
ডেস্ক প্রতিবেদন, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: দেখে মনে হবে বাল্য শিক্ষার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বয়স্কদের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঠিকই, কিন্তু বাল্য শিক্ষার নয়। গ্রামের প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ব্যতিক্রমী স্কুল ‘পার্টনার ফিল্ড স্কুল’। বিভিন্ন বয়সের কৃষাণ-কৃষাণীরা হচ্ছেন এই স্কুলের শিক্ষার্থী। তাদের হাতে কলমে শেখানো হচ্ছে পুষ্টি উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি ও পরিবেশ-বান্ধব চাষাবাদের নানা উপায়। এমন চিত্রই দেখা মিলল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের দামচাইল গ্রামে।
কৃষকদের বাড়ির খোলা জায়গায় বসে ক্লাস করছেন কৃষাণ ও কৃষাণীরা। শিক্ষকের কথা শুনছেন এবং তারা শিখছেন নতুন নতুন চাষ পদ্ধতি। এতে খুশি কৃষান ও কৃষানীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের দামচাইল গ্রামের প্রান্তিক কৃষকদের কৃষি বিভাগের এমন স্কুলে হাতে-কলমে শেখানো হচ্ছে পুষ্টি উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি পরিবেশ বান্ধব চাষাবাদের নানা কলাকৌশল। কৃষাণ-কৃষাণীদের সারের গুণাগুণ ও ব্যবহার। এখান থেকে শিখে নিচ্ছেন ফসলের রোগ, বালাই দমন ও উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখছেন কৃষাণ-কৃষাণীরা।
‘পুষ্টি উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি, পরিবেশবান্ধব চাষ’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে পার্টনার ফিল্ড স্কুল রোপা আমন ধান ও কৃষক সেবা কেন্দ্র এ স্কুল পরিচালনা করছে। নজরুল ইসলাম সাধন কৃষক জানান, এটি একটি কৃষিবান্ধব স্কুল। এই স্কুল থেকে আধুনিক কৃষির কীভাবে বীজ সংরক্ষণ করতে হয়, বীজ তলা তৈরি করতে হয়, কীভাবে চারা (জালা) করতে হয় ও সেই চারা কত দিনের মধ্যে রোপণ করতে হয় তা শিখতে পারলাম। পাশাপাশি ধানের চারা কীভাবে রোপন করতে হয়, তা হাতে কলমে শিখতে পেরেছি। সার ও কীটনাশক ওষুধ কতটুকু জমিতে কী পরিমাণ দিতে হয়। আগাছা কীভাবে পরিষ্কার করতে হয় এবং পোকামাকড় থেকে কীভাবে ফসলি জমিকে রক্ষা করতে হয় তা শিখে পেরেছি।
তিনি আরো বলেন, দশটা ক্লাসের মধ্যে ছয়টা ক্লাস শেষ করেছি। আরো চারটা ক্লাস বাকি আছে। চারটা ক্লাস শেষ করতে পারলে আধুনিক কৃষি সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতে ও জানতে পারব।
কৃষক রুমন চন্দ্র বিশ্বাস জানান, দশটা ক্লাসের মধ্যে আমার ছয়টা ক্লাস শেষ করেছি, আরো চারটা ক্লাস বাকি। এই ছয়টা ক্লাসে আমরা আধুনিক কৃষি সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। আগে আধুনিক কৃষি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতাম না, এখানে ক্লাস করে সব জানতে পারছি।
কৃষাণী শামিমা খানম বলেন, এখানে ক্লাস করে আগে যা জানতাম না, তা জানতে পারছি। কীভাবে উত্তম বীজ সংরক্ষণ ও রোপণ করতে হয় এবং সারের ব্যবহার করতে হয় তা শিখতে পারলাম। আগে কৃষি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতাম না, এই ক্লাসে এসে আধুনিক কৃষি সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতে পারছি। এই শিক্ষা এখন বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারব।
