নিজস্ব প্রতিবেদক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মেসবাহুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ বছর রংপুর থেকে ২ লাখ মেট্টিক টন আলু মালয়েশিয়ায় রফতানি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে কাজ করছে। উৎপাদিত কোনো ফসলই যেন নষ্ট না হয় সেই ব্যাপারে কৃষি বিভাগও সজাগ। এফএও আলু রফতানির ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালীকরণের লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে।

শনিবার (৩ এপ্রিল ২০২১) দুপুরে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার তিন নম্বর পায়রাবন্দ ইউনিয়নে আলু রফতানি কার্যক্রমের উদ্বোধনী আয়োজনে মেসবাহুল ইসলাম এ কথা বলেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা -এফএও, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন এবং সারা বাংলা কৃষক সোসাইটি যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিনিয়র সচিব বলেন, এখন আমাদেরকে উদ্বৃত্ত আলু নিয়ে কাজ করতে হবে। আলু রফতানির প্রক্রিয়াকে প্রতিযোগিতায় রুপান্তরিত করতে হবে। যাতে সবার মধ্যে রফতানিকারক হবার আগ্রহ তৈরি হয়। একই সঙ্গে আলু রফতানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ উপযোগী আলুর জাত উদ্ভাবিত করতে হবে।

তিনি আরোও বলেন, বাংলাদেশ প্রতি বছর ১ কোটি ১০ লাখ মেট্টিক টনের বেশি আলু উৎপাদন করে। যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ মেট্টিক টন উদ্বৃত্ত। উদ্বৃত্ত আলুর ব্যবহারের উপায় বের করার সঙ্গে মূল্য সংযোজন ধারায় সম্পৃক্ত কৃষক এবং অন্যদের জন্য বিশাল সমৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এর গুরুত্ব সম্পর্কে কৃষি মন্ত্রণালয় ভালোভাবে অবহিত রয়েছে। এ কারণে রফতানির ওপর গুরুত্ব বাড়িয়েছে সরকার।

মেসবাহুল ইসলাম বলেন, এফএও এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর আলুচাষিদের সংগঠনগুলোকে রফতানিকারক, রিটেইল চেইন শপ এবং কোল্ড স্টোরেজের সঙ্গে যুক্ত করেছে। রফতানিকারকদের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে গত বছর সংগঠনগুলো মোট এক হাজার মেট্রিক টন আলু রফতানি করেছিল। এ বছর আরও অধিক রফতানিকারকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। এতে ন্যায্যমূল্যে আলু বিক্রি ও রফতানি করা হবে। রংপুর থেকে এবার ২ লাখ মেট্টিক টন আলু মালয়েশিয়ায় যাবে। এছাড়া নেপাল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আলু রফতানির পরিকল্পনা রয়েছে।

এফএওর সিনিয়র উপদেষ্টা মাহমুদ হোসেনের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ড. অমিতাভ সরকার, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষনা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক ড. এছরাইল হোসেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক খন্দকার ওয়াহেদ, রংপুর জেলা প্রশাসক আসিব আহসান ও সারাবাংলা কৃষক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক সর্দার প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আলু উৎপাদনকারী, রফতানিকারক, সরকারি কর্মকর্তা, এফএও বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা এবং মিঠাপুকুর, বদরগঞ্জ, পীরগাছা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকার আলুচাষিরা উপস্থিত ছিলেন।

তীব্র ক্ষরায় ঝরে পড়ছে আম-লিচুর গুটি

আম-লিচুর ফলন নির্ভর করে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। তীব্র ক্ষরা ও বৃষ্টি না হওয়ায় লিচুর জন্য তৈরি হয়েছে বৈরি আবহাওয়া। এবার রাজশাহীতে তুলনামূলক লিচুর মুকুল ও গুটি কম ধরেছে। যেসব গাছে গুটি ধরেছে সেসবও তীব্র ক্ষরায় ঝরে পড়ছে।

চাষিরা গতবছরের আম্ফান ঝড়ে লিচুতে বেশ ধরা খায়। এবার সেসব বাগানে গাছে গাছে নতুন পাতা গজিয়ে গাছগুলো বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। কিন্তু লিচুর দেখা নেই। কিছু গাছে গুটি আসলেও ঝরে পড়ায় চাষিরা এখন ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। দীর্ঘদিন বৃষ্টির দেখা না থাকায় বাগানে সেঁচ দিয়েও কাজে আসছে না। ফলে লিচুর গুটি ঝরে যাওয়ায় লিচু উৎপাদন নিয়ে বেগ পেতে হতে পারে এমনটাই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আজ শনিবার (৩ এপ্রিল ২০২১) জেলার ছোট বনগ্রাম ও বড় বনগ্রাম এলাকার ৮-১০ জন লিচুচাষির সাথে কথা হয়। এসব চাষিরা জানান, গতবছরে আম্ফান ঝড়ে লিচুর ক্ষতি হয়েছে। লোকসান গুণতে হয়েছে চাষিদের। আগাম জাতের লিচু বাজারে বিক্রি করার সুযোগ মিললেও বেশিরভাগ চাষি ধরা খায়। দীর্ঘ ১ বছর পেরিয়ে এবছরও গাছে মুকুল আসেনি। যেসব গাছের এসেছে আবহাওয়া রুক্ষ ও মাটি শুকনো হওয়ায় লিচুর গুটি ঝরে পড়ছে। ভুক্তভোগী চাষিদের ধারণা, ক্রমাগত আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণেই গাছ থেকে গুটিগুলো ঝরে পড়ছে।

