মেহেদী হাসান, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: লালন গীতিকা ‘আমি অপার হয়ে বাসে আছি’র মতো জনগণ চাতকের মতো তাকিয়ে আছে, কবে চালের দাম কমবে। বোরো মৌসুম পেরিয়ে ভরা আমন মৌসুমেও কমেনি চালের দাম, উল্টো বেড়েছে। আবারও বোরো মৌসুম চলে এলো। তবে, চালের দাম কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে তার কারণ জানে না সরকার। জনমনে প্রশ্ন, তাহলে কী ‘সরষে ফুলেই ভূত’ রয়েছে। খোদ সরকারের কাছাকাছি কোন একটি গোপন মহল জনগণের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে লুকোচুরি খেলছে!

একদিকে ‘গোদের ওপর বিষফোঁড়া’ ও অন্য দিকে ‘সাদা পায়জামা নষ্ট’ হওয়ার ভয়। সরকারকে একদিকে কৃষককে বাঁচাতে হবে, অন্যদিকে ‘বিরাগভাজন’ হওয়া সম্ভব নয়। সর্বক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার অভাব। কৃষকের কাছে প্রণোদনার বীজ পৌঁছায় জমিতে চারাগাছ গজানোর পরে। প্রণোদনার বীজে গাছ গজায় না, কৃষক মার খায় পুরো মৌসুম। খামার বিক্রি করে দেউলিয়ার হওয়ার পর আসে সরকারি সহায়তা। তাহলে গলদ কোথায়!

দেশে নেই খাদ্য সঙ্কট, তবুও সরকার ছুটছে চাল আমদানির দিকে। ইতোমধ্যে আপনারা জানেন প্রথম দফায় ৫০ হাজার টন চাল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে। জানুয়ারির মধ্যে আরো দেড় লাখ টন। আমদানিতে চালের দাম কমবে না বলেও শঙ্কা রয়েছে। এদিকে সিন্ডিকেটের দখলে চালের বাজার। বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে এ অদৃশ্য শক্তিকে দমন করতেই চাল আমদানি করা হচ্ছে এমনটিই বলছে সরকার। আসলে কি চাল আমদানিতে দাম কমবে? কৈ দাম তো কমলো না বরং বাড়লো!

তাহলে এ বিষয়ে শুধুমাত্র একটি অঞ্চলের আলোচনা করা যাক। ভাতের হাঁড়ির একটি ভাত টিপলেই বোঝা যায় ভাতের অবস্থা।

যেসব দৃশ্যমান কারসাজি বছরের শুরু থেকেই। বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (ব্রি) এ গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মৌসুমের শুরুতেই এক মাসের মধ্যে উদ্বৃত্ত ধানের ৫২ শতাংশ বিক্রি করে দিচ্ছেন কৃষক। আর এক থেকে দুই মাসের মধ্যে বিক্রি হচ্ছে ২৫ শতাংশ, দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ১৮ শতাংশ এবং চার মাস বা তার বেশি সময়ের মধ্যে বিক্রি করা হচ্ছে ৫ শতাংশ ধান।

আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইএফপিআরআই) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জমির পরিমাণ বা আকারের হিসাবে দেশের প্রায় ৮৩ শতাংশ কৃষকই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র। শূন্য দশমিক ৫ একরের নিচে এমন আকারের জমি আবাদ করে থাকেন ৩৬ শতাংশ কৃষক। তাদের বলা হয় প্রান্তিক কৃষক। আর শূন্য দশমিক ৫ থেকে দেড় একরের কম জমি আবাদ করেন ৪৭ শতাংশ, সংজ্ঞানুযায়ী তারা ক্ষুদ্র কৃষক। ফলে দেশের সিংহভাগ কৃষকই ক্ষুদ্র ও ছোট জমিতে আবাদ করেন। এসব জমিতে আবাদের মাধ্যমে কৃষক নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য আর্থিক এবং সামাজিক চাহিদা পূরণ করেন। এতে চাহিদা মেটানোর জন্য কাটার শুরুতেই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন কৃষক। এটির সুযোগ নিচ্ছেন মিলার ও ফড়িয়ারা।

পড়তে পারেন: কৃষি বাজেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শুধু উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার প্রায় ২০০ অটো রাইস মিল মালিক ও শতাধিক মজুদ ব্যবসায়ী বাজার রেখেছে নিজের দখলে। পাইকারি চাল ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, বাজার নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় এই চক্রটি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নিজেদের কাছে জনগণকে জিম্মি করছে। সারাদেশেই এরকম অসংখ্য সিন্ডিকেটের ফসল এই চালের বেপোরোয়া দাম বৃদ্ধি।

রাজশাহী অঞ্চলের ৮ জেলার চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে অটো রাইস মিল মালিক ও মজুদদারদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাঁরা ছোট ছোট চালের দোকানের আড়ালে গুদামজাত করেছে ধান ও চাল। সরকারের চোখে দৃশ্যমান এসব কাণ্ড। তবে কার্যকরী আইনের প্রয়োগ করা হচ্ছে না। সরকারি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জনগণের চাইতে চেয়ারের সাথে সখ্যতা বেশি। রাজার চাকরি! মাসোয়ারা তো থাকছেই!

