
রাজধানীর বাজারে হঠাৎ বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। তেল কিনতে এসে না পেয়ে অনেক ক্রেতাকে খালি হাতে ফিরতে দেখা গেছে। রাজধানীর অধিকাংশ সুপার শপ ও মুদি দোকানে নেই বোতলজাত সয়াবিন তেল। আবার তিন বা পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল থাকলেও ১-২ লিটারের বোতল নেই। কিছু কিছু মুদি দোকানে খোলা সয়াবিন তেল পাওয়া গেলেও দাম বেড়ে কেজিতে গুনতে হচ্ছে ২০০ টাকা। এ দিকে বাজারে শীত মৌসুমের সবজির সরবরাহ ভালো থাকলেও তুলনামূলক দাম বেশি।
শুক্রবার রাজধানীর শেওড়াপাড়া, মতিঝিল, হাতিরপুল, কাওরানবাজারসহ অন্য বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সকালে যারা বাজারে গেছেন ভোজ্যতেল না পেয়ে তাদের অনেকেই হতাশ। অনেকে খালি হাতেই ফিরছেন বাসায়। হাতেগোনা কয়েকটি দোকানে মিলছে দু-একটি কোম্পানির সয়াবিন তেল। সেখানেও হাঁকানো হচ্ছে বাড়তি দাম।
রাজধানীর মিরপুর-৬ বাজারে পাঁচটি মুদি দোকান ঘুরে দুই লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল কিনতে পেরেছেন সত্তরোর্ধ্ব আবদুল হালিম। তাও গায়ের দামের চেয়ে ৬ টাকা বেশি দিয়ে কিনেছেন ৩৪০ টাকায়। রূপনগর এলাকার এই বাসিন্দা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সয়াবিন তেলের জন্য দোকানে দোকানে ঘুরতে হলো। বাজারে তেল নাই, এটা তো বাসায় বোঝে না। যেভাবেই হোক তেল নিতে হবে। তেল না থাকলে রান্না হবে না। পরিচিত দোকানেও তেল পেলাম না।’
এ দিকে খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, গত এক সপ্তাহ ধরে বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ কম। বোতলজাত সয়াবিন তেলের সঙ্কট সবচেয়ে বেশি। ফলে বিক্রেতারা পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। কোনো কোনো বিক্রেতার অভিযোগ, রমজান মাস শুরুর আগে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে আরো এক দফা দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করে নিতে চায় কোম্পানিগুলো।
মিরপুর দুয়ারিপাড়া বাজারের পাঁচ-ছয়টি মুদি দোকান ঘুরেও মেলেনি সয়াবিন তেল। আনিস নামের একজন বিক্রেতা বলেন, কোম্পানি দাম বাড়াবে, এখন সরবরাহ বন্ধ। দু-তিন দিন ধরে কোনো সয়াবিন তেল বাজারে ঢুকছে না। সরকার দফায় দফায় শুল্ক-কর কমালেও সয়াবিন তেলের আমদানি বাড়েনি। অন্য একজন বিক্রেতা জানান, অনেক দোকানে সয়াবিন তেল নেই। অনেকেই আবার মজুদ করছেন, যেন দাম বাড়লে বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন। এসব কারণে ভোজ্যতেলের সঙ্কট তৈরি হয়েছে। ক্রেতারা দোকানে এসে তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
তবে কয়েকটি দোকানে প্যাকেটজাত সয়াবিন পাওয়া গেছে। এসব দোকানগুলোতে নির্ধারিত দামে বা কিছুটা বাড়তি দামে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রূপচাঁদা এক লিটার সয়াবিন তেলের গায়ের দাম ১৬৭ টাকা, দুই লিটার ৩৩৪ টাকা ও পাঁচ লিটার ৮১৮ টাকা। বেশিরভাগ দোকানে এ দামের চেয়ে ৫-১০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সম্প্রতি পাম ও সয়াবিন তেল আমদানিতে শুল্ক-কর কমিয়েছে সরকার। এতে প্রতি কেজি ভোজ্যতেল আমদানিতে শুল্ক-কর ১০-১১ টাকা কমানো হয়। কিন্তু এতেও আমদানি বাড়েনি; বরং বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বোতলজাত সয়াবিন তেলের সঙ্কট সবচেয়ে বেশি। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা চাহিদার ১০ শতাংশ তেলও পাচ্ছেন না। উল্টো দাম বাড়েছে লিটারপ্রতি অন্তত ৫ থেকে ৭ টাকা।
রাজধানীর অধিকাংশ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ দোকানে বোতলজাত ভোজ্যতেল নেই। কিছু দোকানে পাঁচ লিটারের বোতল থাকলেও তা খুবই সীমিত। এক বা তিন লিটারের বোতল একেবারেই নেই। অনেক দোকানি শুধু নিয়মিত ও পরিচিত ক্রেতাদের কাছে তেল বিক্রি করছেন। সেখানেও নেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত দাম। কিছু ক্ষেত্রে খোলা তেল বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েল লিটারপ্রতি ৫ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে খোলা পাম অয়েল ১৬০-১৬২ এবং সয়াবিন ১৭০-১৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন ১৬৭ টাকা, দুই লিটার ৩৩৪ টাকা ও ৫ লিটার ৮১৮ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
