
ডেস্ক প্রতিবেদন, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: ফেব্রুয়ারির মিষ্টি রোদ আর ফাগুনের আগমনে প্রকৃতি যখন নতুন করে সেজে ওঠে, তখনই মৎস্য খামারিদের ব্যস্ততা শুরু হয় নতুন মৌসুমের প্রস্তুতি নিয়ে।
বাংলাদেশের মৎস্য খাত আজ বিশ্বে যে সাফল্যের জায়গায় পৌঁছেছে, তার পেছনে রয়েছে মাঠপর্যায়ের খামারি, নিবেদিতপ্রাণ মৎস্য কর্মকর্তা এবং মানসম্মত ফিড ও পোনা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা।
সঠিক পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করলে মাছ চাষ হতে পারে সহজ, লাভজনক এবং ঝুঁকিমুক্ত একটি উদ্যোগ। আর সেই যাত্রার শুরু পুকুর প্রস্তুত করা থেকেই।
১. পুকুর সংস্কার
প্রথম ও প্রধান ধাপ: মাছ চাষ শুরুর আগে পুকুরকে পুরোপুরি প্রস্তুত করা অত্যন্ত জরুরি। আগের বছরের জমে থাকা কাদা, অপদ্রব্য এবং তলায় তৈরি হওয়া বিষাক্ত গ্যাস অপসারণ করতে হবে।
শুকানো ও ফাটানো: পুকুরের পাড় মেরামত করে তলার মাটি রোদে ভালোভাবে শুকাতে হবে। এমনভাবে শুকাতে হবে যাতে মাটিতে ফাটল ধরে। এতে ক্ষতিকর জীবাণু ও রোগজীবাণুর বিস্তার কমে যায়।
চুন প্রয়োগ: মাটির অম্লতা দূর ও জীবাণু নিয়ন্ত্রণে শতাংশ প্রতি ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে। চুন পুকুরের পরিবেশকে ভারসাম্যপূর্ণ ও মাছ চাষের উপযোগী করে তোলে।
২. জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা
শুকনো পুকুরে ৫–৬ ফুট স্বচ্ছ পানি ভরাট করার পর পানির গুণাগুণ ঠিক রাখা প্রয়োজন।
লবণ প্রয়োগ: পানির ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রাখতে শতাংশ প্রতি ৫০০ গ্রাম লবণ ছিটিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এটি মাছের শারীরিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
৩. পোকা ও উকুন দমন
পোনা অবমুক্তির আগে পুকুরে ক্ষতিকর পোকা ও উকুন থাকলে তা নির্মূল করা জরুরি। পানির গভীরতা ৫ ফুট হলে শতাংশ প্রতি ৫ মিলি আইভারমেকটিন ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে উকুন ও অন্যান্য ক্ষতিকর জলজ পোকা নিয়ন্ত্রণে আসে।
৪. প্রাকৃতিক খাদ্য বা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন তৈরি
উকুননাশক প্রয়োগের ৪–৫ দিন পর পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি করতে হবে। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন মাছের প্রাথমিক খাবার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একটি ড্রামে নিচের উপকরণগুলো মিশিয়ে ২–৩ দিন রেখে কালচার তৈরি করতে হবে (শতাংশ প্রতি হিসাব):
- ১০০ গ্রাম খৈল
- ৫০ গ্রাম ময়দা
- ৫ গ্রাম ইস্ট
- ১ গ্রাম প্রোবায়োটিক
কালচার তৈরি হলে পুরো পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। এতে পানির রঙ হালকা সবুজ হবে এবং পানির গুণগত মান উন্নত হবে।
৫. পানির মান পরীক্ষা ও পোনা অবমুক্তি
পোনা ছাড়ার আগে অবশ্যই পানির pH ও অ্যামোনিয়ার মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে। আদর্শ pH ৭.৫ থেকে ৮.৫ এর মধ্যে থাকতে হবে এবং অ্যামোনিয়ার মাত্রা শূন্য হওয়া উচিত।
দূরবর্তী স্থান থেকে আনা পোনা সরাসরি পুকুরে ছাড়া যাবে না। প্রথমে পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট মিশ্রিত পানিতে পোনা ধুয়ে নিতে হবে। এরপর পলিব্যাগ ১০–১৫ মিনিট পুকুরের পানিতে ভাসিয়ে রাখতে হবে, যাতে ভেতরের ও বাইরের পানির তাপমাত্রা সমান হয়। তাপমাত্রা সমন্বয় হলে পোনা অবমুক্ত করতে হবে।
সঠিক প্রস্তুতি ও ধাপে ধাপে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে মাছ চাষ সহজ হয়, উৎপাদন বাড়ে এবং ঝুঁকি কমে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই দেশের মৎস্য খাত আরও এগিয়ে যেতে পারে।
























