মো. সাজ্জাদ হোসেন, যোগাযোগ মিডিয়া উপদেষ্টা, বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি): পোল্ট্রি নিয়ে কেন জানি কিছু মানুষের মাঝে নাক সিঁটকানো ভাব আছে। এটা যেমন ব্রয়লার মুরগির মাংস বা পোল্ট্রি’র ডিম নিয়ে, তেমনি পোল্ট্রি ব্যবসা নিয়েও।

তাহলে কী পোল্ট্রি মুরগির মাংস খারাপ বা ক্ষতিকর? যাঁরা এ ব্যবসার সাথে জড়িত তাঁরা কি তবে অশিক্ষিত বা সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মানুষ?

যাঁরা এ ধরনের মনোভাব পোষণ করেন তাঁরা কী জানেন যে, পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বাধিক উৎপাদিত মাংস হচ্ছে পোল্ট্রি? তাঁরা কি জানেন যে পোল্ট্রি আসলে একটি বিজ্ঞান!

তাঁরা কি জানেন যে- বাংলাদেশের প্রথম সারির পোল্ট্রি উদ্যোক্তাদের প্রায় সকলেই উচ্চশিক্ষিত! শুধু উচ্চ শিক্ষিত বললেও কম বলা হয়; এ উদ্যোক্তাদের অনেকেই দেশের বাইরে থেকে তাঁদের পড়াশুনা শেষ করেছেন এমনকি হার্ভার্ডের মত দুনিয়াখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া করেছেন; বুয়েটের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতাও করেছেন!

একটা সময় ছিল যখন চামড়া শিল্প নিয়েও এ ধরনের নাক সিঁটকানো ভাব ছিল। মনেকরা হতো এগুলো নীচু শ্রেণীর মানুষের পেশা কিন্তু এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

একটা সময় ছিল যখন ব্রয়লার মুরগির মাংসও মানুষ খেতে চাইত না। বেসরকারি পর্যায়ে দেশের প্রথম বাণিজ্যিক খামারের উদ্যোক্তা চিকস্ এন্ড হেনস্ এর উদ্যোক্তা-দম্পতিকে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়েছিল তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার সাথে।

নিজের খামারে উৎপাদিত মুরগি রান্না করে অন্যদের দাওয়াত করেও খাওয়াতে হতো। যেহেতু বিদেশীরা ব্রয়লার মুরগি সম্পর্কে জানতেন তাই তাঁদেরকে যেচে পড়ে ডেকে আনা হতো খামার দেখার জন্য।

এখন সে অবস্থা নেই। আজ দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩২ হাজার মেট্রিক টন অর্থাৎ বছরে প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন মুরগির মাংস উৎপাদিত হচ্ছে- যার সিংহভাগই হচ্ছে ব্রয়লার।

প্রসঙ্গত: যে দেশী বা পাকিস্তানী মুরগির নামে আমরা যে মুরগি বাজার থেকে কিনে থাকি সেটিও কিন্তু দেশী মুরগি নয় বরং দুটি ভিন্ন প্রজাতির মুরগির শংকরে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত একটি জাত যার নাম দেয়া হয়েছে ‘সোনালী’।

যারা বলেন, ব্রয়লার মুরগি মানুষ খায় না, তাহলে আমার প্রশ্ন হলো- এত বিপুল পরিমান ব্রয়লার মুরগির মাংস তাহলে খায় কারা? অবশ্যই এদেশের মানুষ- যার মধ্যে শহরের মানুষ ছাড়াও একটা বিশাল অংশ রয়েছে গ্রামের মানুষ বা স্বল্প আয়ের মানুষ।

ব্রয়লার মুরগির মাংস একদিকে যেমন নিম্নআয়ের মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটাচ্ছে অপরদিকে তেমনি শহরের নামী-দামী রেস্তোঁরাগুলোতে সবচেয়ে পশ, মজাদার এবং আকর্ষণীয় খাবারগুলোও তৈরি হচ্ছে ব্রয়লার মাংস দিয়েই।

