
সাজ্জাদ আলম খান, অর্থনীতি বিশ্লেষক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম:
ভারতজুড়ে এখন গেরুয়া বিপল্গবীদের জয়জয়কার। জীবন-জীবিকার সংকট পেছনে ফেলে উন্মাদনা জাগিয়ে তুলেছে গেরুয়া কর্মীরা। একের পর এক রাজ্য সরকারে অবস্থান দৃঢ় করে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে তারা। আর এরই মাঝে ১২ মার্চ ভারতীয় কৃষক সভার সদস্যরা দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানীতে ২০০ কিলোমিটার পদযাত্রা করে একত্র হয়েছিলেন।
অর্ধলাখ মানুষের সুশৃঙ্খল আর শান্তিপূর্ণ এই কাফেলা কৃষি ও কৃষক বাঁচানোর বার্তা দিতে চেয়েছে। কিন্তু করপোরেট পুঁজির দোর্দণ্ড প্রতাপে কতটুকু রক্ষা করা যাবে, তা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারতে কৃষকদের আত্মহননের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
নিরুপায়, হতাশাগ্রস্ত কৃষকদের কেউ কেউ পরিত্রাণ পেতে প্রতিবছর আত্মবিসর্জনে এগিয়ে যান। গণমাধ্যমের দাবি, দেশটিতে প্রতিবছর গড়ে ১২ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করে থাকেন। এর প্রকোপ বেশি মহারাষ্ট্রে। গেল বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছেন ২৪১৪ জন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এসব শ্রমজীবীকে রক্ষায় রাজনৈতিক সংগঠনের বড়ই অভাব।
ভারতে এখনও কৃষক সংগঠনের অবস্থান প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ভালো। তাই তো দুইশ’ কিলোমিটার পথ পরিভ্রমণ করে, মুম্বাইয়ে ঢুকে পড়লেন কৃষকরা। দীর্ঘ যাত্রার পরও ক্লান্তি ছিল না তাদের। যেন আত্মহননের আঁধারকে হারিয়ে ফেলতে চায় তারা; নতুন করে জীবনস্রোত ধাক্কা দিয়েছে। তাই তো বস্তি এলাকা আর মধ্যবিত্ত আবাসন থেকে বেরিয়ে এসেছিল সাধারণ মানুষ। কংক্রিটের কাঠিন্য হারিয়ে সংহতির সেই ছবিতে যুক্ত হলো শহুরে সহযাত্রী।
এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি, জঙ্গল সংলগ্ন এলাকায় আদিবাসীদের জমির পাট্টা দিতে হবে। ঋণ মওকুফ আর ফসলের ন্যায্য দাম চেয়ে লংমার্চে স্লোগান ওঠে, ‘অধিকারই চাই, ভিক্ষা নয়।’ ৬ মার্চ নাসিকে শুরু হওয়া পদযাত্রার গোড়ায় ছিলেন ৩০ হাজার কৃষক। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজারে। দাবি মূলত দুটি- কৃষিঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ, ফসল ফলানোর খরচের অন্তত দেড়গুণ মূল্যে কৃষকের কাছ থেকে শস্য কিনে নেওয়া। এর সঙ্গে আছে নদী সংযুক্তি প্রস্তাব বাতিল করে আদিবাসীদের জমি রক্ষা, খরাকবলিত এলাকায় পানির বন্দোবস্ত করা। মহারাষ্ট্রে সাফল্যের কৃষক অভিযাত্রা হবে দেশটির রাজধানী নয়াদিলিল্গ অভিমুখে।
নয়া উদারবাদের সময়ে কৃষিপণ্য রফতানির বাধা তুলে দেওয়া হয়েছে। ফসলের দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। কৃষি ও খাদ্যের বাজারে মুনাফাখোর করপোরেটদের দাপিয়ে বেড়ানোর ব্যবস্থা পাকা করা হয়েছে। সরকার ন্যায্য দামে ফসল কেনার দায় অনেক ক্ষেত্রে এড়িয়ে যায়। পালল্গা দিয়ে বেড়েছে সার, বীজের মতো কৃষি উপকরণের দাম। কৃষকরা যাবেন কোথায়? ধার করে চাষ করছেন। ফসলের দাম না পেয়ে ধার শোধ করতে পারছেন না। মহাজনের তাগাদায় আত্মঘাতী হচ্ছেন দলে দলে। বলা হয়, মহারাষ্ট্র কৃষকের বধ্যভূমি; লড়াই তারই বিরুদ্ধে।
