
ডেস্ক প্রতিবেদন, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই সহজে চাষযোগ্য, পুষ্টিকর ও লাভজনক ফল পেয়ারা। তুলনামূলক কম যত্নে ভালো ফলন দেয় বলে বাণিজ্যিক ও পারিবারিক বাগান—দুই ক্ষেত্রেই এর চাষ বাড়ছে। সঠিক জাত নির্বাচন, মাটি প্রস্তুতি, সার ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে সারা বছরই মানসম্মত ফল পাওয়া সম্ভব।
পেয়ারা উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর ফল। বাংলাদেশের আবহাওয়া এ ফল চাষের জন্য উপযোগী।
মাটি: প্রায় সব ধরনের মাটিতেই পেয়ারা চাষ করা যায়। তবে জৈব পদার্থসমৃদ্ধ দোআঁশ থেকে ভারী এঁটেল মাটি, যেখানে পানি নিষ্কাশনের সুবিধা আছে—সেসব জমিতে গাছ ভালো জন্মে। ৪.৫–৮.২ অম্লক্ষারত্বের মাটিতে সহজে জন্মায়।
পেয়ারার জাত:
- বারি পেয়ারা-১, ২, ৩
- বাউ পেয়ারা-১, ২, ৩, ৪, ৫
- থাই পেয়ারা ও অন্যান্য জনপ্রিয় জাত।
বংশ বিস্তার: বীজ দ্বারা বংশবিস্তার সহজ এবং মাতৃগুণ অনেকাংশে বজায় থাকে। তবে মানসম্মত চারা পেতে অঙ্গজ পদ্ধতি উত্তম। অঙ্গজ পদ্ধতির মধ্যে গুটি কলম বেশি প্রচলিত।
গর্তের আকার: গর্তের দৈর্ঘ্য ২ ফুট × প্রস্থ ২ ফুট × গভীরতা ১.৫ ফুট রাখতে হবে।
রোপণ দূরত্ব: চারা থেকে চারা ৪ মিটার বা প্রায় ১৩ ফুট, সারি থেকে সারি ৪ মিটার বা প্রায় ১৩ ফুট।
সারের পরিমাণ (প্রতি গর্তে):
- পচা গোবর ১০–১৫ কেজি
- টিএসপি ২৫০ গ্রাম
- পটাশ ২৫০ গ্রাম
- জিপসাম ২০০ গ্রাম
- জিংক ২০ গ্রাম
- বোরন ২০ গ্রাম
- দানাদার সার ২০ গ্রাম
সার প্রয়োগ পদ্ধতি: সব সার মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে ১০–১৫ দিন রেখে দিতে হবে।
চারা রোপণের সময়: মে থেকে সেপ্টেম্বর উপযুক্ত সময়। সেচের ব্যবস্থা থাকলে সারা বছরই রোপণ করা যায়। গর্ত ভরাটের ১০–১৫ দিন পর মাটি ঝুরঝুরে করে চারা সোজাভাবে বসিয়ে গোড়ার মাটি চেপে ধরতে হবে।
খুঁটি দেওয়া: চারা লাগানোর পর খুঁটি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে, যাতে গাছ হেলে না পড়ে।
সার ব্যবস্থাপনা: প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি, মে ও সেপ্টেম্বর—এই তিন কিস্তিতে সার দিতে হবে। সার গোড়ায় না দিয়ে গাছের ডালপালা যতদূর বিস্তৃত, সেই পরিধিতে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে।
গাছের বয়স ১–২ বছর:
- পচা গোবর ১০–১৫ কেজি
- ইউরিয়া ১৫০–২০০ গ্রাম
- টিএসপি ১৫০–২০০ গ্রাম
- পটাশ ১৫০–২০০ গ্রাম
গাছের বয়স ৩–৫ বছর:
- পচা গোবর ২০–৩০ কেজি
- ইউরিয়া ২৫০–৪০০ গ্রাম
- টিএসপি ২৫০–৪০০ গ্রাম
- পটাশ ২৫০–৪০০ গ্রাম
গাছের বয়স ৬ বছরের বেশি হলে:
- পচা গোবর ৪০ কেজি
- ইউরিয়া ৫০০ গ্রাম
- টিএসপি ৫০০ গ্রাম
- পটাশ ৫০০ গ্রাম
সেচ ব্যবস্থাপনা: চারা রোপণের পর মাটি শুকনো থাকলে পানি দিতে হবে। বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে বছরে ৮–১০ বার সেচ প্রয়োজন। ফলন্ত গাছে শুষ্ক মৌসুমে ১০–১৫ দিন পরপর সেচ দিলে ফল ঝরা কমে, ফল বড় হয়। তবে গোড়ায় পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
অঙ্গ ছাঁটাই: মরা, রোগাক্রান্ত ও অপ্রয়োজনীয় ডালপালা কেটে ফেলতে হবে। মাটি থেকে ১–১.৫ মিটার ওপরে চারদিকে ছড়ানো ৪–৫টি প্রধান ডাল রেখে বাকিগুলো ছাঁটাই করতে হবে। ফল সংগ্রহের পর সেপ্টেম্বর–অক্টোবর মাসে ছাঁটাই করলে নতুন ডাল বের হয় ও ফলন বাড়ে।
ডাল নুয়ে দেওয়া: খাড়া ডালে ফল কম হয়। তাই ডালপালা নিচের দিকে বাঁকিয়ে বেঁধে দিলে নতুন শাখা বেশি গজায় এবং ফলন বাড়ে।
ফল ছাঁটাইকরণ: অতিরিক্ত ফল থাকলে মার্বেল আকারে থাকা অবস্থায় ৫০–৬০ শতাংশ ফল ছাঁটাই করা দরকার। এতে ফল বড় হয়, ডাল ভাঙে না এবং গাছ দীর্ঘদিন ফল দেয়। কলমের গাছে প্রথম বছর ফল না রাখাই ভালো।
ফল ব্যাগিং: ছোট ফল অবস্থায় ব্যাগিং করলে পোকা, রোগ, পাখি ও বাদুড়ের আক্রমণ কমে। ছোট ছিদ্রযুক্ত পলিথিন বা বাদামি কাগজ ব্যবহার করা যায়। ব্যাগিংয়ের আগে প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে ছত্রাকনাশক মিশিয়ে স্প্রে করা যেতে পারে।
পেয়ারা সংগ্রহ: গ্রীষ্মের শেষ থেকে বর্ষা এবং শীতকালেও ফল পাওয়া যায়। পুষ্ট ফল হালকা সবুজ বা হলুদাভ হলে সংগ্রহ উপযোগী। বেশি পেকে গেলে স্বাদ কমে যায়। বোঁটাসহ ফল সংগ্রহ করলে বেশি দিন সতেজ থাকে। প্রখর রোদ বা বৃষ্টির সময় ফল না তোলাই ভালো। একটি গাছ প্রথম দিকে ৪০০–৫০০টি ফল দেয়, বয়স বাড়লে ৯০০–১০০০টি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। ৮–১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্রায় চার সপ্তাহ সংরক্ষণ করা যায়।
























