
ফসল ডেস্ক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: বাংলাদেশের তাপমাত্রা মোটামুটি উষ্ণ। দক্ষিণে সমুদ্র, উত্তরে হিমালয় পর্বত এবং বিশাল সমভূমির জন্য বাংলাদেশে শীত ও গ্রীষ্মের আধিক্য অনুভূত হয়না। গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা শীতকালের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশী। তবে, হটাৎ বৃষ্টি, ভারী কুয়াশা হলে ফসলে যেসব প্রভাব পড়ে তা আলোচনা করা হলো।
হটাৎ বৃষ্টি হলে ফসলে বেশ প্রভাব পড়ে। শীতকালে বৃষ্টির প্রভাব জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কে জে এম আব্দুল আউয়াল এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে জানান, শীতকালীন ফসল আলু, মসুর, ছোলা, বরেন্দ্র অঞ্চলে সরিষার ক্ষেত্রে বৃষ্টি বেশ ভালো ফল দেয়। বৃষ্টি একটু মাটি ভেজা পরিমাণ হলে কৃষকরা সার প্রয়োগ করতে পারেন। এক্ষেত্রে ফসলের উৎপাদন বৃষ্টি ও ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। আলুতে হয়ত আর কিছুদিন পর সেঁচ দিতে হবে। বরং এখন বৃষ্টি হলে উপকার ছাড়া ক্ষতি হবে না।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রার উপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন শস্যকে গ্রীষ্মকালীন বা খরিপ শস্য এবং শীতকালীন বা রবিশস্য এই দুই শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। আউশ ধান, পাট, সয়াবিন, প্রভৃতি গ্রীষ্মকালীন শস্য। এসব শস্যের অধিক তাপমাত্রার প্রয়োজন। আমনধান, বোরোধান, গম, যব, সরিষা, তিল, মটর, মসুর তামাক প্রভৃতি শীতকালীন ফসল। তিল, তুলা, ভূট্টা প্রভৃতি উভয় মৌসুমেই চাষ করা যায়। তবে আখ রবি ও খরিপ দুই মৌসুমেরই অন্তগর্ত।
আর্দ্রতা: বায়ুতে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতিকে আর্দ্রতা বলে। কোন স্থানের আর্দ্রতা সেই স্থানের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার উপর নির্ভরশীল। যে বায়ুতে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি, সে বায়ু জলবায়ুকে অধিক প্রভাবিত করে। ফলে সেই এলাকায় দিনে খুবই গরম পড়ে এবং রাতে প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ে। বায়ুর আর্দ্রতা সূর্যকিরণকে ভূপৃষ্ঠে আসতে অধিক বাঁধা সৃষ্টি করে বলে এ অবস্থা হয়। বর্ষাকালে অধিক আর্দ্রতার কারণে রোগবালাই এবং পোকামাকড় দ্বারা ফসল সহজেই আক্রান্ত হয়। শীতকালে বাতাস শুষ্ক থাকে অর্থাৎ বাতাসে আর্দ্রতা অনেক কম থাকে। শীতকালে বাতাসের গড় আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭২% থেকে ৮৫% হয় থাকে। অপরদিকে গ্রীষ্ম বা বর্ষাকালে এই আর্দ্রতা হয় ৮৩% থেকে ৯০% পর্যন্ত।
বৃষ্টিপাত: বৃষ্টিপাতের উপরও আবহাওয়া ও জলবায়ু নির্ভর করে। কোন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেশী হলে সে অঞ্চলের তাপমাত্রা হ্রাস পায় এবং বৃষ্টিপাত কম হলে সে অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হয়। গ্রীষ্মকালে দক্ষিন-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। অপরপক্ষে শীতকালে উত্তর পূর্ব মৌসুমি।
কৃষি জলবায়ু
বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। উদ্ভিদের জন্য পানির প্রয়োজন। উদ্ভিদ এই পানি মাটি থেকে গ্রহণ করে। মাটিতে পানির প্রধান উৎস বৃষ্টিপাত। ফসল উৎপাদনের জন্য বৃষ্টিপাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণে বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন ফসল জন্মে। বাংলাদেশের মোট বৃষ্টিপাতের ৮০% বৃষ্টিপাত হয় বর্ষাকালে। এই বৃষ্টিপাতের পরিমান পূর্বদিক হতে পশ্চিমদিকে ক্রমশ্যই কমতে থাকে। সিলেটের লালাখালে সবচেয়ে বেশী বৃষ্টিপাত (৬৪৯.৬ সে.মি.) হয় এবং রাজশাহী জেলার লালপুরে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত (১১৯.৮ সে.মি) হয়। দেশের বাৎসরিক বৃষ্টিপাতের গড় ২৩০ সে:মি:।
