
নিজস্ব প্রতিবেদক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দেশের বৃহত্তম জেলা জয়পুরহাটের চাষিরা। পাইকারিতে নামমাত্র দাম হলেও একই আলু খুচরা বাজারে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ সবজি। হিমাগার থেকে পাইকারিতে ১৬ টাকা কেজি আলু কিনে বাজারে ৩০ টাকা দামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে লাভের ভাগ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের হাতে।
হিমাগারগুলোয় প্রকারভেদে বর্তমান প্রতি কেজি আলু ১৬-১৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে তা প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আলু ২৫-৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
চাষী, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২০-২১ মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জেলায় আলু চাষিরা বেশি ঝুঁকেছিলেন আলুতে। বেশ ভালো উৎপাদন হয়েছিল। উৎপাদন ভালো হওয়ায় এবং গত বছর দাম ভালো পাওয়ায় মৌসুমের শুরুতে বিক্রি না করে এবার হিমাগারে আলু মজুদ বেশি করেছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তাতে হিমাগারের খরচসহ প্রতি বস্তা প্রকারভেদে আলুর খরচ পড়েছে ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা।
পড়তে পারেন: দাম না থাকায় মহাসড়কে আলু ছিটিয়ে প্রতিবাদ
এখন হিমাগারে আলু রেখে মোটা অংকের লোকসানে পড়েছেন ব্যবসায়ী, হিমাগার মালিক ও চাষীরা। পাইকারি বাজারে আলুর দাম ও চাহিদা না থাকায় তাদের বিশাল অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে। অথচ লাভের ভাগ খাচ্
মৌসুমের শুরুর দিকে বেশি দাম পেয়েও আলু বিক্রি না করে অধিক লাভের আশায় হিমাগারে মজুদ করে বেকায়দায় পড়েছেন জেলার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। এমন দরপতনের কারণে হিমাগারগুলোয় বর্তমানে ভরা মৌসুমেও কৃষক ও ব্যবসায়ীর উপস্থিতি নেই বললেই চলে।
গত বছরের এ সময়ে যে পরিমাণ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ ছিল, এবার তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আলু সংরক্ষণ করেন তারা। এদিকে বাজারে বর্তমানে সবকিছুরই দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লেও বাড়েনি আলুর দাম। এ পরিস্থিতিতে সংরক্ষণের ভাড়া আর আলু কেনার সময় ব্যবসায়ীকে ঋণ দেয়ার টাকা আদায় করতে না পেরে বিপদে পড়েছেন হিমাগার মালিকরা।
পড়তে পারেন: হিমাগারের ১০ কোটি টাকার আলুতে পচন
জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর আলুর ভালো দাম পেয়ে চাষীরা আলু চাষে ঝুঁকে পড়েন। শুধু চাষীরাই নন, ব্যবসায়ীরাও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আলু চাষ করেন। পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা মৌসুমের শুরুতে হিমাগার মালিকদের কাছ থেকে গত বছরের মতো লাভের আশায় ঋণের টাকা নিয়ে জেলার ২০টি হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেন।
মৌসুমের শুরুতে এসব হিমাগারে আলু সংরক্ষণ হয়েছে (৬৫ কেজি ওজনে) ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ২৫৩ বস্তা। সংরক্ষিত আলু উত্তোলনের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৫ নভেম্বর। এসব হিমাগারে ১৭ লাখ ৫১ হাজার ১৫৩ বস্তা আলু মজুদ রয়েছে। গত বছর এ সময়ের মধ্যে মজুদের প্রায় ৪০ ভাগ আলু বিক্রি হলেও বর্তমানে ২০ ভাগ আলু বিক্রি হয়েছে।
বর্তমান বাজারে আলু প্রতি বস্তা ১ হাজার ২০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গড়ে বস্তাপ্রতি লোকসান গুনতে হচ্ছে ২৫০ টাকা। বাজারে আলুর যে দাম তাতে আরো মোটা অংকের লোকসান গুনতে হবে। সঙ্গে আলু কিনতে ব্যবসায়ীদের দেয়া ঋণের টাকা এবং আলু রাখার ভাড়ার টাকা ওঠাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হিমাগার মালিকদের। লোকসান ঠেকাতে আলু রফতানির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পড়তে পারেন: বাড়িতে বালু দিয়ে দীর্ঘদিন আলু সংরক্ষণের কৌশল
হাটবাজার ও হিমাগারগুলোয় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ৬৫ কেজি ওজনের কার্ডিনাল (লাল) জাতের আলু প্রতি বস্তা ১ হাজার ১০ টাকায়, ডায়মন্ড (সাদা) জাতের আলু প্রতি বস্তা ১ হাজার ৬০, দেশী পাকরি (লাল) জাতের আলু প্রতি বস্তা ১ হাজার ১৫০ এবং রুমানা (পাকরি) জাতের আলু প্রতি বস্তা ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এম ইসরাত হিমাগারের ম্যানেজার বিপ্লব কুমার জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে সারা দেশে সবকিছুর দাম বাড়লেও আলুর দাম দিন দিন কমে যাচ্ছে। এ কারণে চাষী ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি লোকসান গুনতে হচ্ছে হিমাগার মালিকদের। এ অবস্থা চলতে থাকলে হিমাগার মালিকদের আরো বেশি লোকসান গুনতে হবে।
ক্ষেতলাল উপজেলার গুণীমঙ্গল বাজারের ব্যবসায়ী মোজাফফর হোসেন জানান, গত বছর আলুর দাম বেশি পাওয়ায় লাভের মুখ দেখেছিলাম। তাই এ বছর ঋণ নিয়ে দেশী পাকরি জাতের সাড়ে ৩ হাজার বস্তা, স্টিক লাল জাতের ১১ হাজার বস্তা এলাকার কয়েকটি হিমাগারে রেখেছি। বর্তমানে বাজারের যে অবস্থা তাতে এ মুহূর্তে আলুগুলো বিক্রি প্রায় ৩৮ লাখ টাকা লোকসান হবে। এবার আলু নিয়ে বড় বিপদে আছি। মৌসুমের শুরুতে আলু বিক্রি না করে কেন হিমাগারে রাখলাম। নিজের ভুলের খেসারত বড় করেই গুনতে হচ্ছে।
জেলা বিপণন কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আলুর দরপতন নিয়ে এবার সবাই চিন্তিত। যেসব কোমপানি আলু বিদেশে রফতানি করে তাদের সঙ্গে আমরা দফায় দফায় আলোচনা অব্যাহত রেখেছি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আলু প্রক্রিয়াকরণ ও বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে আলুর দরপতন ঠেকানো সম্ভব।
এগ্রিকেয়ার/এমএইচ
