আর বর্তমান প্রজন্মের প্রসঙ্গ এলে এক বাক্যে বলা যায়- এঁরা ব্রয়লার মাংসই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন কারণ এতে মাংসের পরিমান থাকে অনেক বেশি। বয়স্করাও এটি পছন্দ করেন কারণ ব্রয়লার মাংস বেশ নরম।

পরিসংখ্যান বলছে- পোল্ট্রি শিল্পে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে এ শিল্পে।

প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে যার প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। বিগত এক দশকে পুষ্টি সূচকে যে উন্নতি হয়েছে, মানুষের গড় আয়ু বিগত দুই দশকে যে পরিমান বেড়েছে সেখানে সন্দেহাতীতভাবেই পোল্ট্রি’র বড় ভ‚মিকা রয়েছে।

সরকারের বিভিন্ন নথিতে সে কথার স্বীকারোক্তিও মেলে যখন দেখা যায় এখাতের উপর প্রত্যাশার মাত্রাটা নিতান্তই কম নয়। দারিদ্র নিরসনেও পোল্ট্রি’র প্রতি অনেকেই বেশ আস্থাবান, এঁদের মধ্যে মাইক্রোসফটের জনক বিল গেটসও রয়েছেন যিনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধনী হয়েও নিঃসঙ্কোচে বলেছেন, ‘Chickens, Not Computers, Can Solve Poverty’ জাতিসংঘের উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) -এর ১৭ লক্ষ্যের মধ্যে অন্তত: ৯টি লক্ষ্যের সাথে পোল্ট্রি’র সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।

কাজেই এ শিল্পকে অবজ্ঞা করার কিংবা এড়িয়ে যাওয়ার কোনই সুযোগ নেই।

২০১৯ সাল কেমন গেল পোল্ট্রি শিল্পের? এমন প্রশ্নের উত্তরে শিল্প উদ্যোক্তারা নির্দ্বিধায় বলে থাকেন- ‘ভালো না বা ‘বেশ খারাপ! এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?

যখন ডিমের দাম বৃদ্ধির কারণে প্রায়শই গুরুত্বপূর্ণ খবর হয়ে উঠছে পোল্ট্রি, তখন ব্যবসা ভাল না বললেই বা কে বিশ্বাস করবে?

তবে মনে রাখা দরকার ‘ডিম’পোল্ট্রি শিল্পের একটি প্রোডাক্ট মাত্র! বর্তমান সময়ে ডিমের বাজার কিছুটা ভাল একথা সত্য, তবে ২০১৭-১৮ সালে বাজার এতটাই খারাপ ছিল যে ডিম পাড়া মুরগিও বিক্রি করে দিয়েছিলেন খামারিরা।

২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর বিশ্ব ডিম দিবসে মাত্র ৩ টাকায় ডিম বিক্রি করার ঘোষণা দিয়েছিল বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাষ্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি)।

২০১৯ সালটা পোল্ট্রি মাংস (মিট) ইন্ডাষ্ট্রি এবং ব্রিডার ইন্ডাষ্ট্রি’র জন্য বলা যায় খুবই খারাপ গেছে- সত্যিকথা বলতে সে রেশ এখনও কাটেনি। এর মাঝে চরম গ্যাড়াকলে পড়েছিল ফিড ইন্ডাষ্ট্রি।

উৎপাদন খরচ বাড়ার পরও তাঁরা ফিডের দাম বাড়াতে পারেননি কারণ ব্রয়লার খামারিা তাহলে হয়ত ব্যবসা ছেড়েই চলে যেতে পারেন! পরিসংখ্যান বলছে- পাইকারি বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম ৮০-৮৫ টাকায় নেমে গিয়েছিল আর একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চার দাম ৫টাকায়।

যেখানে প্রায় ১২ বছর আগেও ব্রয়লার মুরগির বাজার দর ছিল ১০০ টাকা। অবশ্য এ পরিসংখ্যান থেকে আরও একটি প্রশ্ন পাঠক সাধারনের মাঝে তৈরি হতেই পারে- তাহলো লোকসান দেয়ার পরও কিভাবে টিকে আছে পোল্ট্রি খামারগুলো?

