ডা. জাহাঙ্গীর আলম, ডিভিএম, এমএস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়:

জীবাণু প্রতিরোধকারী ঔষধের অবশিষ্টাংশ (Antibiotic Residues) কি? আমরা কোন খাবার খেলে যেমন একটি নির্দিষ্ট সময় না অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত তার অবশিষ্টাংশ আমাদের দেহে বিদ্যমান থাকে ঠিক তেমনি ভাবে কোন ঔষধ খেলেও তা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমাদের দেহে এবং অন্যান্য প্রাণীদেহে তা বিদ্যমান থেকে সক্রিয়ভাবে কাজ সম্পন্ন করে।

এই নির্দিষ্ট সময়টাকে আমরা প্রত্যাহার কাল বা Withdrawal period বলে থাকি। প্রতিটি ঔষধের একটি নির্দিষ্ট প্রত্যাহার কাল রয়েছে। এ প্রত্যাহার কাল অতিবাহিত না হওয়া অবধি তা প্রানিদেহে রয়ে যায় এবং এ থেকে যাওয়া অংশটাকেই আমরা ঔষধের অবশিষ্টাংশ (Drug residues) বলি।

আর জীবাণু প্রতিরোধকারী ঔষধের ক্ষেত্রে বলা হয় Antibiotic residues যা সব থেকে বেশী মারাত্মক মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদেহের জন্য। কেননা এই অবশিষ্টাংশ ঔষধ প্রাণীর মাংশ, ডিম ও দুধে তা রয়ে যায় যা আমরা হয়ত না জেনেই নির্দ্বিধায় গ্রহন করে থাকি।

যেসব ক্ষেত্রে আমরা এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকি: ১। চিকিৎসায়: আমরা এমন একটা সময় এখন অতিবাহিত করছি যেখানে এন্টিবায়োটিক’কে কিছু চিকিৎসক নামধারীরা জেনে বা না জেনে সর্ব রোগের!!! মহৌষধের মত হাঁসমুরগি ও গবাদিপশুতে ব্যবহার করছে।

একথা বলার কারন হল তারা কিছু হতে না হতেই এন্টিবায়োটিক খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছে খামারিদের, যা একদম-ই ঠিক নয়। যে কোনো ধরনের জ্বর, ব্যথা, প্রদাহ, ক্ষত বা ভাইরাস জনিত রোগে নির্দ্বিধায় এন্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হচ্ছে যার বিস্তৃত এবং সুদূরপ্রসারী residual প্রভাব রয়েছে ডিম, দুধ আর মাংসে।

২। বৃদ্ধি সহায়কে: ইদানীংকালে ব্রয়লার ও গবাদিপশুর মোটাতাজাকরনে ভাল ফলাফলের জন্য এন্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্নভাবে এন্টিবায়োটিক এ উদ্দেশ্যে কাজ করে যেমন- প্রাণীদেহের পরিপাকতন্ত্রে ক্ষতিকর অণুজীবদের ধ্বংস করে উপকারী অণুজীবদের কাজের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে, অন্ত্রের স্বতশ্চলতা (motility) পরিবর্তনের মাধ্যমে খাদ্যের পরিপাকপ্রনালী ত্বরান্বিত করে।

তা ছাড়াও রোগ প্রতিরোধ তন্ত্রের সক্রিয়তার মাত্রা কমিয়ে, পুষ্টিকর পরিপোষকের নষ্ট সাধন কমিয়ে এবং টক্সিন তৈরি কমিয়েও এন্টিবায়োটিক বৃদ্ধি সহায়ক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু, বেশীরভাগ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কমবয়সী উঠতি গবাদি প্রাণী এবং পাখির ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক বৃদ্ধি সহায়তার ফলাফল পাওয়া যায়।

৩। প্রতিরোধক হিসেবে: আজকাল sub-therapeutic level (প্রতিকারের জন্য যে মাত্রায় ব্যবহৃত হয় তার থেকে কম মাত্রায়) এ এন্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হচ্ছে গবাদিপ্রানি ও হাঁস মুরগীতে সম্ভাব্য সংক্রমন প্রতিরোধ করতে যা এখনো বিতর্কিত।

