
পাভেল পার্থ, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: একজন ভোক্তা হিসেবে আমরা কি কখনো ভাবি এই যে দেশে এত ফসল ফলে এর বীজ কে জোগায়? কৃষক, রাষ্ট্র না কোম্পানি? বীজ সরবরাহ ও মজুদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) হলো দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।
তবে কেবলমাত্র বীজ নয়, এই প্রতিষ্ঠান রাসায়নিক কৃষির অনেক উপকরণ সরবরাহ করে। জাতীয় কৃষিনীতি (২০১৮) উল্লেখ করেছে, বর্তমানে চাহিদামাফিক বিভিন্ন ফসলের মানসম্মত বীজের উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি খাত থেকে সরবরাহ করা হয়। বেসরকারি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রধানত হাইব্রিড ভুট্টা, ধান ও শাক-সবজির বীজ সরবরাহের সঙ্গে জড়িত। তো এর বাইরে গ্রামীণ কৃষক সমাজ ধানসহ বসতবাড়ি বাগানের শস্যফসলের বীজের একটা বড় অংশ জোগান দেন।
পড়তে পারেন: কৃষিবিজ্ঞানীর ১০ বছরের গবেষণাক্ষেত তছনছ করলো যুবলীগ নেতা
নারীরা ঘরে ঘরে বীজ সংরক্ষণ করেন এবং মূলত বীজ বিনিময়ের মাধ্যমে দেশে লোকায়ত বীজবিস্তারের সংস্কৃতি কিছুটা এখনো টিকে আছে। যদিও ধান বাদে সবজি ও অন্যান্য ফসলের বীজ পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে বহুজাতিক কোম্পানি। অন্যদিকে, নূর মোহাম্মদের মতো অনেক কৃষক আছেন যারা কেবল বীজের জোগান দেন না, তারা নিজের জীবনের পুরোটাই ব্যয় করেছেন বৈশিষ্ট্যময় জাত উদ্ভাবনে এবং কৃষির উন্নয়নে।
ঝিনাইদহের হরিপদ কপালীর কথা আমরা জানি। যিনি বিশুদ্ধ সারি নির্বাচনের মাধ্যমে হরিধান উদ্ভাবন করেছিলেন, জাতটি দেশে বহুলভাবে সমাদৃত হয়েছিল। খাগড়াছড়ির ফকুমার ত্রিপুরার ফকুমার ধান, সাতক্ষীরার দীলিপ তরফদারের চারুলতা ধান, সুনামগঞ্জের নুয়াজ আলী ফকিরের চুরাক ধান, গাইবান্ধার রঞ্জু মিয়ার সোহাগ ধান কিংবা ঝিনাইদহের মকবুল হোসেনের ম্যানেজার ধান কিংবা বাগেরহাটের লেবুয়াত শেখের ফাতেমা ধান।
গ্রামে গ্রামে কৃষকের এমন বহু নতুন ধান জাত নির্বাচন, জাত সংরক্ষণ, বাছাই এবং এমনকি সফল সংকরায়ণের বহু নমুনা আছে। পারিবারিক কৃষি, গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি থেকে শুরু করে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষকের এমন নিরলস কৃষি গবেষণাকে কোনোভাবেই অবজ্ঞা বা অস্বীকার করা যায় না।
বরং এখনো আমরা ফসল বা বীজের ক্ষেত্রে সবসময় মনে করি ‘গৃহস্থ বাড়ির লাউ বা গৃহস্থ বাড়ির বীজটাই’ সেরা এবং সবদিক থেকে নিরাপদ। আমাদের এই আত্মবিশ্বাস ও মনোজগতের সংস্কৃতি একদিনে গড়ে ওঠেনি। নূর মোহাম্মদসহ দেশের সব অঞ্চলের গৃহস্থ বাড়ির কৃষি গবেষণাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। এসব গবেষণাকাজে কৃষকের পক্ষে বাজেট, নীতিসহায়তা এবং বিশেষ প্রণোদনাসহ রাষ্ট্রের দাঁড়ানো জরুরি।
লেখক: গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ
























