
ফেনীতে বন্যায় কৃষিক্ষেত্র মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ার পর এবার কৃষকের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে ফল আর্মিওয়ার্ম পোকার ব্যাপক আক্রমণ। সোনাগাজী এবং ফুলগাজী উপজেলার ফসলি জমি ও জনপদে কালো বর্ণের এই পোকায় ফসলের ক্ষতির মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর পোকার উপদ্রবে বিপর্যয়ের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষকরা।
গত কয়েক দিনে সোনাগাজী উপজেলার আমিরাবাদ ও ফুলগাজী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ফসলি জমিতে এ পোকার দেখা মিলেছে। স্থানীয় কৃষকরা ধারণা করছেন, বন্যার পানির স্রোতে এ পোকা প্রবেশ করেছে। কৃষি বিভাগের মতে, এ পোকার দমনে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে পোকা মারতে কীটনাশক প্রয়োগ করেও সাফল্য আসেনি বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
সোনাগাজীর আমিরাবাদ এলাকায় কালো পোকার বিস্তারের কারণে ফসলি জমি, রাস্তা-ঘাট এমনকি ঘরবাড়িতেও এর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পোকাটি সাধারণত পানিতে থাকতে পারে না, তবে পানির মধ্যে বসবাস করার বিরল চিত্র এখানকার ফসলের জমিতে দেখা গেছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, বন্যার পর নতুন করে আমন ধান রোপণ করেছেন তারা এবং দ্রুত বিক্রির জন্য শীতকালীন সবজি যেমন লাউ, কুমড়া, করলা, এবং পাট শাকের আবাদ শুরু করেছেন। তবে ফল আর্মিওয়ার্ম পোকার উপদ্রবে এসব ফসল ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের আহম্মদপুর, চর কৃষ্ণজয় এলাকায় এবং লেমুয়া ইউনিয়নের কসবা, ধর্মপুর, নিরগঞ্জ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকের পাট শাক, কলমির শাক, শিম, কুমড়ো, লাউ, ঝিঙ্গে, বেগুন গাছের পাতা এবং কান্ডে কালোবর্ণের এ পোকার উপস্থিতিতে গাছের সবুজ রং কালো দেখাচ্ছে। রাস্তাঘাট, পুকুর, ডোবা-নালা, ফসলবিহীন জমির ঘাসসহ সর্বত্র এ পোকার উপদ্রব দেখা গেছে। এ পোকার আক্রমণে ধানসহ অন্যান্য উদ্ভিদের পাতা শুকিয়ে বাদামী হয়ে পড়ছে।
আমিরাবাদের আহম্মদপুরের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ১২ শতক জমিতে লাউ গাছের লাগিয়েছিলাম। হঠাৎ এ পোকা এসে সবগুলো গাছের পাতা খেয়েছে এবং গোড়ায় আক্রমণ করেছে। এতে লাউ গাছগুলো শুকিয়ে মারা গেছে। কৃষি অফিসের পরামর্শে কীটনাশক প্রয়োগ করেও লাভ হয়নি। পোকাগুলোকে কীটনাশকের পানিতে রাখলেও সেগুলো মরে না।
আহম্মদপুর এলাকার কৃষক সিরাজুল হক বলেন, ৬ শতক জমিতে লাগানো পাট শাক খেয়ে ফেলেছে পোকা।
আমিরাবাদের চর কৃষ্ণজয় গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, এত পোকা আমার ৫৫ বছরের জীবনে কখনো দেখিনি। দেখতেও ভয় লাগে, কাছে গেলে গায়ে উঠে যায়। বাড়িঘরে ঢুকে পড়েছে সেগুলো।
একই চিত্র দেখা গেছে ইউনিয়নের কাতু সদাগর বাড়িতেও। এই বাড়ির কৃষক মোস্তফা বলেন, বন্যার ক্ষতি কাটাতে ৬০ শতক জমিতে আগাম শাক-সবজি লাগিয়েছি। এখন সেগুলোও পোকায় খেয়ে ফেলছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, আর্মিওয়ার্ম পৃথিবীব্যাপী একটি ক্ষতিকারক পোকা হিসেবে পরিচিত। এটি প্রায় ৮০ প্রকার ফসলে আক্রমণ করে থাকে।
আরো পড়ুন: সাতক্ষীরায় বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠছে বেলজিয়াম জাতের হাঁসের খামার
এ ব্যাপারে সোনাগাজী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিন আহমেদ সোহাগ বলেন, এ পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পোকা দমনে ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের দল কাজ করছে। এটি দমনে কৃষকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে কৃষি বিভাগ।
এ ব্যাপারে ফুলগাজী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোঃ খোরশেদ আলম জানান, ফুলগাজীতে এ পোকার উপদ্রব ঠেকাতে তিন ধরনের ওষুধ ছিঁটানো হয়েছে। কৃষকদের একাধিক ওষুধের মিশ্রণ প্রসঙ্গে জানানো হয়েছে এবং তা ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বন্যার সময় কিছু কীটের লার্ভা ফসলের মাঠে আগাছায় থাকার ফলে এ পোকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফুলগাজীর আমজাদহাট ইউনিয়নের মলিপুরেও এমন পোকা দেখা মিলেছে। তবে মুন্সীরহাটের দক্ষিণ শ্রীপুরে এর প্রাদুর্ভাব বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
কেবল ফসলের মাঠ নয়, ঘরে বাড়িতেও এ ফল আর্মিওয়ার্ম পোকার প্রকট উপদ্রব বেড়েছে। সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের চর কৃষ্ণজয় গ্রামের কৃষক ছুট্টো মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাড়ির রাস্তায়, বসত ঘর, টিউবওয়েল, শৌচাগার, বাড়ির উঠোনসহ আঙ্গিনায় হাজার হাজার পোকা কিলবিল করছে। ছুট্টো মিয়া বলেন, আমরা ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করেও পোকা কমাতে পারছি না। রাতে ঘুমালে গায়ে উঠে যায়। গায়ে লাগলে চুলকায়। বাড়ির চারদিকে কীটনাশক ছিটিয়েও কাজ হচ্ছে না, দিন দিন পোকা আরো বাড়ছে।
লেমুয়া ইউনিয়নের কসবা গ্রামের বাসিন্দা সিএনজি চালক বেলাল এবং আকবর হোসেন রূপক জানান, এই পোকা খেয়ে বাড়ির ৫টি মুরগী মারা গেছে। পুকুরের পানিতে এত বেশি পোকা কিলবিল করছে যে জেলেরা মাছ না ধরেই চলে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফেনীর উপ-পরিচালক মো. একরাম উদ্দিন বলেন, পোকার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে জমিতে আলোর ফাঁদ ও পাখি বসার মত কিছু বসাতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বাজার থেকে বিভিন্ন বালাইনাশক প্রয়োগের বিষয়েও কৃষকদের বলা হচ্ছে। ফসল অনুযায়ী জমিতে সম্ভব হলে পানি রাখতেও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সবমিলিয়ে শঙ্কা থাকলেও এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বাসস
আআ/এগ্রিকেয়ার
























