
ডেইরি ডেস্ক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: কথায় আছে বেড়া যখন ক্ষেত খায়, মালিকের কিছুই করার থাকে না। করোনা মহামারিকে কাজে লাগিয়ে লুটপাটের মহোৎসবে মেতে উঠেছে একদল কর্মকর্তা। এবার পশু হাসপাতালের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় চলমান ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচার প্রজেক্ট-এনএটিপি-২ প্রকল্পে।
ঘটনাটি ঘটেছে সাত মাস আগে। দেশের উপজেলা পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার দপ্তরের সঙ্গে সাত মাস আগে জুড়ে দেওয়া হয়েছে দুটি শব্দ-ভেটেরিনারি হাসপাতাল। এখন নামকরণ হয়েছে ‘উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল’। কাগজে-কলমে হাসপাতাল হলেও নেই হাসপাতালের লোকবল। দেশের ৩৫টি উপজেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের নামে এক কোটি ৩৫ লাখ টাকার মেশিনারিজসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কেনা হয়। দেড় বছর আগে কেনা এসব সরঞ্জামাদি কোন কাজে আসেনি। কারণ কোন লোকবল নেই!
পড়তে পারেন: অভিনব কায়দায় অর্থ আত্মসাৎ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার
শুধু তাই নয়, উপজেলা পর্যায়ে কোনো প্রশিক্ষণ হল না-থাকলেও প্রশিক্ষণ রুমের নামে এক কোটি ৬০ লাখ টাকার ফার্নিচার কেনা হয়েছে। কিন্তু যেসব ফার্নিচার কেনার কথা বলে টাকা খরচ করা হয়েছে, সেগুলো যথাযথভাবে বুঝে পাননি সংশ্লিষ্টরা।
দুই হাজার ৬৮১ মাঠ-কর্মচারীর (অফিসে সিল হিসাবে পরিচিত) ব্যবহারের জন্য সমানসংখ্যক ট্যাব কেনা হয়েছে বাজারদরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দামে। প্রতিটি ট্যাবের দাম ১২ হাজার টাকা। বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চায়না থেকে আমদানি করা লেনেভো ব্র্যান্ডের ট্যাব-৭ কেনা হয়েছে তার বাজারমূল্য সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা। ভ্যাট, ট্যাক্স ও ঠিকাদারের লাভ মিলিয়ে প্রতি ট্যাবে আরও দুই হাজার টাকা যোগ হলেও সাত হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে। অথচ প্রতি ট্যাবে অন্তত পাঁচ হাজার টাকা বেশি দর ধরে প্রকল্প কর্মকর্তারা চার কোটি টাকা লুটপাট করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পড়তে পারেন: খামার নেই তবুও পেয়েছেন প্রণোদনার টাকা, রংপুরে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ
এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে চার কোটি টাকার বেশি। এভাবে বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনাকাটায় কয়েক কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ গড়িয়েছে মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)।
এদিকে গবাদি পশুর প্রেগনেন্সি টেস্টের জন্য আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন গাভির রোগ নির্ণয়ের জন্য কাউ ম্যাসটাইটাস ডিটেক্টরসহ বেশকিছু সরঞ্জাম এক কোটি ৩৫ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে। কিন্তু মিটফোর্ডের মেডিকেল সরঞ্জাম আমদানিকারক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, সেগুলোর বাজারদর সর্বোচ্চ ৫০-৬০ লাখ টাকা। শুধু তাই নয়, এসব সরঞ্জাম এক বছরের বেশি সময় আগে কেনা হলেও লোকবলের অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় আরও কয়েক মাস পড়ে থাকলে সবই বিকল হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
এখানেই শেষ নয়, বিশ্বব্যাংকের সাহায্যপুষ্ট এলডিডিপি (প্রাণিসম্পদ অ্যান্ড ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প) প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসসহ অন্যান্য অফিসের মিনি ডায়াগনস্টিক ল্যাবের কথা বলে তিন কোটি তিন লাখ ৮০ হাজার টাকার মালামাল কেনা হয়েছে । অথচ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে কোনো মিনি ডায়াগনস্টিক ল্যাব নেই।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, দুই বছর আগেও উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে আলাদা কোনো প্রশিক্ষণ রুম ছিল না। অথচ ওই সময় জেলা ও উপজেলা প্রশিক্ষণ রুমের নামে এনএটিপি প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে এক কোটি ৬০ লাখ টাকার টেবিল, চেয়ার ও ডিসপ্লে বোর্ডসহ অন্যান্য মালামাল কেনা হয়েছে।
এক্ষেত্রে নামমাত্র কিছু মালামাল সরবরাহ নিয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে অর্ধেকের বেশি টাকা প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ আছে। এ ব্যাপারে ঘিওর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, তাদের অফিসে প্রশিক্ষণ রুমের জন্য ৩০টি চেয়ার ছাড়া আর কিছুই দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ পাওয়ার পর এ ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব তৌফিক আরিফকে। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অভিযোগটি এসেছে। এখন কার্যক্রম গ্রহণের জন্য নথিতে উপস্থাপনের পর ঊর্ধ্বতনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও বর্তমানে অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহাজাদার সঙ্গে কথা বলুন।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহাজাদা গণমাধ্যমকে বলেন, প্রকল্পের কেনাকাটায় কোনো ধরনের লুটপাট হয়নি। একটি মহল ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য তার বিরুদ্ধে এ ধরনের বানোয়াট অভিযোগ তুলছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রকল্প কর্মকর্তা ডা. এএনএম গোলাম মহিউদ্দিন কাজল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিট থেকে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর জন্য ট্যাব কিনে দেওয়া হয়েছে। এগুলোর মূল্য নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই।’ উপজেলা পর্যায়ে ভেটেরিনারি হাসপাতাল না-থাকা অবস্থায় হাসপাতালের কথা বলে মেশিনারিজ কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডিপিপিতে ভেটেরিনারি হাসপাতাল উল্লেখ আছে বলে ওই নামেই টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে।’
আর ট্রেনিং রুম না-থাকলেও ফার্নিচার কেনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যেখানে ট্রেনিং সুবিধা তৈরি করতে পেরেছি, সেখানেই ফার্নিচার দিয়েছি। বাজার দরের চেয়ে অনেক বেশি দামে মালামাল কিনে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, মালামাল কেনার জন্য টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি আছে। যারা সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের মাধ্যমেই মালামাল সরবরাহ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মালামালের দাম বাজারদরের চেয়ে বেশি হলে আমাদের কিছু করার নেই। তা ছাড়া সরকারি কেনাকাটায় ভ্যাট-ট্যাক্স যোগ হয়ে মালামালের দাম একটু বেশিই হয়।’
এনএটিপি বা ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচার টেকনোলজি প্রকল্প-২ শুরু হয় ২০১৫ সালের অক্টোবরে। এর জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৪৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা খরচ হয়। এ প্রকল্প চলবে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তবে এরইমধ্যে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।
এগ্রিকেয়ার/এমএইচ
























