মেহেদী হাসান, নিজস্ব প্রতিবেদক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: আম-লিচুর ফলন নির্ভর করে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। তীব্র ক্ষরা ও বৃষ্টি না হওয়ায় লিচুর জন্য তৈরি হয়েছে বৈরি আবহাওয়া। এবার রাজশাহীতে তুলনামূলক লিচুর মুকুল ও গুটি কম ধরেছে। যেসব গাছে গুটি ধরেছে সেসবও তীব্র ক্ষরায় ঝরে পড়ছে। তবে, কৃষি ও ফল গবেষণা কেন্দ্র বলছে-প্রতিটি ছড়ায় ১ থেকে ১৫টি গুটি ধরলেও মাত্র ২ থেকে ৩ টি থাকলেই শতভাগ ফলন হয়। চাষিদের এ বিষয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছুই নেই।

চাষিরা বলছেন, গতবছর করোনার কারণে আমের ভালো দাম পাননি। আর এ লোকসানের কারণে আম গাছের পরিচর্যাও করেননি। ফলে আমের গাছে মুকুল কম এসেছে। মুকুল না আসা গাছগুলোতে নতুন পাতা গজিয়ে গাছগুলো বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। কিছু গাছে গুটি আসলেও ঝরে পড়ায় চাষিরা এখন ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। দীর্ঘদিন বৃষ্টির দেখা না থাকায় বাগানে সেঁচ দিয়েও কাজে আসছে না। ফলে লিচুর গুটি ঝরে যাওয়ায় লিচু উৎপাদন নিয়ে বেগ পেতে হতে পারে এমনটাই আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে অভিজ্ঞ চাষিরা বলছেন- আম লিচুর গুটি ঝরবেই। এটা স্বাভাবিক।

পড়তে পারেন: রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে এবার রেকর্ড আম উৎপাদনের আশা

আজ জেলার ছোট বনগ্রাম ও বড় বনগ্রাম এলাকার কয়েকজন আম ও লিচু চাষির সাথে কথা হয়। এক লিচু চাষি জানান, গতবছরে আমের দামে তাদের লোকসান গুণতে হয়েছে। আগাম জাতের লিচু বাজারে বিক্রি করার সুযোগ মিললেও বেশিরভাগ চাষি ধরা খায়। দীর্ঘ ১ বছর পেরিয়ে এবছরও গাছে মুকুল আসেনি। যেসব গাছের এসেছে আবহাওয়া রুক্ষ ও মাটি শুকনো হওয়ায় লিচুর গুটি ঝরে পড়ছে। ভুক্তভোগী চাষিদের ধারণা, ক্রমাগত আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণেই গাছ থেকে গুটিগুলো ঝরে পড়ছে।

নগরীর বড় বনগ্রাম চকপাড়া গ্রামের এক লিচুচাষি জানান, গত বছরে ভুল কীটনাশক দিয়ে লিচুর বেশ ক্ষতি হয়েছিল। এছাড়া লিচু গাছে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বোম্বাই ও দেশী জাতের মোট ২০ বিঘা লিচুর বাগান আছে। ৯বিঘায় ৮১ টি গাছের মধ্যে হাতেগুণা ৪-৫টি গাছে লিচু এসেছে। তারমধ্যে আবহাওয়ার কারণে ঝরে যাচ্ছে। এবার লাখ-দেড়েক টাকা লোকসান হবে।

পড়তে পারেন: লিচু গাছে মুকুল আসা থেকে ফল ধরা পর্যন্ত পরিচর্যা

প্রতিটি মাঝারি গাছে ফসফেট,পটাশ, জিঙ্ক, বোরণ, জিপসাম মিলিয়ে ৫ কেজি করে সার দিতে হয়। লিচু সংগ্রহের পর থেকে গাছের যত্ন করে গাছ ভালো রাখতে হয়। চাষ দিয়ে আগাছা পরিস্কার করতে হয়। পরিশ্রম করেও লিচু আসলো না। বোম্বাই লিচু এক বছর আসলে পরের বছর আর ধরে না। কিন্তু দেশী গুটি জাতের লিচু প্রতিবছর ধরে। আমার কোনটাই হলো না। কিছু করার নাই, আল্লাহ ভরসা।

বাগমারার তাহেরপুর পৌর সদর এলাকার চাষী শামীম রেজা জানালেন, এ বছর এ পর্যন্ত যে পরিমাণ গুটি আছে তা গতবারের চেয়ে কম। আবহাওয়া তেমন ভালো না, বৃষ্টিপাত নাই। সামনে আবার কালবৈশাখী ঝড় আছে। ঝড়ের পর আসলে বোঝা যাবে কি হবে।