নগরীর বড় বনগ্রাম চকপাড়া গ্রামের লিচুচাষি সাহাবির রহমান বলেন, আমার ৪টি বাগান ইজারা নেওয়া আছে। গত বছরে ভুল কীটনাশক দিয়ে লিচুর বেশ ক্ষতি হয়েছিল। এছাড়া লিচু গাছে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বোম্বাই ও দেশী জাতের মোট ২০ বিঘা লিচুর বাগান আছে। ৯বিঘায় ৮১ টি গাছের মধ্যে হাতেগুণা ৪-৫টি গাছে লিচু এসেছে। তারমধ্যে আবহাওয়ার কারণে ঝরে যাচ্ছে। এবার লাখ-দেড়েক টাকা লোকসান হবে।

প্রতিটি মাঝারি গাছে ফসফেট,পটাশ, জিঙ্ক, বোরণ, জিপসাম মিলিয়ে ৫ কেজি করে সার দিতে হয়। লিচু সংগ্রহের পর থেকে গাছের যত্ন করে গাছ ভালো রাখতে হয়। চাষ দিয়ে আগাছা পরিস্কার করতে হয়। পরিশ্রম করেও লিচু আসলো না। বোম্বাই লিচু এক বছর আসলে পরের বছর আর ধরে না। কিন্তু দেশী গুটি জাতের লিচু প্রতিবছর ধরে। আমার কোনটাই হলো না। কিছু করার নাই, আল্লাহ ভরসা।

ছোট বনগাম এলাকার লিচুচাষি হান্নান বলেন, গত বছরে প্রতিটি গাছে গোড়া থেকে গাছের আগা পর্যন্ত লিচু এসেছিল, এবার বাগান ফাঁকা। বিভিন্ন জায়গায় লিচুর বাগানে তুলনামূলক কম লিচু এসেছে। সপ্তাহখানেক আগেও গাছগুলোর গুটি কম ঝরে পড়ছে। তাপমাত্রা আরো বাড়ার কারণে অনেক বেশি ঝরছে। তবে, তীব্র ক্ষরা ও বৃষ্টি না হওয়ার কারণে ঝরে পড়ছে বলে ধারণা এই চাষির।

বাগমারার তাহেরপুর পৌর সদর এলাকার চাষী শামীম রেজা জানালেন, ‘এ বছর এ পর্যন্ত যে পরিমাণ গুটি আছে তা গতবারের চেয়ে কম। আবহাওয়া তেমন ভালো না, বৃষ্টিপাত নাই। সামনে আবার কালবৈশাখী ঝড় আছে। ঝড়ের পর আসলে বোঝা যাবে কি হবে।’

বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম এলাকার আম ব্যবসায়ী ও আম চাষী জিল্লুর রহমান জানান, ‘আমি প্রতিবছরই আম চাষ করি। এবার আমের ভালো গুটি আছে। আমরা চাষীরা মুকুল আসার আগে থেকেই গাছের পরিচর্যা করছি। এখন বর্তমানে গুটির পরিচর্যা চলছে। গাছের গুটি কীটনাশক ও বিভিন্ন ধরনের বালাইনাশক দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছি। তারপরেও তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় গুটি ঝরছে।

জেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বেশি চাষ হয় আম। কিছু কিছু জায়গায় বাণিজ্যিকভাবে লিচুর চাষ হচ্ছে। বর্তমানে জেলায় চলতি মৌসুমে আম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৯৪৩ হেক্টর জমি। গত বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৭ হাজার ৫৭৩ হেক্টর জমি। বেড়েছে ৩৭৩ হেক্টর জমি। আর এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে হেক্টর প্রতি ১১ দশমিক ৯ মেট্রিক টন। অপরদিকে জেলায় লিচু চাষ হয়েছে ৫১৯ হেক্টর জমিতে। এ থেকে মোট লিচু উৎপাদন ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯৬৬ মেট্রিকটন।

মৌসুমে আম- লিচুর ফলন নির্ভর করে মূলত প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পরিচর্যার ওপর। গতবারের তুলনায় এবার গাছে মুকুল ভালোই আছে। গাছে গাছে আম- লিচুর গুটি দেখা দিয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে অধিকাংশ গাছ থেকেই গুটি ঝরে পড়ছে। এক সপ্তাহ ধরে এই অবস্থা। এ কারণে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন আম-লিচু চাষিরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. আউয়াল এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে বলেন, দীর্ঘ ৫ মাস ধরে বৃষ্টি নাই। মাটিতে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। তাপমাত্রা প্রায় ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। অতিরিক্ত ক্ষরার কারণে আম-লিচুর গুটি ঝরে যেতে পারে। বাগানে মাটিতে জো-হারিয়ে মাটি শুকিয়ে গেলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য জেলার আম- লিচু চাষিদের নানা ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। হটাৎ করে বৃষ্টি হলেও গুটি ঝরে যায়।আবার সেঁচ দিলেও গুটি ঝরে যেতে পারে। এক্ষেত্রে চাষিদের করণীয় হলো, থেমে থেমে সেঁচ দেওয়া। মাটিতে হারানো জো-ফিরিয়ে আনতে অল্প-অল্প করে ২-৩ দিন পর পর কয়েকটা সেঁচ দিতে হবে। মাটিতে জো আসলেই গুটি ঝরা রোধ হবে। আপাতদৃষ্টিতে গুটি ঝরে যাচ্ছে বলে মনে হলেও তেমনটা হয় না। প্রতি মুকুলে ১০-১৫টি গুটি আসলেও ১-২টি ফল হৃষ্টপুষ্ট হয়। সেটিই আমে পরিণত হয়। তাই চাষিদের এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া ঠিক হবে না।

এগ্রিকেয়ার/ এমএইচ