রাজশাহীতে কৃষি ঋণ বিতরণের

মেহেদী হাসান, রাজশাহী, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: চলতি অর্থ বছরের শুরুতে রাজশাহীতে কৃষি ঋণ বিতরণের গতি ধীরে আগালেও গত দুই মাসে এ চিত্র পাল্টে গেছে। গতি বেড়েছে কৃষি ঋণ বিতরণ ও গ্রহণের।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) এর দেয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কৃষিঋণ বিতরণের হার গত দুই মাসের ব্যবধানে ১০ শতাংশ থেকে বর্তমানে (২ সেপ্টম্বর ২০২০) ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। দুই মাসে ব্যাংকটি কৃষিঋণ বিতরণ করেছে ৬০০ কোটি টাকার বেশি।

রাকাব সূত্র জানায়, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ টি জেলার ৩৮৩ টি শাখার মাধ্যমে ৬১৩ কোটি ২ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যংকটি। এরমধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ৪ শতাংশ সুদে ১৬ হাজার ৫’শ ৭২টি আবেদনের বিপরীতে ২’শ ৮৩ কোটি ২ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে চলতি বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন মোতাবেক এ প্রণোদনার বিশেষ ঋণ পাওয়ার যোগ্য, গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি স্তরের কৃষকরা ফুল, ফল, শস্য, মাছ, হাঁস, মুরগি, দুগ্ধ খামার এবং প্রাণিসম্পদ উৎপাদনের সাথে জড়িত খামারিরা।

আলাপকালে রাকাবের ঊর্ধতন কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকটির চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৮’শ ৫০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে জুন মাসে কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতেই তেমন ঋণ বিতরণ না হলেও (জুলাই-আগস্ট) দুইমাসে ৩৮৩ টি শাখার মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করেছে ৬১৩ কোটি ২ লাখ টাকা। শুরুতেই এ ঋণ বিতরণের হার ১০ শতাংশ থাকলেও তা বর্তমানে (২ সেপ্টম্বর ২০২০) ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

কত আবেদনের বিপরীতে কত টাকা দেওয়া হয়েছে: ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, করোনাকালে ৪ টি (কৃষি, শস্য, শিল্প-সার্ভিস, সিএমএসএমই) খাতে কৃষকদের ১৬ হাজার ৫’শ ৭২টি আবেদনের বিপরীতে ২’শ ৮৩ কোটি ২ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ৪ খাতে খাতে বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ হাজার ৩’শ ৬২ কোটি টাকা।

এরমধ্যে কৃষি খাতে চলতি মূলধন খাতে ৩২৯ কোটি, সিএমএসএমই খাতে ৩৬ কোটি, শস্য খাতে ( ৪ শতাংশ সুদে) ৯৫০ কোটি, শিল্প-সার্ভিস খাতে ৫৭ কোটি টাকা বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ ঋণ বিতরণ চলবে চলতি বছরের ৩০ ডিসম্বর পর্যন্ত।

এছাড়াও, মৎস্য, প্রাণি, ডেইরি, শস্য খাতসহ অন্যান্য খাতে ৩৩০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে রাকাব।

কৃষি খাতে চলতি মূলধন খাতের আওতায় ৩ হাজার ৭২ আবেদনের বিপরীতে ১৬০ কোটি। কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্প বা সিএমএসএমই খাতে ৫৫৭ জনের আবেদনের বিপরীতে ১৬ কোটি ২০ লাখ টাকা বিতরণ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি শস্য খাতে ৪ শতাংশ সুদে ১২ হাজার ৯৪৩ আবেদনের বিপরীতে কৃষকরা সুবিধা পেয়েছে ১০৭ কোটি টাকার। প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার কয়েকমাস পেরিয়ে গেলেও শিল্প-সার্ভিস খাতে ৫৭ কোটি টাকার এক টাকাও বিতরণ হয়নি।

চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ঋণ বিতরণ: চলতি অর্থবছরের ২ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা মৎস্য, প্রাণি, ডেইরি, শস্য খাতসহ অন্যান্য খাতে বিতরণ করা হবে। এরমধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজের রয়েছে ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। শস্য খাতে ৯৫০ কোটি টাকার মধ্যে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৮৬ কোটি টাকা। প্রণোদনা প্যাকেজের টাকাসহ ১৯৩ কোটি।