গাছের সাবলীল বৃদ্ধি ও অধিক ফলন সঠিক মাত্রার পানি সরবাহের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। এই পরিমিত পানির প্রাপ্যতা বিভিন্ন এলাকায় এবং বিভিন্ন ঋতুতে শস্য বন্টনে তাপমাত্রার মত প্রভাব বিস্তার করে। কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে যে বৃষ্টিপাত হয় তা ফসল উৎপাদনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় জমি চাষ এবং খরিফ শস্য বোনা শুরু হয়। বৃষ্টিপাত প্রয়োজনের বেশী হওয়া সত্ত্বেও সময়মত এবং পরিমাণমত না হওয়ার কারণে প্রতি বছরই মাটিতে প্রয়োজনীয় পানির অভাবে শস্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়।
জলপাত: জলীয়বাষ্প শীতল বায়ুর সংষ্পর্শে এসে শিশিরাংকে পৌছালে বায়ুমন্ডলের ধূলিকনাকে আশ্রয় করে তা সহজেই ঘনীভূত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকনায় পরিণত হয়। অত:পর সেই ক্ষুদ্র বরফ কনাগুলো বা জলকনাগুলো মাধ্যাকর্ষন শক্তির প্রভাবে ভূ-পৃষ্টে পতিত হয় তখন তাকে জলপাত বলে। কোন কারণে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা ১০ সেলাসিয়াস এর নীচে নেমে গেলেই অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প ঘনীভবন প্রক্রিয়ায় ভূ-পৃষ্ঠে নেমে আসে যা জলাপাত নামে পরিচিত।
জলাপাত সাধারনত দুই আকারের হয়ে থাকে- তরল আকার : হিমাংক শিশিরাংকের উর্ধ্বে থাকলে ঘনীভবনের ফলে যে জলপাত বা বারিপাত হয়, তা তরলাকার, কুয়াশা, শিশির ও বৃষ্টিরূপে পতিত হয়। কঠিন আকার : শিশিরাংক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস বা হিমাংকের নীচে থাকলে ঘনীভূত জলীয়বাষ্প হয় কঠিন আকার। যেমন: তুষার ও বরফরূপে ভূ-পৃষ্ঠে নেমে আসে।
শিশির: রাত্রিতে তাপ বিকিরণ করে ভূ-পৃষ্ঠ শীতল হলে ভূ-পৃষ্টের সংস্পর্শে উপরের বায়ু শীতল হয়। এর ফলে শীতল বায়ু বেশী জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে না বলে অতিরিক্ত বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ঘাস, গাছের পাতার উপর শিশিররূপে জমা হয়। শীতকালে ভূ-পৃষ্ঠ অধিকতর ঠাণ্ডা হয় বলে ঐ সময় শিশির বেশী পরিমাণে দেখা যায়। শীতকালে যখন মাটিতে প্রয়োজনীয় রসের অভাব থাকে সে সময় এই শিশিরপাত মাটিতে কিছু পরিমাণ রস সরবারহ করে।
এছাড়া যে সমস্ত ফসলের জন্য অধিক ঠাণ্ডার প্রয়োজন যেমন- ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, আলু ইত্যাদির জন্য শিশিরপাত খুবই প্রয়োজন। আমন ধানের ক্ষেত্রে থোড় থেকে ছড়া বের হওয়ার কাজে এবং পরাগায়নে শিশিরপাত সাহায্য করে থাকে। অপরদিকে শিশির রোগ বালাই এর জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে। গোল আলুর পাতা শিশির দ্বারা সিক্ত হলে নাবী ধ্বসা বা আলুর মড়ক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শিশির ফসলের রোগবালাই সৃষ্টির প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে। স্বল্প মেয়াদী সেচবিহীন যেসব ফসল চাষ করা হয় তাদের জন্য শিশির উপকারি। শিশির পরিমাপ করার জন্য ড্রোজোমিটার নামক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।
তুষারপাত: ভূ-পৃষ্ঠ এবং তার নিকটস্থ বস্তুর তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম হলে ভূ-পৃষ্ঠের উপরিভাগের ভাসমান জলীয় বাষ্প সরাসরি বরফকনায় পরিণত হয়ে ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হয় যা তুষারপাত নামে পরিচিত। বাংলাদেশে কোথাও তুষারপাত হয় না। এটি শস্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এদেশের কোন শস্যই তুষারপাত সহ্য করতে পারে না এমনকি খুব ঠাণ্ডা আবহাওয়া কোন কোন সময় আখ ও ধানের চারার বৃদ্ধি ভীষণভাবে ব্যাহত করে। শীতপ্রধান দেশে তুষারপাত সহ্য করতে পারে এমন সব শস্যের জাত প্রজনন দ্বারা উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব শস্যের মধ্যে গম, যব, আলফালফা প্রভৃতি শস্যের বিভিন্ন জাত প্রধান।
কুয়াশা: কখনও কখনও জলীয়বাষ্প ঠাণ্ডায় ঘনীভূত হয়ে ভূ-পৃষ্ঠের নিকটবর্তী বায়ুস্তরে ভাসমান ধুলিকণাকে আশ্রয় করে এবং ঘনীভূত হয়ে ধোয়ার আকারে ভাসতে থাকে তখন তাকে কুয়াশা বলে। সাধারণত জলীয়বাষ্প পূর্ণ বায়ুকোন শীতল বস্তুর সংস্পর্শে আসলেই কুয়াশার সৃষ্টি হয়। এ দেশে আশ্বিন মাস থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত কুয়াশা দেখা যায়। কুয়াশার কারণে তেল ও ডাল জাতীয় ফসলের উপকার হয়। আবার অতিরিক্ত কুয়াশার কারনে আমের মুকুল নষ্ট হয়, রাস্তাঘাটে গাড়ি চলাচল সমস্যা হয়।
কৃষি শিক্ষা তথ্য
এগ্রিকেয়ার/এমএইচ
