এ দিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিলাররা তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। তেল কেনার জন্য আটা-ময়দার বস্তা কেনার শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন। অন্য দিকে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে তেল সরবরাহ কমেছে বলে দাবি আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর। তারা বলছেন, বিশ্ববাজারের হিসাবে লিটারে ১০-১৩ টাকা দাম বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় আমদানি কমেছে ২০ শতাংশের মতো।
তবে আমদানিকারকদের এমন দাবির সাথে একমত নন ভোক্তারা। আসিফ নামের একজন ক্রেতা বলেন, তেল আমদানি হয়েছে তিন-চার মাস আগে। অথচ এখন বলা হচ্ছে বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে। এটি আসলে অযৌক্তিক কথা। তিনি বলেন, কর ও শুল্ক কমানোর পরও তেলের দাম না কমে উল্টো বেড়েছে। এখন আবার নতুন করে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। সরকারের শক্ত পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতহার তাসলিম বলেন, ‘সরকার শুল্ক-কর যা কমিয়েছে, তার চেয়ে বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে বেশি। কোম্পানিগুলো লোকসানের ঝুঁকিতে থাকলেও সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। গত মাসের তুলনায় চলতি মাসে সরবরাহ বাড়িয়েছে।’
সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অনেক বেড়েছে। স্থানীয় বাজারে দাম বাড়াতে আমরা ১০ দিন আগে ট্যারিফ কমিশনের কাছে চিঠি দিয়েছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত এলে এ বিষয়ে কথা বলতে পারব।’
কোনো পণ্যের ওপর শুল্ক-কর কমানো মানে ওই পণ্যের আমদানি বাড়বে এবং দাম কমবে। গত অক্টোবরে সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে দুই দফায় শুল্ক-কর কমায় সরকার। প্রথম দফায় ১৭ অক্টোবর ও দ্বিতীয় দফায় ১৯ নভেম্বর শুল্ক-কর কমিয়ে তা নামিয়ে আনা হয় ৫ শতাংশে। কিন্তু দেশের বাজারে পণ্যটির দাম কমার বিপরীতে উল্টো বাড়তে দেখা যায়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দেশে অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেল আমদানি হয়েছে তিন লাখ ৬৮ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে এই আমদানির পরিমাণ ছিল চার লাখ ৬০ হাজার টন। সে হিসাবে আমদানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। এ ছাড়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে এবার আমদানিকারকের সংখ্যাও কমেছে।
এদিকে রাজধানীর বাজারে শীতের সবজি ফুলকপি ও বাঁধাকপি এলেও দাম তুলনামূলক বেশি। প্রতি পিস ছোট আকারের ফুলকপি ৩০-৩৫ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ টাকা, ছোট আকারের লাউ ৪০-৫০ টাকার মধ্যে, মাঝারি আকারের লাউ ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ১০০ টাকা, শিম ৭০ টাকা, বেগুন মানভেদে ৫০-৬০ টাকা, বরবটি প্রতি কেজি ৭০ টাকা, পেঁপে প্রতি কেজি ৫০ টাকা, টমেটো প্রতি কেজি ১২০ টাকা, করলা প্রতি কেজি ৬০ টাকা, দেশী গাজর প্রতি কেজি ১০০ টাকা, চায়না গাজর প্রতি কেজি ১৫০ টাকা, পটোল প্রতি কেজি ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া প্রতি ডজন সাদা ফার্মের ডিম ১৩৫ টাকা, লাল ফার্মের ডিম ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাঁসের ডিম ডজন প্রতি ২২০ টাকা, দেশী মুরগির ডিম ডজন প্রতি ২৪০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। মুরগির বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩০০ টাকা, দেশী মুরগি ৫২০ থেকে ৫৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
