প্রশ্নটা অবান্তর নয় তবে যাঁরা আমাদের দেশের কৃষির উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত আছেন তাঁরা জানেন যে, কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদন খরচের অংশ হিসেবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের পারিশ্রমিকের টাকাটা হিসাবে ধরেন না।

পোল্ট্রি’র ক্ষেত্রেও বিষয়টা সে রকম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী মিলে খামার করছেন, দু’জনই কাজ করছেন, সাথে পরিবারের অন্য সদস্যরাও কোন না কোনভাবে যুক্ত আছেন।

এগুলো সবই অবৈতনিক। কিন্তু ব্রয়লার মাংসের দাম এত কমে যাওয়ার কারণটাও বেশ রহস্যজনক? দীর্ঘসময় দরপতন অব্যাহত থাকাটাও যৌক্তিক ঠেকে না। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন- ২০১৭-১৮ সালে ডিমের বাজারে ধ্বস নামার পর ডিম খামারিরা বিমুখ হয়ে পড়েন।

নেতিবাচক চাহিদার কারণে একই সাথে কমে যায় একদিন বয়সী লেয়ার বাচ্চার উৎপাদনও। খামারিরা তখন ব্রয়লারের দিকে ঝুঁকে পড়েন ফলে লেয়ার বাচ্চার উৎপাদন কমে গিয়ে ব্রয়লার বাচ্চার উৎপাদন বাড়তে থাকে।

২০১৯ সালে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে- কোনভাবেই ব্রয়লার বাচ্চার উৎপাদনে লাগাম টেনে ধরতে পারেননি উৎপাদকেরা। অনেকে আবার এও মনে করেছেন যে চাহিদা বাড়লেই বাচ্চার টান পড়বে তাই উৎপাদন কমানো চলবে না। এ তো গেল একটি চিত্র। আরও ঘটনা আছে।

পোল্ট্রি নিয়ে খুব রহস্যজনক কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর প্রোপাগান্ডা হয়ে থাকে। প্লাস্টিকের ডিম বা নকল ডিম নিয়ে হৈচৈ হলো। মানুষজন ডিম খাওয়া কমিয়ে দিলেন বা বন্ধ করে দিলেন কিন্তু নকল ডিমের অস্তিত্ব প্রমাণ করা গেল না।

বাংলাদেশে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি ডিমের চাহিদা, সেখানে নকল ডিম তৈরি করতে হলে ফেসবুকের দেখানো পন্থায় যে এক দিনে মাত্র কয়েক হাজার ডিমও তৈরি করা সম্ভব নয়, এ কথাটি সাধারণ মানুষ একটি বারও চিন্তা করলেন না।

অভিযোগ উঠল পোল্ট্রি ফিড হাজারিবাগের ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে। ট্যানারি বর্জ্য ব্যবহারের মূল কারণ যদি ‘মিট এন্ড বোন মিল’ হয়ে থাকে তাহলে দেশে যে লাখ লাখ টন মিট এন্ড বোনমিল বিদেশ থেকে আমদানি করা হলো, প্রিমিক্স আমদানি করা হলো সেগুলো গেল কোথায়?

লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হচ্ছে- ‘পোল্ট্রি ফিড’ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো কিন্তু দু’একটি উপকরণ ছাড়া ‘ফিস ফিড’ ও প্রায় একই উপকরণে তৈরি হলেও ফিস ফিড নিয়ে ফেসবুকে কোন প্রশ্ন উঠল না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের একজন শিক্ষকের করা ২০১৩ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদনকে যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই ২০১৯ সালে আবারও মিডিয়ায় তুলে আনা হলো- যেখানে জনৈক গবেষক দেশীয় পোল্ট্রি ফিড যে- ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে তৈরি হয় সে দাবিটি পুণঃউত্থাপন করলেন।

