ষীরায় বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠছে বেলজিয়াম জাতের হাঁসের খামার
তারা আরও জানান, দিনাজপুর অঞ্চলের এই হিমাগরগুলোতে রাখা বীজ আলু বাইরের জেলার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা থেকে ডিলারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে হয়রানিমূলক নতুন নিয়ম। সেই কারণে এস্টারিক্স জাতের বীজ আলুর জন্য প্রায় দেড় মাস আগে টাকা জমা দিতে হয়েছে ডিলারদের। এতে ডিলারদের অতিরিক্ত সময় ব্যাংক ইন্টারেস্ট দিতে হচ্ছে। তা পুষিয়ে নিতে এক প্রকার বাধ্য হয়েই বীজ আলু বেশি দামে বিক্রি করছেন ডিলাররা। একই নিয়মের কারণে বীজ আলু নির্দিষ্ট সময় পরে কৌশলে চলে যাচ্ছে অঞ্চলের নির্দিষ্ট কিছু ডিলারের দোকানে। সেই ডিলারেরা অতিরিক্ত দামে কৃষকের কাছে বিক্রি করছেন বীজ আলু।
সার বরাদ্দ ও বেশি দামে বিক্রির বিষয়টি জানতে চাইলে যুগ্ম পরিচালক (সার) মো. শওকত আলী বলেন, ‘সার সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। বেশি দামে বিক্রির বিষয়টি সঠিক নয়। আমার গোডাউন থেকে বরাদ্দকৃত সার নিতে ডিলারদের কাছে অতিরিক্ত কোনো টাকা নেওয়া হয় না। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
বীজ আলুর ব্যাপরে জানতে উপ-পরিচালক আব্দুর রশিদের (বীজ বিপণন) মোবাইল ফোন নাম্বারে গত দুইদিন কল করা হলে তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নুরুজ্জামান জানান, দিনাজপুর জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। খসড়া তালিকা অনুয়ায়ী দিনাজপুরে ৪৭ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হবে। এরমধ্যে আগাম জাতের আলু চাষ হবে ১১ হাজার হেক্টর জমিতে। এ পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলু বীজ রোপণ হয়ে গেছে। কয়েকদিনে মধ্যে আগাম আলু বীজ রোপণ শেষ হয়ে যাবে।
সার ও বীজ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এরকম খবর বা অভিযোগ তিনি পাননি। তবে তিনি জানান, যদি বেশি দামে সার বিক্রি হয়ে থাকে তাহলে তিনি খবর নিয়ে তদন্ত করে ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই সার বিক্রি করলে ক্যাশ মেমো দিতে হবে। যদি না দিয়ে থাকে, তা অন্যায়।’
জাগো
আআ/এগ্রিকেয়ার
























