এগ্রিকেয়ার ডেস্ক: গাইবান্ধা সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর গ্রামের কৃষক মঞ্জুর রহমান। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। দেশের কৃষি যখন দ্রুত পাওয়ার টিলার ও ট্র্যাক্টরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনও তিনি আঁকড়ে ধরে আছেন শত বছরের পুরোনো সনাতনী কৃষি পদ্ধতি। আধুনিকতার ঢেউয়ের মধ্যেও গরু, লাঙল ও জোয়ালই তাঁর ভরসা। চার দশকের বেশি সময় ধরে নিজ জমিতে গরু দিয়ে হালচাষ করে আসছেন তিনি।

সম্প্রতি গ্রামের মাঠে জমি চাষ করতে দেখা যায় তাঁকে। কাজের ফাঁকে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, দীর্ঘ কৃষিজীবনে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও তিনি এখনো সনাতনী পদ্ধতিতেই ধান, পাট, আলুসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করে আসছেন।

মঞ্জুর রহমান বলেন, ‘উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকেই নিজের জীবনের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছি। আমার দুটি গরুই আমার সহযোদ্ধা। বছরের পর বছর এদের সঙ্গে কাজ করতে করতে জীবনে শৃঙ্খলা আর আনন্দ দুটোই পেয়েছি। আধুনিক যন্ত্র অনেক সুবিধা দেয় ঠিকই, কিন্তু লাঙল–জোয়ালের সঙ্গে যে অনুভূতি জড়িয়ে থাকে, তা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।’

পুরোনো দিনের নিয়ম মেনে ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় তাঁর দিন। কাকডাকা ভোরে গরুর ঘণ্টার শব্দ আর লাঙলের ফলায় মাটি উল্টে যাওয়ার দৃশ্য যেন গ্রামীণ বাংলার চিরচেনা কৃষি সংস্কৃতির স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। তিনি বলেন, প্রতিদিনই নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নামতে হয়। গরুর পায়ের তোলা মাটি আর লাঙলের রেখা তাঁকে জমির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়।

মঞ্জুর রহমানের মতে, গরু দিয়ে হালচাষ শুধু ঐতিহ্য নয়, মাটির জন্যও উপকারী। তাঁর ভাষায়, লাঙলের ফলা মাটি আলগা করে এবং আগাছা কমাতে সাহায্য করে। আবার গরুর গোবর জমিতে পড়ে প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে, এতে জমির উর্বরতা দীর্ঘদিন ধরে বজায় থাকে।

যদিও পাওয়ার টিলার বা ট্র্যাক্টর দিয়ে অল্প সময়েই জমি চাষ করা সম্ভব, তবুও মঞ্জুর রহমানের কাছে গরু দিয়ে হালচাষের আলাদা আবেগ রয়েছে। তিনি বলেন, যন্ত্র দিয়ে কাজ দ্রুত শেষ হয় ঠিকই, কিন্তু গরু আর লাঙল নিয়ে মাঠে নামার যে আনন্দ, মাটির সঙ্গে যে সম্পর্ক—সেটা যন্ত্রে পাওয়া যায় না।

গ্রামের মানুষের কাছে মঞ্জুর রহমান শুধু একজন কৃষক নন, বরং সনাতনী কৃষি সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক। অধিকাংশ কৃষক যখন আধুনিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছেন, তখন তিনি নিজের চর্চায় ধরে রেখেছেন গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি অনন্য ধারা।

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আগে ভোরে হালচাষ করতে গিয়ে কৃষকেরা গল্প করতেন, একে অপরের সঙ্গে নানা পরামর্শ হতো। বাড়ি থেকে পান্তা ভাত, সরিষার তেল আর ভর্তা পাঠানো হতো। সেই খাবার খেতে খেতেই কেটে যেত সময়। তাঁর বিশ্বাস, এই সনাতনী পদ্ধতি হারিয়ে গেলে শুধু কৃষির একটি ধারা নয়, হারিয়ে যাবে গ্রামীণ সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।