পরবর্তীতে অপর একটি মিডিয়া তাঁর সরাসরি সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে জানতে পারল যে তিনি আসলে পোল্ট্রি ফিড নিয়ে কোন গবেষণাই করেন নি।

তাছাড়া বাণিজ্যিক পোল্ট্রি ফিড কী কী উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় সে সম্পর্কেও গবেষকের পরিষ্কার ধারনা নেই এবং দেশে ২১৭টি নিবন্ধিত ফিড মিলের একটিরও নমুণা তিনি সংগ্রহ করেন নি বা দেশে উৎপাদিত বাণিজ্যিক ফিড- মুরগি বা মানুষের শরীরে আসলেই কোন প্রভাব ফেলছে কীনা সে সম্পর্কেও কোন গবেষণা নেই তাঁর।

তিনি তাঁর দীর্ঘ গবেষণাকালে (২০০৮-২০১৩ সাল) মাত্র ২টি মুরগি নিয়ে গবেষণা করেছেন- যা অনেকটাই হাস্যকর। তবে ভুল এ গবেষণা নিয়ে করা প্রতিবেদনের ফলে যা হবার সেটাই হয়েছে- মানুষের ভেতরে ব্রয়লার মাংস সম্পর্কে আতংক তৈরি হয়েছে।

আমার কাছে মনে হয়- ইন্ডাষ্ট্রি’র বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ এলে, বিষয়টি যেহেতু সত্য নয় তাই সে বিষয়ে নিশ্চুপ থাকার নীতি থেকে সরে আসতে হবে পোল্ট্রি শিল্পকে কারণ সরলতাকে অনেকেই দুর্বলতা বলে মনে করতে পারেন। এতে বিভ্রান্তি বাড়ার আশংকাই থাকে বেশি।

এক সময় মনে করা হতো পরীক্ষার দিনে ডিম খেলে খাতায়ও ডিম পাওয়া যাবে। পরবর্তীততে বলা হলো ডিম খেলে হার্টের অসুখ হবে কিন্তু এ ধরনের কুসংস্কার কি আসলেই কোন উপকারে এসেছে?

নতুন গবেষণায় যখন বলা হলো ডিম খাওয়ার সাথে হার্টের অসুখের সম্পর্ক নেই বরং ডিম হার্টের জন্য উপকারি তখন কেউ কেউ হয়ত আশ্বস্ত হলেন বটে তবে বড় ধরনের পরিবর্তন এখনও আসেনি।

বর্তমান সময়ে অবশ্য ডাক্তাররাও প্রতিদিন অন্তত: একটি ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন; এমনকি কার্ডিওলস্টিরাও বলছেন অপারেশনের রোগীকেও তাঁরা ডিম খেতে দেন।

এন্টিবায়োটিক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে বছরজুড়ে। খামারিরাও বলেছেন- রোগ প্রতিষেধক হিসেবে এন্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হতে পারে তবে এন্টিবায়োটিকের অযাচিত ব্যবহার যেন না হয় সে বিষয়ে নজর দিতে হবে।

সেই সাথে এন্টিবায়োটিকের উইথড্রোয়াল পিরিয়ড মেনে চলতে হবে। পোল্ট্রি উদ্যোক্তারা বলছেন- আগে প্রায়োরিটি ছিল উৎপাদন বাড়ানোর কিন্তু এখন তাঁরা নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনে মনোযোগী হয়েছেন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আমদানিকৃত পণ্যের তালিকা ঘেঁটে মজার এক তথ্য বের হলো যেখানে উদ্যোক্তাদের দাবির এক ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেল। বিপিআইসিসি’র পক্ষ থেকে এ প্রসঙ্গে বলা হলো- ২০১৭ সালে দেশীয় ফিড ইন্ডাষ্ট্রিতে প্রায় ৩০০০ মে.টন এজিপি অলটারনেটিভ এডিটিভস (অঅঅ) আমদানি হয়েছিল যার মূল্য প্রায় ৫০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকা।

