নিজস্ব প্রতিবেদক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: দেশের কৃষকরা মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারজাত করতে শুরু করেছে। ঠিক এমন সময়ই ভারত থেকে ঢুকছে নাসিক জাতের পেঁয়াজ। ভরা মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানির কারণে হু-হু করে কমছে দাম। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন দেশের চাষিরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির কারণে পেঁয়াজের দাম কমছে। দেশের চাষিরা পেঁয়াজ উৎপাদনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন প্রতিবছরই। যে সময় ভারতীয় নাসিক জাতের পেঁয়াজের চাষ দেশে শুরু করেছেন চাষিরা। সে সময় আমদানি করে কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে জাতীয় মসলা গবেষণা কেন্দ্রের শিবগঞ্জ বগুড়ার মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হরিদাস চন্দ্র মোহন্ত এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে বলেন, পেঁয়াজ সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ভারত থেকে। আমাদের দেশে মাঠ থেকে পেঁয়াজ সংগ্রহের সময় আমদানি করা হয়। যখন দেশীয় কৃষক লাভবান হওয়ার আশায় থাকেন তখন আমদানি করে দাম কমিয়ে দেওয়া হয়। আবার বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা ব্যবসায়ীরা করে থাকেন। ফলে দামে উঠানামা হয়।

কৃষি বিপণন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে আট থেকে ১০ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হতো। কিন্তু গত অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ৫.৫২ লাখ মেট্রিক টন। তার আগের বছর ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ৫.৭১ টন।

তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত অর্থবছর মোট ১২ লাখ ৯৯ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে দেশে। ২০১৯-২০ সালে হয়েছিল ১১ লাখ ৭৬ হাজার টন।

পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে মৌসুমে ছয় মাস আমদানি বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন মসলা জাতীয় ফসলের গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের পরিচালক ড. শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার।

তিনি এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে বলেন, মৌসুমে মার্চ-মে পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখছে সরকার। এতে পেঁয়াজের ভালো দামও পাচ্ছেন কৃষক। তবে যে হারে উৎপাদন বাড়ছে তাতে পেঁয়াজ আমদানি ছয় মাস বন্ধ রাখা উচিত। অন্যথায় কৃষক দাম পাবেন না। হিসাব করে দেখেছি, কৃষক যদি ২৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারেন তাহলে তাঁরা লাভবান হবেন। কিন্তু মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম অনেক জায়গায় কেজি ১৫ টাকায় নেমেছিল। এটা সমস্যা। যখন কৃষকের পেঁয়াজ ঘরে আসে তখন বাজারে আমদানি বাড়ে; সিন্ডিকেট পেঁয়াজের দাম কমিয়ে দেয়। অতিপ্রয়োজনে যখন কৃষকের পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হয় তখন সুযোগ নেয় সিন্ডিকেট। পরে বাজার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকে।

দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে দুদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের পাইকারি দাম ১৭ টাকায় নেমেছে। চাহিদার তুলনায় বেশি আমদানি হওয়ায় পণ্যটির বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। গতকাল বন্দরে পাইকারিতে প্রতি কেজি আমদানীকৃত পেঁয়াজের দাম ৫ টাকা করে কমেছে। দুদিন আগেও প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২২-২৩ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। এখন তা কমে ১৭-১৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সংশিষ্টরা বলছেন, ঊর্ধ্বমুখী চাহিদার কারণে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি বাড়ছে। বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ ট্রাক পেঁয়াজ ঢুকছে। এলসি সংকট কিছুটা শিথিল হওয়ায় আমদানি প্রবাহ স্বাভাবিক হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

হিলি স্থলবন্দরে পেঁয়াজ কিনতে আসা পাইকার আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘কিছুদিন আগে দেশীয় পেঁয়াজ সরবরাহ কমায় বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছিল। এ কারণে বন্দরে ভারতীয় পেঁয়াজের দামও ছিল বাড়তি। তবে চলতি সপ্তাহের প্রথম দিন থেকেই দাম কমতির দিকে। যে পেঁয়াজ দুদিন আগেও ২২-২৩ টাকায় কিনেছি, তা এখন ১৭-১৮ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে সম্প্রতি দেশীয় নতুন পেঁয়াজ সরবরাহ বাড়ায় মোকামগুলোয় ভারতীয় পেঁয়াজের চাহিদা কমে গিয়েছে।’

হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী আইয়ুব হোসেন বলেন, দেশের বাজারে চাহিদা মেটাতে বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত রেখেছেন আমদানিকারকরা। কিছুদিন আগেও ডলার সংকটে কারণে ব্যাংকগুলো চাহিদামতো এলসি দিচ্ছিল না। পুরনো কিছু এলসির বিপরীতে কয়েকজন আমদানিকারকের পেঁয়াজ বন্দর দিয়ে প্রবেশ করছিল।

বর্তমানে ব্যাংকগুলো নতুন এলসি দেয়ায় অনেকেই নতুন করে এলসি খুলছেন। এতে আমদানি বাড়ছে। সেই সঙ্গে দেশীয় নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে ওঠায় সরবরাহও ঊর্ধ্বমুখী। চাহিদার তুলনায় বন্দর দিয়ে বাড়তি আমদানির কারণে খানিকটা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন আমদানিকারকরা। এ কারণেই আমদানীকৃত পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে।

হিলি স্থলবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন বলেন, বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি বেড়েছে। আগে বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৮-১০ ট্রাক পেঁয়াজ এলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১৮-২০ ট্রাকে পৌঁছেছে। বন্দর দিয়ে গত শনিবার ২১ ট্রাকে ৬২০ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল। রোববার ২০ ট্রাকে ৬১২ ও সোমবার ১৯ ট্রাকে ৫৫৯ টন আমদানি হয়েছে। গতকালও বন্দর দিয়ে আমদানি অব্যাহত ছিল।

এ্রগ্রিকেয়ার/এমএইচ