জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা এলাকার লেয়ার খামারি সোহেল রানা (২৬)। খামারে আছে ৪ হাজার ডিমপাড়া সাদা লেয়ার। গতকাল খামার থেকে পাইকারিতে সাদা ডিম বিক্রি করেছেন ৯ টাকা ৩০ পয়সা এবং লাল ডিম বিক্রি করেছেন ৯ টাকা ৮০ পয়সায়। তবে এই একই ডিম ঢাকায় খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকায়! তাহলে ৯ টাকার ঘরের ডিম কিভাবে ১৫ টাকায় পৌঁছে তা অনুসন্ধান করেছে এগ্রিকেয়ার২৪.কম।

জানা যায়, মূলত দামের চাবিটা নাড়ায় হাতেগোনা কয়েকজন। গুটিকয়েক পোল্ট্রি কোম্পানির কারসজিতেই হুটহাট দাম বাড়ে আবার কমে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোটবড় পোল্ট্রি শিল্প গড়ে উঠলেও রাজধানীর টঙ্গী, বোর্ড বাজার, জয়দেবপুর ও গাজীপুরে দেশের সবচেয়ে বড় পোল্ট্রি শিল্প গড়ে উঠেছে। মূলত এখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয় ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের বাজার।

পড়তে পারেন: প্রয়োজনে ডিম আমদানির সিদ্ধান্ত

রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার পূর্ব দিকে পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের মোসলেমের মোড়। এটি শুধু ডিম বিক্রির মোড় হিসেবে পরিচিত। ৪ থেকে ৫টি আড়তে প্রতিদিন লাখ লাখ ডিম আসছে জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে। রাজশাহীর নগরীর বাইপাস থেকে পূর্ব দিকে গেলেই দেখা মিলবে এই মোড়ের। মোড়ের বিশেষত্ব হলো এখানে ডিমের দাম নির্ধারণ করা হয়। ‘মোসলেমের মোড় ডিম আড়ত সমিতির সভাপতি’ মো. নাসির উদ্দিন প্রতিদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ডিমের নতুন রেট জানিয়ে দেন। এই রেট ১১০ জন ডিম ব্যবসায়ীর কাছে চলে যায়।

গতকালের এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে এভাবেই। এই সিন্ডিকেটের রাজশাহী অঞ্চলের দায়িত্বে রয়েছেন মো: জয়নাল আবেদিন। যিনি মোসলেমের মোড়ের একটি আড়তে চেম্বার খুলে বসেন। আর এ অঞ্চলের খামারিদের কাছে থেকে ডিম কিনে পাঠান ঢাকায়। এখান থেকেই ট্রাকভর্তি ডিম যায় ঢাকার বাজারে। জয়নাল আবেদিনের আরেক পরিচয় তিনি পোল্ট্রি ফিডের ডিলার ও ফিড মিল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য।

পড়তে পারেন: কমছে ডিম-মুরগিতে, হু-হু করে বাড়ছে বাচ্চার দাম

রাজশাহীর ৯ টাকার ডিম ঢাকায় কেন ১৫ টাকা হয় জানতে চাইলে তিনি এগ্রিকেয়ার২৪.কমকে বলেন, ডিমের দাম বাড়ানো কমানোর হাত আমাদের কাছে নেই। প্রতিদিন ঢাকা থেকে যে রেট দেওয়া হয় খামারিদের কাছে সেই রেটের ৫০ পয়সা কম রাখা হয়। কারণ আমাদের খরচ আছে। রাজশাহী থেকে ঢাকায় একট্রাক ডিম পাঠাতে খরচ হয় ৪০ হাজার টাকা। একট্রাকে ডিম পাঠানো যায় ১ লাখ। হিসেবে ৪০ পয়সা করে প্রতিটি ডিমে খরচ হয়। ঢাকায় কিন্তু আজ বেশি দামে ডিম বিক্রি হচ্ছে না; কিছুটা কমেছে। এখান থেকে প্রতিদিন ৪ লাখ ডিম ঢাকায় পাঠানো হয়। এই কাজ করেন কয়েকজন ডিলার।

তিনি আরোও বলেন, যে সিন্ডিকেটের কথা বলা হয় আসলে সেরকম কিছু নেই। তবে, বড় বড় কোম্পানি তাদের নিজস্ব উৎপাদিত খাদ্য দিয়ে ডিম ও মুরগি উৎপাদন করে ফলে তাদের খরচ কম হয়। প্রান্তিক খামারিরা যদি বড় কোম্পানির আগ্রাসনে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে একচেটিয়া তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে। বর্তমানে তারাই সেটা করছে। আমার নিজেরও ৪ হাজার মুরগি রয়েছে। ১ বছর আগে ১৮’শ টাকায় যে খাদ্য কিনেছি সেই বস্তা বর্তমানে ২৮১০ টাকা। ডিমের দাম না বাড়লে খামরিরা ডিম উৎপাদন কমিয়ে দিবে। সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।

পড়তে পারেন: ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে ব্রয়লার মুরগি, জানা গেলো কারণ

