
এগ্রিকেয়ার ডেস্ক: দেশীয় চাহিদা পূরণ ও আমদানি প্রতিস্থাপনে বড় সাফল্যের পর এখন রপ্তানি বাজারে প্রবেশই দক্ষিণ আফ্রিকার পোল্ট্রি শিল্পের পরবর্তী যৌক্তিক ধাপ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট খাতের নেতারা। তাদের মতে, নতুন বাজারে প্রবেশ করতে পারলে এই খাতের প্রবৃদ্ধি আরও দ্রুত হবে এবং কর্মসংস্থানও বাড়বে।
দক্ষিণ আফ্রিকা পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (SAPA) প্রধান নির্বাহী ইজাক ব্রাইটেনবাখ বলেন, গত কয়েক বছরে দেশটির পোল্ট্রি শিল্প উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। দেশীয় চাহিদা পূরণ এবং আমদানি কমানোর পর এখন রপ্তানি বাড়ানোই শিল্পটির পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত।
খাদ্য ও কৃষি নীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্যুরো ফর ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল পলিসি (BFAP)–এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, উৎপাদন ব্যয়ের দিক থেকে ব্রাজিলের পর বিশ্বের দ্বিতীয় প্রতিযোগিতামূলক পোল্ট্রি উৎপাদক দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। এই গবেষণায় নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, জবাই ওজন এবং খাদ্য রূপান্তর হারসহ বিভিন্ন সূচকে মূল্যায়ন করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার পোল্ট্রি উৎপাদনের সময়কাল তুলনামূলকভাবে কম। তবে দেশটিতে মুরগির গড় জবাই ওজন প্রায় ১ দশমিক ৮৭ কেজি, যেখানে ব্রাজিলে তা প্রায় ২ দশমিক ৯ কেজি।
২০১৯ সালে পোল্ট্রি শিল্পের জন্য মাস্টারপ্ল্যান ঘোষণার পর থেকে দেশটির পোল্ট্রি খাতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সড়ক, বন্দর, জ্বালানি ও পানিসংক্রান্ত অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, ২০২৩ সালের ব্যাপক বার্ড ফ্লু প্রাদুর্ভাব এবং সরকারি ভর্তুকির অভাব থাকা সত্ত্বেও এই অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
গত এক দশকে দক্ষিণ আফ্রিকায় মুরগির উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে ভোগ বেড়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। বর্তমানে দেশটিতে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ মুরগি জবাই করা হয়, যা ২০১৯ সালে ছিল প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ।
এই সময়ে পোল্ট্রি শিল্পের বার্ষিক লেনদেনও বেড়েছে। ২০১৯ সালে যেখানে এ খাতের টার্নওভার ছিল প্রায় ৬৫ বিলিয়ন র্যান্ড, তা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৪ বিলিয়ন র্যান্ডে। এর ফলে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
BFAP–এর নির্বাহী পরিচালক ড. ট্রেসি ডেভিডস বলেন, পোল্ট্রি উৎপাদনে প্রযুক্তিগত দক্ষতার কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার খামারিরা উৎপাদন পদ্ধতি, জেনেটিক্স ও প্রযুক্তি ব্যবহারে আগের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষ হয়ে উঠছেন।
এক সময় আমদানিকৃত মুরগির মাংসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হিমশিম খাচ্ছিল দেশটির পোল্ট্রি শিল্প। ২০১৮ সালে আমদানি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ওই বছর হাড়সহ মুরগির মাংস আমদানি হয়েছিল প্রায় ২ লাখ ৮৭ হাজার টন। তবে ২০২৪ সালে তা কমে ৪০ হাজার টনেরও নিচে নেমে আসে। একই সময়ে মোট আমদানি প্রায় ৫ লাখ টন থেকে কমে ৪ লাখ টনের নিচে নেমে এসেছে।
তবে আমদানির বড় অংশই যান্ত্রিকভাবে হাড়মুক্ত করা মাংস, যা দক্ষিণ আফ্রিকায় বড় পরিসরে উৎপাদিত হয় না। ডেভিডস বলেন, আমদানি প্রতিস্থাপনে বড় সাফল্য মিললেও ভবিষ্যতে এই সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। ফলে শিল্পটির নতুন প্রবৃদ্ধির জন্য রপ্তানির দিকে নজর দেওয়াই এখন সবচেয়ে যৌক্তিক পথ।
