এগ্রিকেয়ার ডেস্ক: বগুড়ার মহাস্থান হাটে যে শিম কৃষক বিক্রি করেছেন মাত্র ৫ টাকা কেজি দরে, ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই রাজধানীর বাজারে সেই শিমই বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়।

অর্থাৎ পথভেদে এক কেজি শিমের দাম বেড়েছে ১৪ গুণ। শুধু শিম নয়, কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে টমেটো—সবজির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে হাতবদল, ‘ধলতা’ নামের অদ্ভুত নিয়ম আর পথে পথে রসিদ-বিহীন চাঁদার মহোৎসব।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বগুড়া থেকে সবজিবাহী একটি ট্রাকে চড়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, খেত থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে সবজিকে অন্তত পাঁচবার হাতবদল হতে হয়। আর প্রতিটি ধাপেই যুক্ত হয় বাড়তি খরচ, যার চূড়ান্ত বোঝা বইতে হয় সাধারণ ক্রেতাকে।

‘ধলতা’র নামে কৃষকের পকেট কাটা
বগুড়া সদরের কৃষক শহিদুল ইসলাম ১০ মণ টমেটো বিক্রি করতে এসে হিসেবে পেলেন ৯ মণের দাম। কারণ হিসেবে আড়তদারেরা বলছেন ‘ধলতা’। প্রতি মণে ২ কেজি করে সবজি আড়তদার ও ব্যাপারীদের ‘ফাও’ দিতে হয়।

এর বাইরে ইজারাদারের খাজনা হিসেবে দিতে হয় আরও ২ কেজি। ফলে ১০ মণ সবজি বিক্রি করলে কৃষককে নগদ ২ হাজার টাকা সমমূল্যের পণ্য বাড়তি দিতে হচ্ছে। স্থানীয় আড়তদারদের দাবি, পরিবহনকালে সবজি পচে যাওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই বছরের পর বছর এই নিয়ম চলে আসছে।

ট্রাক ছাড়তেই ৫০০, পথে পথে রসিদ
সবজি নিয়ে ট্রাক রওনা দেওয়ার আগেই শুরু হয় অর্থ আদায়। বগুড়ায় ট্রাকভাড়া বন্দোবস্তের নাম করে ‘শ্রমিক ইউনিয়ন’ ও ‘মালিক সমিতি’র তকমা লাগিয়ে আদায় করা হচ্ছে ৫০০ টাকা। এরপর মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ইজারাদারের লোকজনকে।

শেরপুর পৌরসভা এলাকায় ৫০ টাকা, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ১০০ টাকা এবং যাত্রাবাড়ীতে পৌঁছানোর পর ২৫০ টাকা আদায় করা হয়। কোথাও রসিদ মিললেও অধিকাংশ জায়গায় টাকা নেওয়া হয় ‘ম্যানেজ’ করার নামে। এমনকি হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধেও ‘চা-নাস্তার’ কথা বলে ৫০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

হিসাব মেলে না বাজারের
ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, বগুড়া থেকে ঢাকায় এক কেজি সবজি পৌঁছাতে পরিবহন, শ্রমিক ও বস্তা বাবদ মোট খরচ পড়ে সর্বোচ্চ ৪ টাকা। সেই হিসাবে মহাস্থান হাটের ১২ টাকার শসা ঢাকায় ১৬ থেকে ১৮ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে রাজধানীর বাজারগুলোতে সেই শসা বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়।

বিশ্লেষণ ও বাস্তবতা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট আর পরিবহন খাতের অদৃশ্য খরচগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে। কৃষক তাঁর হাড়ভাঙা খাটুনির ফল পাচ্ছেন না, অন্যদিকে চড়া দামে সবজি কিনতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের। মধ্যরাতের এই মহাসড়ক যেন এক অন্তহীন শোষণের পথ, যেখানে সবজির দাম বাড়ে চাকার ঘূর্ণনের চেয়েও দ্রুত গতিতে।

সূত্র-প্রথম আলো