পোল্ট্রি ডেস্ক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: করোনা মহামারির কঠোর আঘাতে বেকার হয়ে পড়েছে পোল্ট্রি খাতের ২০ লাখ মানুষ। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) তথ্য বলছে, করোনার আগে সারাদেশে প্রতি সপ্তাহে পোলট্রি মুরগির আড়াই কোটি বাচ্চা উৎপাদিত হতো। সেটি কমে এখন ১ কোটি ২৫ লাখে নেমেছে। অর্থাৎ, উৎপাদন ৫০ শতাংশ কমে গেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, করোনার প্রভাবে দেড় বছরে পোল্ট্রিশিল্পের ক্ষতি হয়েছে সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকা। এ খাতে ৫০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। গত দুই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ভুট্টার দাম ৫০ শতাংশ, সয়ামিলের দাম ৪৪ শতাংশ ও কাঁচামাল পরিবহনের খরচ ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। সার্বিকভাবে কাঁচামালের দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশ, যার প্রভাব পড়েছে পোলট্রিশিল্পের ওপর।

পড়তে পারেন: অধিকাংশ পোল্ট্রি খামার বন্ধ, বাচ্চা উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে

এদিকে বাংলাদেশ পোল্ট্রি খামার রক্ষা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, বাচ্চা উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণই হচ্ছে পোল্ট্রি সেক্টরে ক্রমাগত পোল্ট্রি পণ্য উৎপাদন নিম্মমুখী হওয়া। ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের বাজেটে পোল্ট্রি খাদ্যের মূল্য কমানোর ঘোষণা থাকলেও বাজেটের ঘোষণা অপেক্ষা করে বাজেট ঘোষণার পর তিন দফায় পোল্ট্রি খাদ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। যথাক্রমে প্রথমে ৫০ টাকা বছরের শুরুতেই, এরপর ৭৫ টাকা এবং সর্বশেষ ১০০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়। বাজেটের আগে ২৭৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়। মোট ৫০০ টাকা একবস্তা খাদ্যে বৃদ্ধি হলে খামারিরা কিভাবে লাভ করবে! খাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে খামারিরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছে এবং খামারিদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বর্তমানে পোল্ট্রি খামার ধ্বংসের পথে। মূলত এ কারণেই খামার বন্ধ হয়ে গেছে। ফলাফল হিসেবে উৎপাদন না থাকায় বেড়েছে পোল্ট্রি পোল্ট্রি পণ্যের দাম।

বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগেও ছিল ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা। অন্যদিকে পাকিস্তানি কক মুরগি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকা, যেটা এক মাস আগে ছিল ২০০ থেকে ২১০ টাকা। এ ছাড়া গত এক মাসে প্রতি কেজি লেয়ার মুরগির দাম ২১০-২২০ টাকা থেকে বেড়ে ২৪০-২৫০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৩৮০ টাকা থেকে ৪২০ টাকায় উঠেছে।

পড়তে পারেনপোল্ট্রি ফিডের বস্তায় ৩৫০ টাকা কমানোর দাবি

পোল্ট্রিশিল্পে অস্থিরতার কারণ হিসেবে খাত সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি বলেন, দেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে পোলট্রির চাহিদা কমতে থাকে। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সবকিছু ছিল স্থবির। সারা দেশে অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পর আবার পোলট্রি পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকে। কিন্তু সেই তুলনায় সরবরাহ বাড়েনি। ফলে বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে।

জানতে চাইলে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ারুল হক বলেন, চাহিদার তুলনায় বাজারে সরবরাহ না থাকায় পোল্ট্রির বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। আর পোলট্রির মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে পোল্ট্রি ফিড ভুট্টা, সয়ামিলসহ এই খাতের কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে তাদের কাছ থেকে নিবন্ধন নেওয়া খামারির সংখ্যা ৮৫ হাজার ২২৭। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, করোনার আগে সারা দেশে খামারির সংখ্যা ছিল দেড় লাখের মতো। তবে করোনার কারণে কতটি খামার বন্ধ হয়েছে, সেই তথ্য কারও কাছে নেই।

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জনজীবন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসায় হোটেল-রেস্তোরাঁ খুলেছে। দেশজুড়ে বিয়েশাদি বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রাবাস চালু হয়েছে। নির্মাণশিল্পেও কাজের গতি এসেছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলো খুলেছে। সব মিলিয়ে সারা দেশেই ব্রয়লার মুরগির চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন বাড়েনি, যার প্রভাব পড়েছে বাজারে।

জানতে চাইলে বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে, কিন্তু সে হারে সরবরাহ বাড়েনি। সরবরাহ বাড়তে আরও কিছু সময় লাগবে। নভেম্বরের শেষের দিকে গিয়ে পোল্ট্রির দাম স্বাভাবিক হবে। তিনি আরও বলেন, পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামালের দামও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম কমে আসার পাশাপাশি খামারিরা যখন আবার পুরোদমে খামার চালু করবেন, তখন দাম কমবে।

২০১৯ সালে করোনার আগে লক্ষ্মীপুর সদরে পোলট্রি খামার করেন তারিকুল ইসলাম। করোনা মহামারি শুরুর পর দীর্ঘ ১০ মাস খামার বন্ধ ছিল। খামার আবার চালু করেছেন ঠিকই, কিন্তু পোল্ট্রি ফিডের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেশ বিপাকেই পড়েছেন এই খামারি। তিনি বলেন, নারিশ পোল্ট্রি ফিড ৫০ কেজির এক বস্তার দাম করোনার আগে ছিল ২ হাজার ২৫০ টাকা (প্রতি কেজি ৪৫ টাকা)। সেই বস্তা এখন কিনতে হচ্ছে, ২ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি কেজি ফিডের এখন দাম পড়ছে ৫৪ টাকা।