প্রায় ৩৪ লাখ মে.টন ফিড এ পরিমান অঅঅ দিয়ে তৈরি করা যায়- যা ছিল ২০১৭ সালে উৎপাদিত ফিডের প্রায় ৮০ শতাংশ। এ তথ্য থেকে আর কিছু না হোক এটা তো প্রমাণ হয় যে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার থেকে সরে আসতে শুরু করেছে পোল্ট্রিখাত।

তবে ২০১৯ সালের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি বোধকরি ‘আগাম কর’ (অঞ)। পোল্ট্রি উদ্যোক্তাদের বক্তব্য হচ্ছে- যেহেতু পোল্ট্রি ভ্যাট অব্যাহতি প্রাপ্ত খাত তাই এখাতের ওপর আগাম কর প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়।

প্রথমে তাঁরা মনে করছিলেন নিশ্চয় কোন ভুল হয়েছে কিন্তু আজকের লেখাটি যখন লিখছি তখনও এ ‘ভুল’টি ভুলই রয়ে গেছে, পোল্ট্রি খাতের ওপর আগাম কর বহাল রয়েছে- যদিও অন্যান্য কিছু খাতের ওপর থেকে সরকার আগাম কর প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

পোল্ট্রি উদ্যোক্তরা বলছেন- পোল্ট্রি উৎপাদনের প্রায় ৬০-৭০ ভাগ খরচ হয় পোল্ট্রি ফিডে। যেহেতু পোল্ট্রি ফিডের অধিকাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয় তাই সরকারের উচিত এখাতকে কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করা কারণ আমদানিকৃত কাঁচামাল দিয়ে ফিড তৈরির পরও সাশ্রয়ী মূল্যে ডিম ও মুরগির মাংস সরবরাহ করছে এখাতটি।

শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোই নয়, এখন ডিম-মাংস রপ্তানীর কথাও ভাবছেন উদ্যোক্তারা। যেহেতু প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে পণ্যের মান আরও বাড়াতে হবে এবং উৎপাদন খরচ আরও কমিয়ে আনতে হবে- তাই আগামী অন্তত: ২০৩০ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি ঘোষণা করা অত্যন্ত যৌক্তিক।

কেউ কেউ অবশ্য কর অব্যাহতির আর্থিক লাভের বিষয়টিও বুঝতে চাইছেন। পোল্ট্রি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ঠিক কত টাকা কর ও শুল্ক বাবদ সরকারি কোষাগারে জমা পড়ে তার কোন সঠিক হিসাব জানা না থাকলেও কেউ কেউ বলছেন এর পরিমান বছরে প্রায় ১০৫০ কোটি টাকা।

দেশে যদি পোল্ট্রি শিল্প গড়ে না উঠতো এবং ঠিক এই সময়ে যদি ডিম আমদানি করতে হতো তবে বছরে প্রায় ৩৩,৮১৩ কোটি টাকা এবং মুরগির মাংসের জন্য ১৫,৯১২ কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হতো। অন্যদিকে ২০২৫ সালের মধ্যে যদি আমরা ডিম, মুরগির মাংস, একদিন বয়সী বাচ্চা, পোল্ট্রি ও ফিস ফিড, পোল্ট্রি প্রসেসড ফুডের রপ্তানী শুরু করতে পারি তবে ৫-৭ বছরের মধ্যেই রপ্তানী আয় কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে- পোল্ট্রিখাতের জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত কর ও শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করা সরকারের জন্য ক্ষতিকর নয় বরং অত্যন্ত লাভজনক।

প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে- চীন, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং হালাল মার্কেটগুলোতে বাংলাদেশের মাংসের যথেষ্ঠ সম্ভাবনা রয়েছে। চীনের জনসংখ্যা ১৪৩ কোটি এবং ভারতের জনসংখ্যা ১৩৭ কোটি ছাড়িয়েছে।