কেননা প্রতিটি এন্টিবায়োটিক শুধুমাত্র নির্দিষ্ট মাত্রায় (Therapeutic dose) ব্যাকটেরিয়ার সক্রিয় বিভাজনকালে কার্যক্ষম।

এন্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশের ভয়াবহতা: এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে তা প্রাণির ডিম, দুধ ও মাংসে জমা হতে পারে যা কোনভাবেই মানুষের ভক্ষণ যোগ্য খাদ্যের জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত নয়। যদি রোগ প্রতিরোধ বা প্রতীকারের জন্য এন্টিবায়োটিক ব্যবহার অত্যাবশ্যকীয় হয়েই থাকে তবে তার প্রত্যাহার কাল (Withdrawal Period) শেষ না হওয়া অবধি ওই প্রাণীর ডিম, দুধ বা মাংশ খাওয়া বা বাজারজাত করা যাবে না।

এসব খাদ্য থেকে প্রাপ্ত antibiotic residues দুই ভাবে মানব দেহে প্রভাব ফেলে। ১. যদি অবশিষ্টাংশের পরিমাণ অত্যধিক হয়ে থাকে তবে তা সরাসরি বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। ২. যদি নিম্ন মাত্রায় থাকে তবে তা মানবদেহের স্বাভাবিক অণুজীবদের পরিবর্তন ঘটিয়ে রোগ তৈরি করতে পারে।  

উক্ত এন্টিবায়োটিক এর প্রতি সহনীয় ব্যাকটেরিয়ার (Antibiotic resistant bacterial strains) প্রজাতি তৈরি হতে পারে যা পরবর্তীতে রোগ তৈরি করলে আর এই এন্টিবায়োটিকের প্রতি সংবেদনশীল থাকবে না। ৩. তাছাড়াও আরো কিছু বিরুপ প্রভাব তৈরি করতে পারে। যেমন- Immunopathological effects, Autoimmunity, Carcinogenicity, (Sulphamethazine, Oxytetracycline, Furazolidone) Mutagenicity, Nephropathy (Gentamicin), Hepatotoxicity, Reproductive disorders, Bone marrow toxicity (Chloramphenicol),  Allergy (Penicillin).

আমরা যেভাবে জীবাণু প্রতিরোধকারী ঔষধের অবশিষ্টাংশ প্রতিরোধ করতে পারি: ১. জীবাণু প্রতিরোধকারী ঔষধের অবশিষ্টস্টাংশের বিরুপ প্রভাব সম্পর্কে ভেটেরিনারিয়ান, বিভিন্ন মিডিয়া, সংগঠন এবং সরকারী উদ্যোগের মাধ্যমে সর্বস্তরের ব্যক্তি ও সংগঠন পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

২. অতি দ্রুত সনাক্তকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রাণীজাত খাদ্যের গ্রেডিং এবং নিষিদ্ধকরণ যাতে সহনীয় মাত্রায় চেয়ে বেশী জীবাণু প্রতিরোধকারী ঔষধের অবশিষ্টস্টাংশ রয়েছে।

৩. দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে অনেক সময় এন্টিবায়োটিক নিষ্ক্রিয় হয়। যেমন. রেফ্রিজারেশনের ফলে পেনিসিলিন নিষ্ক্রিয় হয়। পাস্তুরাইজেশনের ফলে অধিকাংশ এন্টিবায়োটিক নিষ্ক্রিয় হয়। মাঠ পর্যায়ে এন্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ঔষধের অবশিষ্টস্টাংশ নির্ণয়ের সাধারণ এবং সাশ্রয়ী পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হবে। জাতীয়ভাবে ডিম, দুধ ও মাংসে জীবাণু প্রতিরোধকারী ঔষধের অবশিষ্টাংশ পর্যবেক্ষণ ও কড়া তত্ত্বাবধান করতে হবে।