কৃষাণী সালমা আক্তার জানান, এই স্কুলে কৃষি অফিসারদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। আধুনিক কৃষি সম্পর্কে সব কিছু হাতে-কলমে আমাদেরকে শিখিয়েছে ও বুঝিয়ে দিয়েছে। এই শিক্ষা বান্তবে আমাদের অনেক উপকার হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অয়ন দাস জানান, পার্টনার প্রকল্পের আওতায় বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অধীনে পার্টনার ফিল্ড স্কুলের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্কুলে ২৫ জন কৃষক-কৃষাণীর মধ্যে ছাত্র ১৫ ও ছাত্রী ১০ জন। আধুনিক কৃষি সম্পর্কে তাদেরকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পার্টনার স্কুলের আওতায় কমিনিটি বীজ উৎপাদন ও আমন ধানের একটা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকে, যাতে করে নতুন ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায় তা তারা বাস্তাবে শিখতে পারবে।
তিনি আরো জানান, স্কুলে অংশ নেয়া কৃষক-কৃষাণী পার্টনার ফিল্ড স্কুলে নাশতা দেওয়া হয় পাশাপাশি প্রতি ক্লাসের জন্য ২শ’ টাকা করে পাচ্ছেন। স্কুল শেষ হওয়ার পর কৃষক সেবা কেন্দ্র পরিচালিত হবে। পরবর্তী সময় নানা সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনা হবে।
সদর উপজেলা কৃষি অফিসার শাহানা বেগম জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পার্টনার প্রোগ্রামের আওতায় ৪টা পার্টনার ফিল্ড স্কুল পরিচালিত হচ্ছে। এই স্কুলগুলো মাছিহাতা, সুলতানপুর, সাদেকপুর ও মোহনপুর ইউনিয়ন এ বাস্তবায়িত হচ্ছে। পার্টনার ফিল্ড স্কুল এর সংক্ষিপ্ত নাম (পিএফএস)। সাধারণত ১০ সপ্তাহব্যপী এই স্কুলে সপ্তাহের নির্দিষ্ট একদিন ক্লাস ও সেশন পরিচালনা করা হয়। রোপা-আমন ধানের ক্ষতিকর ও উপকারী পোকা মাকড় থেকে শুরু করে ফসল উৎপাদনের সকল প্রযুক্তি ও বীজ সংরক্ষণ, উত্তম কৃষি চর্চার উপর সেশন পরিচালনা করা হয়। তাছাড়া জীবন ধারন বা লাইফস্টাইল মেইনটেইন্যান্স বা পুষ্টি বিষয়ক ধারণা দেওয়া হয় পুষ্টি পিএফএস এ। সর্বোপরি এক কথায় বলা চলে কৃষকের মাঠে আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে পিএফএস।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার মুনসী তোফায়েল হোসেন জানান, পার্টনার ফিল্ড স্কুল রোপা আমন ধান ও কৃষক সেবা কেন্দ্র এ স্কুল ২৫ জন কৃষক-কৃষাণী নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রত্যেক কৃষক বলতে গেলে হাতে-কলমে আধুনিক উপায়ে ধান চাষাবাদ সম্পর্কে শিখতে ও জানতে পারছে। সকল পোকামাকড়ই ক্ষতিকারক না, এর ভেতরে কিছু উপকারী এবং ক্ষতিকারক পোকা রয়েছে। ক্ষতিকারক পোকামাকড় গুলিকে মেরে ফেলে, উপকারী পোকা মাকড় গুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য। এই বিষয়গুলো কৃষক-কৃষাণীদের হাতে-কলমে শিখিয়ে দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
তিনি আরো জানান, আগে থেকে কৃষকদের যে কৃষি বিষয়ক জ্ঞান ছিল, এখন তারা আরো বেশি জানতে শিখতে ও বুঝতে পারছেন। আধুনিক উপায়ে কৃষিতে যে কার্যক্রম, চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে তারা ভালোভাবে অবগত হতে পারছেন।
