তিনি বলেন, দেশটির আয় বৃদ্ধি তুলনামূলক ধীরগতির হওয়ায় ভবিষ্যতে উৎপাদনের বৃদ্ধি ভোগ বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি প্রতিস্থাপনের সুযোগ কমে আসায় রপ্তানি বাড়ানোই শিল্পটির নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
SAPA–এর প্রধান নির্বাহী ব্রাইটেনবাখও মনে করেন, পোল্ট্রি শিল্পের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান ক্ষেত্র হবে রপ্তানি বাজার। নতুন বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি উচ্চমাত্রার বার্ড ফ্লুর বিরুদ্ধে মুরগিকে টিকা দেওয়া জরুরি।
২০২৫ সালের জুনে পোল্ট্রি শিল্পে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও কারিগরি জটিলতার কারণে তা এখনো শুরু হয়নি। কৃষি মন্ত্রণালয় কঠোর বায়োসিকিউরিটি প্রটোকল মানার শর্ত দেওয়ায় এই প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বলে জানান ব্রাইটেনবাখ।
তিনি বলেন, প্রথম ধাপ হবে টিকার অনুমোদন পাওয়া এবং গণটিকাদান শুরু করা। সরকার যদি অনুমতি দেয়, তাহলে দেশে বিদ্যমান এইচ৫ ধরনের বার্ড ফ্লুর টিকা দিয়েই দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব।
এদিকে পোল্ট্রি শিল্পের নতুন রপ্তানি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ইউরোপ, যুক্তরাজ্য এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উচ্চ আয়ের ভোক্তাদের জন্য রান্না করা মুরগির মাংস রপ্তানি করা, বিশেষ করে সৌদি আরবে।
ব্রাইটেনবাখ জানান, দশ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার উৎপাদকদের এমন প্রক্রিয়াজাত মাংস রপ্তানির মতো অবকাঠামো ছিল না। তবে ধারাবাহিক বিনিয়োগের ফলে এখন সেই সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
এই বাজারগুলোতে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পরিদর্শন ও অনুমোদন পেলেই রপ্তানির পথ খুলবে। অনুমোদন মিললে আরও একটি ধাপে প্রমাণ করতে হবে যে দক্ষিণ আফ্রিকার মুরগির মাংসে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ নেই।
নতুন রপ্তানি বাজার নিশ্চিত করা গেলে পোল্ট্রি খাতের অর্থনৈতিক সুবিধা বহুগুণ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন ব্রাইটেনবাখ। এতে শিল্পটিতে সরাসরি কর্মসংস্থান বর্তমান ৫৬ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ৭০ হাজারে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার অধিকাংশ মুরগির মাংস রপ্তানি হয় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে। তবে ঝুঁকি কমাতে নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়ানো এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে শিল্পটি।
ড. ট্রেসি ডেভিডস বলেন, অনেক কৃষিপণ্য খাত যেমন গরুর মাংস, ভুট্টা ও সয়াবিন রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। পোল্ট্রি শিল্পের ভবিষ্যৎও একই পথে এগোতে পারে। তবে এজন্য ব্রাজিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবধান কমাতে হবে।
তার ভাষায়, “ব্রাজিলের পুরো মূল্য শৃঙ্খলই রপ্তানিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আমাদের জন্য এটি নতুন প্রক্রিয়া। তাই অন্য সফল খাতগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিখে ধীরে ধীরে এগোতে হবে।” ব্রাইটেনবাখ বলেন, রপ্তানি বাড়ালেও দক্ষিণ আফ্রিকার কাঠামোগত সব সমস্যা দূর হবে না। তবে এটি অবশ্যই শিল্পটির ঝুঁকি অনেকটা কমাতে সহায়ক হবে।
সূত্র: ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ
























