সাহেদুল আলম রোকন, নাটোর প্রতিনিধি, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: গরম নিবারণে হাতপাখা আবহমান কাল থেকে বাঙ্গালী ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে। যান্ত্রিক যুগেও যে কোন বাঙ্গালীয়ানায় শীতল হতে হাতপাখা ব্যবহার হয়ে থাকে। আর হাতে তৈরী তালপাখা ছাড়া বৈশাখী মেলা যেন ভাবাই যায় না।

তালপাখার এই চাহিদা মেটাতে তালপাতা দিয়ে পাখা তৈরীতে ব্যস্ত সময পার করছেন নাটোরের হাঁপানিয়া গ্রামের সব বয়সী মানুষ। বৈশাখ উপলক্ষে বাড়তি আয়ের আশায়ও করছেন তারা।

নাটোর শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে বাগাতিপাড়া উপজেলার হাঁপানিয়া গ্রাম। উল্লেখ্যযোগ্য তালগাছ না থাকলেও তালপাতা দিয়ে তালপাখা তৈরীর কারণে হাঁপানিয়া গ্রামটি তালপাতার গ্রাম নামে পরিচিতি পেয়েছে। গ্রামটির প্রায় দেড়’শ পরিবারের জীবাকা নির্বাহের মাধ্যম তালপাতার পাখা।

গ্রামটি ঘুরলে প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় দেখা যাবে সারি সারি তাল পাতা শুকাতে দেওয়া আছে রোদে। তার সাথে শুকোতে দেওয়া আছে তালপাতা দিয়ে পাখা তৈরীতে ব্যবহৃত উপকরণ সমূহ। কেউ তালপাতা কেটে পাখার আকার দিচ্ছে আবার কেউবা দিচ্ছেন শেষ মুহুর্তে রংয়ের  ছোঁয়া।

আর এসব কিছু প্রক্রিয়া করণে ব্যস্ত তালপাতা গ্রামের সব বয়সী মানুষ। কেউ বা বাড়ির আঙ্গিনায় কেউ বা বারান্দায় যে যার মতো স্থান বেছে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তালপাখা তৈরির কাজে। বৈশাখী মেলায় একটু বাড়তি লাভের আশায় তালপাখায় শেষ ছোঁয়া দিতে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, ছোট-বড় সকলেরই যেন ব্যস্ততার শেষ নাই।

হাতে তৈরী তাল পাখাই জীবিকার অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে এ এলাকার মানুষের। দেশের বিভিন্ন স্থানে এর চাহিদা থাকায় বেশ লাভবান হবেন বলে আশাবাদী তারা। বাড়তি উপার্জনের সুযোগ নারীদের করেছে স্বাবলম্বী। তবে প্রয়োজনীয় সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা আর ঋণ সুবিধার দাবি জানান তারা।

পাখা কারিগর আসলাম হোসেন এগ্রিকেয়ার২৩.কম কে জানান, তিনি নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে তালপাতা কিনে আনেন। প্রতি এক’শ তালপাতা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় কিনে এনে সেগুলোকে পাখার আকারে গোল করে কাটার পর পানিতে ভিজিয়ে রেখে রোদে শুকানো হয় কয়েকদিন।

শুকানো শেষে সংকুচিত পাতা প্রসারিত করা হয়। পরে গোলাকার পাখাটি রং করা বাঁশের খিল দিয়ে দুপাশ আটকে সেলাই করে দিলেই তৈরী হয় পাখা। প্রতি এক’শটি তালপাখা পাইকারীতে তের’শ থেকে চৌদ্দ’শ টাকায় বিক্রি করে থাকেন।

আরেক কারিগর জামাল উদ্দিন এগ্রিকেয়ার২৩.কম কে জানান, বৈশাখ মাস আসলে বিভিন্ন জায়গায় মেলা হয়। আর এই সময় চাহিদা বেশী থাকায় পাখার দাম কিছুটা বেশী পাওয়া যায়। তাই কিছুটা বাড়তি আয়ের আশায় এই সময় হাঁপানিয়া গ্রামের এক-দেড়’শ পরিবারের প্রায় সকল সদস্য পাখা তৈরীর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

পাবনার ঈশ্বরদী থেকে পাখা কিনতে আসা ব্যবসায়ী মসলেম এগ্রিকেয়ার২৩.কম কে জানান, তিনি এখান থেকে পাখা কিনে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন হাঁটে-বাজারে ও মেলায় প্রতিটি তালপাখা ১৫ থেকে ২০ টাকা দরে বিক্রি করে থাকেন। এতে মোটামুটি একটা লাভ থাকে।

আরশেদুলের স্ত্রী লাবনী বেগম এগ্রিকেয়ার২৩.কম কে জানান, তার শশুর-শাশুড়ী, ননদ আর দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে সাত সদস্যের অভাবী সংসার। তাই সংসারের কামকাজ সেরে তিনিও ব্যস্ত হয়ে পড়েন পাখা তৈরীর কামে।

তিনি বলেন, টাকার অভাবে বেশী পরিমাণে পাখা তৈরীর সরঞ্জামাদি কিনতে পারেন না তার স্বামী। এতে তাদের খরচ বেশী পড়ে। অল্প সুদে ঋণ কিংবা সরকারী সহযোগিতা পেলে তারা স্বাবলম্বী হতে পারতো।

নাটোর বিসিকের (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন) উপ-ব্যবস্থাপক দিলরুবা দীপ্তি এগ্রিকেয়ার২৩.কম কে জানান, তারা যদি এসে জীবনমান উন্নয়নের জন্য কারিগরি সহায়তা, ঋণ সহায়তা, বাজার ব্যবস্থা কিংবা বিপনন সহায়তা চায়। তাহলে বিসিকের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা করা হবে বলে জানান তিনি।

বাগাতিপাড়ার হাঁপানিয়া গ্রামের লোকজনের তৈরী তালপাখার প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন এগ্রিকেয়ার২৩.কম কে জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দিয়ে তাদের জীবনমান আর একটু উন্নত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।