এ ধরনের চিত্র বাংলাদেশেও। কিন্তু তফাত আছে আন্দোলন-সংগ্রামের ধরনে। সত্তর দশকেও কৃষক পরিবারের সদস্যরা রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে বেড়াতেন। দফা, দাবি আর কর্মসূচিতে কৃষি ও কৃষক বাঁচানোর বিষয়টি থাকত অগ্রভাগে। এখন সময় পাল্টে যাচ্ছে, করপোরেট পুঁজি, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নীতি ক্রমেই গলাটিপে ধরছে কৃষক বাজার ব্যবস্থাপনাকে।
কৃষকের কাছে প্রয়োজনীয় তহবিল জোগান দেওয়া যাচ্ছে না কোনোভাবেই। তবে জোগান বেড়েছে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অনেক কৃষক নাম লিখিয়েছেন। কিন্তু যথেষ্ট নয়। বাড়তি দেনার চাপ এত বেশি, শস্য তোলার পরপরই তা বেচে ফেলতে হয়। আগাম বিক্রিতে বাধ্য হতে হয় অনেককে। অথচ দু’তিন মাস ফসল ধরে রাখতে পারলে ভালো দাম পেতে পারত কৃষক।
চাল নিয়ে প্রায়ই দুর্ভোগের মুখে পড়ে নিম্নবিত্ত। মজুদদার, পাইকার অথবা খুচরা ব্যবসায়ী- কার যে দায় তা নিরূপণ করতে করতেই হাওয়া হয় ক্রেতার কষ্টার্জিত অর্থ। কৃষক তারা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। শুধু চাল নয়, সবজি, ডাল, পেঁয়াজ, আদা, রসুনসহ বেশিরভাগ কৃষিপণ্যেই কারসাজি হয়; আর এসব ক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তির নজির তেমন নেই। তাই অরাজকতা ঠেকাতে কৃষি বিপণন আইনের খসড়া হয়েছে। কৃষিপণ্য গুদামে থাকা সত্ত্বেও বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে ব্যবস্থা নেবে সরকার।
খসড়ায় বাড়ছে দণ্ড, আর একই অপরাধ এক বছরের মধ্যে কেউ দ্বিতীয়বার করলে সাজার পরিমাণ হবে দ্বিগুণ। কৃষিপণ্য কারসাজি বন্ধে চূড়ান্ত হয়েছে খসড়া ‘কৃষি বিপণন আইন-২০১৮’। খসড়া আইনে স্পষ্ট করা হয়, সরকার নির্ধারিত হারের অধিক মুনাফা নিলে, সংকট সৃষ্টি করলে অথবা পরস্পরের যোগসাজশে সিন্ডিকেট করে মুনাফা লুটলে শাস্তি পেতে হবে। কোনো বাজারে কৃষিপণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে বাধা দিলেও তা হবে অপরাধ। কৃষিপণ্য, কৃষি উপকরণ, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য উৎপাদন, সরবরাহকারী, ডিলার, ব্যবসায়ীকে পণ্যের রসিদ সংরক্ষণ করতে হবে।
আইন ভাঙলে জরিমানা দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়াও রাখা হয়েছে এক বছরের জেলের বিধান। কৃষি উপকরণ বিক্রিতে অস্বীকার করলেই শাস্তি পেতে হবে। গুদামজাত পণ্য ভোক্তার কাছে চাহিবামাত্র দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকছে। সরকার নির্ধারিত হারের অধিক মুনাফা নেওয়া যাবে না। সিন্ডিকেট করে মুনাফা লুটলে শাস্তি হবে। বাজারে কৃষিপণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে বাধা দিলেও তা হবে অপরাধ। উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীকে পণ্যের রসিদ সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু আইন হবে, তা যে পুরোপুরি কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে, তা এখনই হলফ করে বলা যাচ্ছে না।
কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাংলাদেশে অধরাই রয়ে গেল। আইনি কাঠামো তৈরির নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। তবে বসে নেই করপোরেট পুঁজির দিশারিরা। ব্যক্তির পাশাপাশি এখানে যুক্ত হয়েছে এনজিও পুঁজিও। ধরুন, নীলফামারীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে সবজির বীজ উৎপাদন করা হবে। অনেকটা পুরনো কায়দায় একের পর এক জমি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। আর সেখানে বীজতলা তৈরি করা হচ্ছে।
টানা কয়েক বছর বীজতলা তৈরির পর জমি উন্নয়নে যেসব কারিগরি পদক্ষেপ নিতে হয়, তা না করেই ফিরিয়ে দেওয়া হয় প্রান্তিক কৃষককে। আর প্রলুব্ধ করে সবজি, সরিষা, সুগন্ধি চাল এমনকি পশু পালনে জোগান দেওয়া হচ্ছে কৃষককে। দেখভালের সুবিধার্থে এ ধরনের আবাদে প্রলুব্ধ করা হয় গ্রামপতিদের। সেখান থেকে বাছাই করা পণ্য কিনে নেওয়া হয় বটে; তবে তা দীর্ঘমেয়াদে সুফল দেয় না।
বাংলাদেশের বিপণন বিশেষজ্ঞরা এখনও এমন কোনো বাজার ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি, যেখানে কৃষক ন্যায্যমূল্য পেতে পারেন। মুনাফা খুব একটা জোটে, তাও কিন্তু নয়। অনেকটা প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব নিয়ে গ্রামের অনেকে কৃষিতে যুক্ত আছেন। বাজারের নাম কৃষি মার্কেট হলে, কৃষক এখানে সরাসরি পণ্য এনে বিক্রির সুযোগ পায় না। এমনকি কৃষক সমবায় বাজার দখলে রেখেছে মুনাফামুখী ব্যবসায়ীরা। কৃষক ঠকিয়ে হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতা অনেক দিন ধরেই চলে আসছে। আর পিছিয়ে থাকা অনেক কৃষকের কাছে এটা এখন নিয়তি হিসেবে মনে হয়।
এই নিয়তি ভেঙে স্বচ্ছ বাজার কাঠামো তৈরির লড়াই যারা করবেন, তারাও এখন মনে হয় অনেকটা ক্লান্ত। ঝিমিয়ে পড়েছে কৃষক সংগঠন। তবে জেগে আছে, কৃষিতে কীভাবে করপোরট পুঁজির আধিপত্য বাড়ানো যায় তাদের নীতিনির্ধারকরা। ব্যাংক আর মাইক্রো ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটের তৎপরতা বেড়েছে। ব্যাংক থেকে পাইকারি অর্থ নিয়ে মাইক্রো ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউট তৃণমূলে ছড়িয়ে দিচ্ছে তহবিল। কিন্তু এখন অধরা রয়ে গেছে অনেক অঞ্চল, অনেক কৃষক। তাদের সহযোগিতার জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত কর্মসূচি ও সংগঠন।
বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি থাকে না এ দেশে। অনেক ক্ষেত্রে ফসল বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচই উঠে না। এর প্রভাব পড়েছে প্রবৃদ্ধিতে। আত্মহননের অশুভ অনিবার্যতা থেকে বাঁচাতে প্রয়োজন অগ্রসরমান অর্থনৈতিক কর্মসূচি। এক কোটি ৮০ লাখ কৃষকের সুরক্ষায় থাকতে হবে প্রায়োগিক নীতিনির্ধারণী অবস্থান।
কৃষিতেও প্রযুক্তির সফল ব্যবহার যেমন করতে হবে, তেমনি কৃষক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখা প্রয়োজন। খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ সমাজে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি আর বৈষম্য কমিয়ে আনতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আগে দীর্ঘমেয়াদি নীতি-কাঠামো আসা জরুরি হয়ে উঠেছে।
