চীনে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ লাখ মে.টন রেড মিটের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে ভারত ও চীন উভয় দেশকেই মাংসের চাহিদা মেটাতে হয়ত আমদানিমুখী হতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউরোপীয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে রেড মিট উৎপাদনের ওপর থেকে সাবসিডি তুলে নেয়া হচ্ছে। মুরগির ওপর থেকেও সাবসিডি ধীরে ধীরে তুলে নেয়া হবে। এতে করে ঐসব দেশে বিলিয়ন ডলারের মার্কেট উন্মুক্ত হতে পারে বাংলাদেশের জন্য।

অবশ্য একটা কথা হয়ত অনেকেই জানেন না- যে ফিড নিয়ে এত প্রোপাগান্ডা, সব ধরনের মান নিশ্চিত করেই সেই ফিড ভারতের কয়েকটি রাজ্যে রপ্তানী শুরু হয়েছে।

২০০৭ সালের আগেও বাংলাদেশ থেকে একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা ও পোল্ট্রি ফিড রপ্তানী হতো। বার্ড-ফ্লু বিষয়ক আন্তর্জাতিক নিয়মে আটকা পড়ে ২০০৭ সাল পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ থেকে পোল্ট্রি রপ্তানী বন্ধ হয়ে যায়। ফিড রপ্তানীতে বিদ্যমান জটিলতাগুলো দূর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হলে রপ্তানীর পরিমান অনেক বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আমার বিশ্লেষণে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প দ্বিতীয় ধাপ অতিক্রম করে তৃতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। এখন অনেক কিছুই নতুন করে ভাবতে হবে। পণ্যের মান, নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে হবে, সেক্টরকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে।

সনাতন পদ্ধতির খামার ব্যবস্থাপনাকে জাপটে ধরে থাকলে হয়ত উৎপাদন কোন মতে ধরে রাখা যাবে তবে মান ধরে রাখা যাবেনা। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই বিজ্ঞান-সম্মত উপায়ে খামার করতে হবে, জীব-নিরাপত্তা কঠোরভাবে অনুসরন করতে হবে, প্রতিটি খামার, ফিড মিল, ব্রিডার ফার্ম, হ্যাচারিকে ২০২০ সালের মধ্যেই নিবন্ধিত করতে হবে নতুবা বন্ধ করে দিতে হবে।

পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালাকে ফাইলবন্দী না রেখে সংশোধন করতে হবে এবং এর প্রয়োগ সুনিশ্চিত করতে হবে। পোল্ট্রি বীমার কথা পত্র-পত্রিকায় শোনা গেলেও বাস্তবে কোথাও নাই।

পোল্ট্রি উন্নয়ন বোর্ড শুধু নয় আমি তো মনেকরি এখাতটি যেভাবে বেড়েছে তাতে আর কিছুদিন পর একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তরেরই হয়ত প্রয়োজন দেখা দেবে।

নীতি-নির্ধারকগণেরও চিন্তা করার সময় এসেছে কারণ যে খাতটি খাদ্য ও পুষ্টি সূচকের উন্নয়নে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, দারিদ্র বিমোচনে, গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে, স্বাস্থ্য ও মেধার বিকাশে, নারীর ক্ষমতায়নে এত বিশাল ভ‚মিকা রাখছে, সে খাতটিকে কি অন্য যে কোন সাধারন খাতের সাথে তুলনা করার সুযোগ আছে? নিশ্চয় নয়।

পরিশেষে ২০১৯ সালের মার্চে প্রকাশিত USAID -এর এক প্রতিবেদনের উল্লেখ করে আজকের লেখাটি শেষ করবো।

ঐ প্রতিবেদনে ‘তৈরি পোষাক শিল্পে’র ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে বলা হয়েছে এবং সেই সাথে যে ৬টি খাতকে সবচেয়ে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়েছে তার প্রথম নামটিই হচ্ছে- এগ্রি বিজনেস। তাই সময় এসেছে চোখ খুলে বিশ্ব দেখার, আগামীর প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এখনই পরিকল্পনা তৈরির।