একইভাবে, চলমান কৃষি খাতে ৭০০ কোটির বিপরীতে ১৫৫ কোটি, মৎস্য খাতে ৫০ কোটির বিপরীতে ৯ কোটি ২৭ লাখ, প্রাণিসম্পদ- ডেইরি খাতে ১০০ কোটির বিপরীতে ১১ কোটি ৫৩ লাখ, খামার ও সেচ যন্ত্র খাতে ১০ কোটির বিপরীতে ৪ লাখ, দারিদ্র বিমোচন খাতে ৪০ কোটির বিপরীতে ৪ কোটি ৭ লাখ, কৃষি ভিত্তিক শিল্প খাতে ৩৫ কোটির বিপরীতে ১৫ লাখ, এসএমই খাতে ৭৫০ কোটির বিপরীতে ৩৫ কোটি ৭৫ লাখ এবং অন্যান্য খাতে ২১৫ কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা অর্থবছরের শুরু জুলাই- আগস্ট মাসে বিতরণ হয়েছে ৩০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। রাজশাহীতে কৃষি ঋণ বিতরণের গতি বৃদ্ধির ফলে লক্ষ্যমাত্রা বছরের শেষে অনেকটাই পূরণ হবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংক কর্মকর্তা এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে জানান, উর্দ্ধতনের অনুমতি ছাড়া কথা বলা ঠিক হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেসব কৃষক ঋণ নিতে আগ্রহী তাদের অধিকাংশ ঋণ গ্রহণের উপযুক্ত নন। আর যারা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে পারবেন তাদের তেমন কোন আগ্রহ নেই ঋণে।

রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বেশিরভাগ কৃষক প্রণোদনা ঋণ সম্পর্কে জানেন না। সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণে তাদের তেমন আগ্রহও নেই। বিভিন্ন এনজিও’র মাধ্যমে ঋণ গ্রহণের প্রবনতা থেকে বেরিয়ে সরকারি ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে রাজীও নন অনেকে। এছাড়াও সরকারি ব্যাংকে ঋণ গ্রহনে বেশ জামেলা পোহাতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন: ইলিশের দেখা মিলছে না পশ্চিমবঙ্গের জেলেদের জালে

রাজশাহীর মোহনপুর এলাকার মৎস্য চাষি ও হ্যাচারি মালিক সাবের এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে বলেন, ‘কৃষি উন্নয়ন ব্যংকে যোগাযোগ করেছিলাম ঋণ নেওয়ার জন্য। পরে আর যাইনি। সোনালী ব্যাংকে ৩০ লাখ টাকার আবেদন করেছি। আজ না কাল এরকম করে খালি ঘুরায়। তারা বলেছে, ৩০ লাখের আবেদন করলেও কিছু কম দিবে’।

৪ শতাংশ সুদে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলার পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের পোল্ট্রি ব্যবসায়ী জাহিদ হাসান এগিকেয়ার২৪কম কে বলেন, ‘ করোনার মধ্যে আমার ২ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। তারপর ঋণ পাওয়ার ঘোষণা শুনেছি। আমি কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে যোগাযোগ করে ৪ % সুদে ঋণ নিব ভাবছি। কী কী কাগজপত্র নিবে সেটা দেখতে হবে’।

রাজশাহীতে কৃষি ঋণ বিতরণের গতি বেড়েছে উল্লেখ করে রাকাব’র জনসংযোগ কর্মকর্তা মো: জামিল হোসেন এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে বলেন, শুরুতে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণ ছিল ১০ শতাংশ। ক্রমেই বাড়ছে কৃষকদের আগ্রহ। বর্তমানে ৫৫ শতাংশেরও বেশি। গত জুলাই- আগস্ট দুইমাসে ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ প্রদান করা হয়েছে। প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কিছুটা শিথিল করা হচ্ছে। যাতে তারা সহজেই এ ঋণ নিতে পারে। ঋণ নিতে কৃষকদের কোন জটিলতা নেই।

তিনি আরও বলেন, এখানে কোন ধরণের অনিয়ম করার সুযোগ নেই। যারা ঋণ পাওয়ার যোগ্য শুধুমাত্র তারাই ঋণ পেয়েছেন। প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনমতো ঋণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

করোনা পরিস্থিতিতে কৃষকদের ক্ষতি পোষাতে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষিখাতের জন্য ৫ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা ঋণ ঘোষণা করেন।

উল্লেখ্য, দেশের দুটি বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ৭ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা প্রণোদনার বিশেষ ঋণ বিতরণ করবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো ৩ হাজার ১৯৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করবে বলে কেন্দ্রিয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপণে বলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ৪৩ ব্যংককে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ বিতরণের সময়সীমা নির্ধারণ করে করে দেয় কেন্দ্রিয় ব্যাংক।

এদিকে উল্লেখযোগ্য পরিমান ঋণ বিতরণ না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সময় চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।