এগ্রিকেয়ার ডেস্ক: পদ্মার চরে এখন দুচোখ যেদিকে যায়, শুধু হলুদাভ পেঁয়াজের খেত। ভোরের কুয়াশা কাটতেই ব্যস্ততা শুরু হয় চাষিদের। কেউ জমি থেকে পেঁয়াজ তুলছেন, কেউ বস্তা ভরছেন, কেউবা ঘোড়ার গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছেন আড়তে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও ভেড়ামারা উপজেলার চরাঞ্চলে এবার মুড়িকাটা পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু মাঠভরা এই সাফল্যের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে বাজারের দরে। ফলন ভালো হলেও দাম না থাকায় কৃষকের চোখে এখন লোকসানের জল।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি রবি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। দৌলতপুর উপজেলায় ৩ হাজার ২৪১ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও চাষ হয়েছে ৩ হাজার ৬৩০ হেক্টরে। ভেড়ামারার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের পদ্মার চরেও ২৫৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের ফলন হয়েছে বিঘা প্রতি ৭০ থেকে ৮০ মণ।

তবে এই অর্জন বাজারে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে। উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। সার, বীজ, কীটনাশক আর শ্রমিকের বাড়তি মজুরি দিয়ে এক বিঘা পেঁয়াজ আবাদে খরচ হচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা।

দৌলতপুরের চরপাড়া গ্রামের কৃষক জহুরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “এখন বাজারে যে দাম, তাতে খরচ তোলাই দায়। লাভ তো দূরের কথা।”

ভেড়ামারার কৃষক আরিফুল ইসলাম গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে এবার এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ৩৫ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন। বিনিয়োগ করেছিলেন প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। তিনি বলেন, “হঠাৎ ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্তে বাজার পড়ে গেছে। এভাবে চললে অন্তত ১৫ লাখ টাকা লোকসান হবে। ঋণ শোধ করব কীভাবে, বুঝতে পারছি না।”

একই দশা পাইকারি বাজারেও। কুষ্টিয়ার বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও আমদানিকৃত ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। ফলে দেশি পেঁয়াজের চাহিদা ও দাম—দুটোই কমছে। চাষিদের দাবি, ভরা মৌসুমে আমদানি চালু রাখায় দেশি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অবশ্য পেঁয়াজ উত্তোলনকে কেন্দ্র করে চরের নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বেড়েছে। প্রতিদিন ৩০০ টাকা বা তার বেশি আয় করছেন কুলসুম আরার মতো শত শত নারী। তবে মমেনা বেগমের মতো অনেকেরই আক্ষেপ, উৎপাদন খরচ বাড়ায় চরের মানুষের অভাব কাটছে না।

দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন জানান, বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষকদের মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভেড়ামারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা সুলতানা বলেন, আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলন বেশি হয়েছে, যে কারণে বাজারে দাম কিছুটা কম। তবে কৃষকদের দাবির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসা প্রয়োজন।

পদ্মার চরে এখন দ্বিমুখী বাস্তবতা। একদিকে মাঠভরা ফসলের সাফল্য, অন্যদিকে বাজারদরের হাহাকার। কৃষকদের প্রশ্ন একটাই—দেশে যখন পর্যাপ্ত উৎপাদন হচ্ছে, তখন কেন আমদানির চাপে তাঁদের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হতে হবে?