পড়তে পারেন: জেনে নিন লিচুর গুটি ঝরা রোধে এখন যা যা করতে হবে (ভিডিও)

বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম এলাকার আম ব্যবসায়ী ও আম চাষী জিল্লুর রহমান জানান, ‘আমি প্রতিবছরই আম চাষ করি। এবার আমের গুটি কম এসেছে। আমরা চাষীরা মুকুল আসার আগে থেকেই গাছের পরিচর্যা করছি। এখন বর্তমানে গুটির পরিচর্যা চলছে। গাছের গুটি কীটনাশক ও বিভিন্ন ধরনের বালাইনাশক দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছি। তারপরেও তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় গুটি ঝরছে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র অনুযায়ী, ২০২০-২১ মৌসুমে জেলায় আমবাগান ছিল ১৭ হাজার ৯৪৩ হেক্টর। সেবার মোট উৎপাদন হয় ২ লাখ ১৭ হাজার ১২৮ টন। প্রায় ৮৬ কোটি ৮৫ লাখ ১২ হাজার টাকার আম বিক্রি হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজশাহী জেলায় মোট আমবাগান ছিল ১৭ হাজার ৬৮৬ হেক্টর। ওই মৌসুমে আম উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৭৯ হাজার ৫৪০ দশমিক ৫৩ টন। ওই মৌসুমে আম বাণিজ্য হয় প্রায় ৭১ কোটি ৮১ লাখ ৬২ হাজার টাকার।

পড়তে পারেন: আমের মুকুল ও কুড়ি ঝরা রোধে করণীয়

মৌসুমে আম- লিচুর ফলন নির্ভর করে মূলত প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পরিচর্যার ওপর। গতবারের তুলনায় এবার গাছে মুকুল ভালোই আছে। গাছে গাছে আম- লিচুর গুটি দেখা দিয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে অধিকাংশ গাছ থেকেই গুটি ঝরে পড়ছে। এক সপ্তাহ ধরে এই অবস্থা। এ কারণে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন আম-লিচু চাষিরা।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলীম উদ্দীন জানান, চলতি মৌসুমে আমের মুকুল বেশি হয়েছে। সাধারণত আমগাছে মুকুল আসার পর হপার পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। সে ক্ষেত্রে নিয়মানুযায়ী পোকা মারা কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেছেন চাষীরা। লিচুর ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়।

তিনি আরোও জানান, ম্যানকোজেব জাতীয় ছত্রাক নাশক এবং ইমিটাক্লোপিড জাতীয় কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে (ম্যানকোজেব ২ গ্রাম ও ০.৫ মিলি ইমিটাক্লোপিড) তিন বার স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হয়। একবার মুকুল আসার আগে, মুকুল ফোটার আগে এবং আম মটর দানার মতো হলে। রাজশাহীর আম চাষীরা আগে থেকেই যেহেতু অভিজ্ঞ সেহেতু তারা খুব সহযেই আমের যত্ন নিতে পারেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।

পড়তে পারেন: আমের গুটি ঝরা রোধে করণীয় (ভিডিও)

কৃষি বিশেষজ্ঞ ডা. আউয়াল বলেন, দীর্ঘ ৫ মাস ধরে বৃষ্টি নাই। মাটিতে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। তাপমাত্রা প্রায় ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। অতিরিক্ত ক্ষরার কারণে আম-লিচুর গুটি ঝরে যেতে পারে। বাগানে মাটিতে জো-হারিয়ে মাটি শুকিয়ে গেলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

হটাৎ করে বৃষ্টি হলেও গুটি ঝরে যায়।আবার সেঁচ দিলেও গুটি ঝরে যেতে পারে। এক্ষেত্রে চাষিদের করণীয় হলো, থেমে থেমে সেঁচ দেওয়া। মাটিতে হারানো জো-ফিরিয়ে আনতে অল্প-অল্প করে ২-৩ দিন পর পর কয়েকটা সেঁচ দিতে হবে। মাটিতে জো আসলেই গুটি ঝরা রোধ হবে। আপাতদৃষ্টিতে গুটি ঝরে যাচ্ছে বলে মনে হলেও তেমনটা হয় না। প্রতি মুকুলে ১০-১৫টি গুটি আসলেও ১-২টি ফল হৃষ্টপুষ্ট হয়। সেটিই আমে পরিণত হয়। তাই চাষিদের এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া ঠিক হবে না।

এগ্রিকেয়ার/এমএইচ