ঢাকার বিভিন্ন বাজারে আজ বৃহস্পতিবার ডিমের হালিতে কমেছে প্রায় ৫ থেকে ১০ টাকা। যারা ডজন কিংবা এক কেস ডিম কিনছেন তারা আরও কম দামে কিনতে পারছেন। এক্ষেত্রে ডজনে ৫ থেকে ১০ টাকা কমে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় কিনতে পারছেন। তাহলে এই ৯ টাকা থেকে অন্তত ১৪ টাকা মাঝখানের ৫ টাকা দাম বাড়ার কারণ কিছুতেই মেলানো সম্ভব হচ্ছে না।

রাজধানীর ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিম কিনতে কম দামে পাওয়া গেলে কম দামে বিক্রি করতে দোষ নাই। লেয়ার মুরগির ডিমের দাম কমলেও দেশি মুরগি কিংবা হাঁসের ডিমের দাম কমেনি। হাঁসের ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৩০ টাকা ও দেশি মুরগির ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায়। লাল ডিম ৫৫ টাকা এবং সাদা ডিম ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে রাজশাহীর সাহেববাজারের ব্যবসায়ীরা বলেন, ডিম-মুরগির দাম বাড়লে ব্যবসা ভালোই হয়। আমরা ছোট ব্যবসায়ীরা মাল স্টক করে রাখার সুযোগ নেই। মোসলেমের মোড়ে ১০ লাখের বেশি ডিম জড়ো হয়। একদিন পর যদি তারা গাড়ি পাঠায় তাহলে তাদের লাভ হবে। কিন্তু আমাদের তা সুযোগ নাই।

পড়তে পারেন: জানুন পোল্ট্রি ফিডের বর্তমান বাজারদর

এই ব্যবসায়ী বলেন, রাজশাহীর বাজারে বর্তমানে লাল ডিমের হালি ৪৬ থেকে ৪৪ টাকা। আর সাদা ডিম ৪৩ থেকে ৪৪ টাকা। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়। সোনালি ২৮০ টাকা, কক মুরগি ২৭০ টাকা, হাঁস ৪৫০ টাকা, রাজহাঁস ৪৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।

খামারি জাহিদ হাসান জানান, “একটা পূর্ণ বয়স্ক ডিম দেওয়া লেয়ার মুরগি দিনে ১৮০ থেকে ২২০ গ্রাম খাবার খায়। ৬টি মুরগি খাবার খায় ১ কেজি খাদ্য। আগে ১ কেজি খাবার ৫০ টাকায় পাওয়া যেতো অর্থ্যাৎ ৫০ কেজির বস্তা ২০০০ টাকায় হয়ে যেতো। একই খাদ্য এখন কিনতে হচ্ছে ৬৫ থেকে ৬৬ টাকা দরে।

এই খামারি বলেন, আগে প্রতিপিস ডিম উৎপাদনে খরচ হতো ৭ টাকা। আর বিক্রি হতো ৭ টাকা ৯০ পয়সা কিংবা ৮ টাকায়। এখন একই ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ছে সাড়ে ৮ টাকার উপরে। আর বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকায়। ১ হাজার মুরগি খাবার খেলে ১০০০ ডিম পাওয়া যায় না। ৯০ শতাংশ ডিম পেলে ১ টাকা করে লাভ হয়। এখন যারা বলছেন ডিমের দাম কেন বেড়েছে তাদের কাছে প্রশ্ন- শুধু খাবার খাইয়েই মুরগি পালন সম্ভব? নাকি শ্রমিক, ঔষুধ, ভ্যাকসিন, পরিবহন আছে? আর ঢাকায় দাম বাড়ার কারণে খামারিদের ওপর চাপ পড়ছে।

পড়তে পারেন: ডিম মুরগির দাম বাড়ার আসল কারণ!

আরেক খামারি সাজিদ হোসেন বলেন, ডিম দেওয়া ১ হাজার লেয়ার পালন করতে বা খামার করতে ৮ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। এখন আমরা দিনে ১ হাজার টাকা লাভ করছি দাম বাড়ার পরে। এতগুলো টাকা ইনভেস্ট করে যদি এ সামান্য লাভ না আসে তাহলে আমাদের সংসার চলবে কিভাবে? সবকিছুর দাম বাড়তি কিন্তু কিছুদিন আগেও আমরা সাড়ে ৭ টাকা দামে ডিম বিক্রি করেছি। মহাজনের কাছে ৮ লাখ ১০ লাখ টাকা বাঁকি!

ফিডের দামের সত্যতা যোগাযোগ করা হয় দেশের বৃহৎ পোল্ট্রি ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কাজী ফিডের বিপনন বিভাগের প্রধান সালাউদ্দিন হাওলাদারের সাথে। তিনি জানান, বর্তমানে ব্রয়লার স্টার্টার ফিড ৩ হাজার ১৬০ টাকা, ব্রয়লার গ্রোয়ার ৩ হাজার ১৯৫ টাকা, ব্রয়লার পুলেট ৩ হাজার ১৫৫ এবং ব্রয়লার ফিনিশার ৩ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা আগে অন্তত ৭০০ টাকা কম ছিল। সবকিছুর দাম বাড়ায় বেড়েছে ডিম-মুরগির দাম। এতে ফিড মিলাররা কিছু করতে পারবে না। কারণ সবগুলোই বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়।

এগ্রিকেয়ার/এমএইচ