এদিকে পোল্ট্রির কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে বেশ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এর কাঁচামাল বিদেশে রপ্তানি করতে শুরু করেছেন। এমন বাস্তবতায় দাম স্বাভাবিক রাখতে ১২ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পোল্ট্রি তৈরির অন্যতম কাঁচামাল সয়ামিল রপ্তানি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।

ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যক্তিরা বলছেন, ভারতকে সুবিধা দিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশের মুরগি, গবাদি পশু ও মৎস্য চাষে যুক্ত উদ্যোক্তরা। বাংলাদেশ প্রয়োজনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সয়াবিন উৎপাদন করে। বাকিটা ভারত, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হয়। চলতি বছর ভারতে উৎপাদন কম হওয়ায় দেশটিতে সয়াবিনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আগামী অক্টোবর মাসের আগে দেশটিতে সয়াবিন ক্ষেত থেকে উঠবে না। আর আমদানি করা হলেও সব মিলিয়ে ভারতে তা পৌঁছাতে সময় লাগবে কম করে হলেও ৬০ দিন। আর আমদানি করলেও সয়াবিনের কেজি পড়বে ৮৮ টাকা। সেখানে ৬০ টাকার নিচে বাংলাদেশ থেকে কিনতে পারবে ভারতের ব্যবসায়ীরা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইমরান হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সয়াবিনের খইল ভারতে রপ্তানি হবে এমন খবরেই কেজিপ্রতি ১০ টাকা দাম বেড়ে গেছে। আর এখন রপ্তানি শুরু হওয়ায় দাম আরও বাড়বে। তাতে বাংলাদেশে ফিড উৎপাদনে খরচ বাড়বে। কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়বে গরুর মাংসের দাম। মানুষকে বাড়তি দাম দিয়ে কিনতে হবে গরুর মাংস। সেইসঙ্গে বাড়বে পোলট্রি মুরগি, ডিম, দুধ ও মাছের দাম। আমিষের ঘাটতি মেটানো দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’

হিসাব করে দেখা গেছে, এক কেজি সয়াবিনে ১৮ শতাংশ তেল, ৪ শতাংশ ওয়েস্টেজ (বর্জ্য) ও ৭৮ শতাংশ খইল হয়। ব্যবসায়ীরা বিনা শুল্কে বিদেশ থেকে সয়াবিন আনার সুযোগ পান। খইল বিক্রি হয় দেশের ফিড মিলগুলোতে। গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কাঁচামালের দাম ৩৪ দশমিক ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফিড বানাতে অন্তত ১৬টি কাঁচামালের দরকার পড়ে। এর মধ্যে প্রতি কেজি মাছের (রাবিশ) গুঁড়ার দাম ৩২ টাকা, খুদ চালে ১২.১১ টাকা, ভুট্টায় ১২ টাকা, সয়াবিনের খইলে ১৬.২৫ টাকা ও সয়াবিন তেলের দাম লিটারে বেড়েছে ৫৫.৯০ পয়সা।

ভারতে রপ্তানির ঘোষণায় প্রতি কেজি সয়াবিনের দাম বেড়েছে ১০ টাকা। একটি পোলট্রি মুরগি লালন-পালনের আয়ুষ্কাল হয় ৩৫ থেকে ৩৭ দিন। এ সময়কালে মুরগিপ্রতি অন্তত তিন কেজি তৈরি খাবার দিতে হয়, সেখান থেকে পাওয়া যায় দেড় কেজি মাংস। এক কেজি খাবার বা ফিডে প্রায় ৩০ শতাংশ সয়াবিনের খইল বা সয়াবিন মিলের দরকার পড়ে। সেক্ষেত্রে প্রতি কেজি মাংস উৎপাদনে ৬.২৫ টাকা প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় বাড়লে খুচরা পর্যায়ে তা আরও অনেক বেশি বাড়বে। এতে শুধু প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নয়, অনেক ছোট ছোট ফিড মিল বন্ধ হয়ে যাবে।

কারখানা মালিকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩০০ ফিডমিল থাকলেও চালু রয়েছে মাত্র ১০০টি। এরমধ্যে দেশীয় ফিডমিলগুলোর বড়রকম লোকসান টানার মতো ক্ষমতা নেই। যদি ফিড উৎপাদনে খরচ বাড়ে তাহলে অনেক ফিডমিল বন্ধ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে বিদেশি বহুজাতিক ফিডমিলগুলো টিকে থাকতে পারবে লোকসান দিয়েও। অথচ এ খাতে এখনো দেশীয় ফিডমিলগুলো বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে আছে। এ খাতে ফিড, পোলট্রির মাংস, ডিম, গরুর মাংস ও মাছ মিলিয়ে অন্তত দুই লাখ কোটি টাকার বাজার তৈরি হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ বাজার চলে যাবে বিদেশি কোম্পানির হাতে। দেশীয় অর্থনীতির অন্যতম একটা বৃহৎ খাত শেষ হয়ে যাবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের ফিডমিলগুলোতে ব্যবহৃত কাঁচামালের অধিকাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশীয় সয়াবিন ছাড়াও ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা প্রভৃতি দেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশে ‘সয়াবিন খইলের’ চাহিদা বছরে প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৭৫-৮০ ভাগ দেশীয় সয়াবিন তেল উৎপাদকারী প্রতিষ্ঠান থেকে এবং বাকিটা আমদানি করা হয়। দেশে উৎপাদিত সয়াবিন খইলের একমাত্র ক্রেতা হচ্ছে পোলট্রি, মৎস ও গবাদি পশুর ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ খামারিরা।

এগ্রিকেয়ার/এমএইচ