সরকারের খাদ্য সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম ছিল বোরো। এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট সরকারের বোরো ধান সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হতে দেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের আগস্ট মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে সরকারি গুদামের জন্য বোরো ধান সংগ্রহ শেষ করার করা ছিল খাদ্য অধিদপ্তরের। কিন্তু এ সময়ে (৩১ আগস্ট) পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে সরকারি বোরো সংগ্রহ হয়েছিল লক্ষ্যমাত্রার এক-তৃতীয়াংশের কম। অদৃশ্য শক্তি আমন মৌসুমেও সক্রিয় হয়েছিল। বছর ঘুরে ২০২১ হলো, তারা তাদের ব্যবসাও রেখেছে তরতাজা।

এ অঞ্চলের ৮ টি জেলা (রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া,জয়পুহাট, পাবনা) থেকে ধান সংগ্রহ করা হয়। সরকারের নির্ধারিত দামের চেয়ে খোলা বাজারে কৃষকদের কাছে থেকে বেশি দামে ধান কিনে নেয় অটো রাইস মিল মালিক ও শতাধিক মজুদ ব্যবসায়ীরা। বোরো মৌসুমে লাখ লাখ মণ ধান মজুদ করে বাজার নিজেদের আয়ত্তে করে এই সিন্ডিকেট। এখন তারা নিজেদের ইচ্ছামতো চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অসংখ্য অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। শুধু রাজশাহী অঞ্চল নয়, সারাদেশেই এ কর্মযজ্ঞ চালায় বলে জানা গেছে।

অভিনব পদ্ধতিতে করোনাকালে মিলারদের হয়ে কাজ করা ছোট ছোট খুচরা ব্যবসায়ীরা মোবাইলের মাধ্যমে ধান কিনে কৃষকের ঘরেই আটকে রাখছে। আবার অসংখ্য মুদি দোকানে মজুদ হয়েছে লাখ লাখ টন চাল। সবমিলিয়ে প্রশাসনের ক্ষমতা প্রয়োগের কোন এখতিয়ারও নেই। ফলে নানান ক্ষুদ্র সমস্যার সমষ্টি হয়ে দাঁড়িয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি। এ যেন সরষে ফুলে ভূত লুকিয়ে!

তবে, সরকারের পক্ষ থেকে যা যা বলা হচ্ছে তা “কথার কথা”। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা অনায়াসে বলেছেন,‘দেশে চালের কোনো সঙ্কট নেই সবার ঘরে ঘরে ধান-চাল আছে। আমরা মোটা চাল আমদানি করছি, যাতে নিম্নআয়ের লোকদের কষ্ট না হয়। আর সিন্ডিকেটের কোন অস্তিস্ব নেই। আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি। ধানের দাম বাড়ার কারনেই চালের দাম বাড়ছে।’

সমস্যা সমাধানে আসলে কোন পর্যায়ে নেই তদারকি। সরকারি কর্মকর্তা নিজের দফতর ছেড়ে বের হয়ে জনগণের কাছে কমই পৌঁছান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা একথা অনায়াসে স্বীকার করেন যে, চালের দাম বৃদ্ধিতে সিন্ডিকেটের কিছুটা হাত রয়েছে। সারাদেশেই এরকম আছে। তবে সরকারের চাল আমদানি শুরু হলে তারা দমে যাবে। এক্ষেত্রে সরকারের আরোও ভূমিকা রাখা দরকার। সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৪০ টাকা দরে ধান কিনতে পারেনি কেউই। মিলাররা ধান কিনেছে বেশি দামে। কম দামে সরকারকে চাল তারা দেবে কিভাবে? আর ধানের দাম বৃদ্ধির কারণেই চালের দাম বৃদ্ধি।

আপনারা ভাবছেন, আসলে জনগণের টাকা কার পকেটে পৌঁছায়! জনগণের টাকা কর্পোরেটদের ঝুলিতে জমা হয়। মন্ত্রী-এমপিদের কাছের লোক আসলে ক্ষমতার ঘ্রাণ নিয়ে জনগণের গলা কাটে। একচেটিয়া ব্যবসা মূলত তারাই করে। খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের তেমন লাভ নেই। মোটা অংক মিলার আর মজুদদারদের কাছে।

রাঘববোয়াল অটো রাইসমিল মালিকদের কাছে চাতাল ও অপেক্ষকৃত ছোট পরিসরে চাল উৎপাদনকারীরা নাজেহাল। শান্তিতে নেই তারাও। চালের দাম বাড়লে যাদের লাখ লাখ টন ধান-চাল মজুদ করার ক্ষমতা আছে তাদের লাভ হবে। চাতালের তেমন কোন লাভ নেই। বরং অটো রাইস মিলের দাপটে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। প্রথম থেকেই অটো রাইস মিলগুলো উল্লেখযোগ্য ধান সংগ্রহ করে। অটো রাইস মিল মালিকরা অনেক বেশি ধান সংগ্রহ করে নিজেদের ইচ্ছামতো চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। ছোট ব্যবসায়ীরা বড় ব্যবসায়ীদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে দেয়।

প্রান্তিক কৃষকের কাছে ধানের কোন মজুদ থাকেনা। ধান কাটার পর ৫২ শতাংশ কৃষক তার ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। আর এসব ধান মৌসুমের শুরুতেই মজুদদাররা ধান-চাল মজুদ করে রাখে। তারাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এসব সিন্ডিকেট ও মজুদদাররা সুযোগ পেলেই দাম বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে ধান-চালের দাম বাড়লেও সেই টাকা চলে যায় তাদের পকেটে। কৃষকরা এই টাকার কোন সুফল ভোগ করতে পারেন না।

অটো রাইস মিল মালিকরা ধানের মজুদ গড়ে তুলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। সারাদেশে কয়েক হাজার চাল কল আছে। নওগাঁতে আছে ১২০০ চালকল, তার মধ্যে ৫৩ টি অটো রাইস মিল। আর এ মালিকরা বেশি দামে ধান কিনে। সারাদেশে যখন দাম বেশি তখন কৃষকরা কম দামে সরকারি গুদামে ধান দেয়না। ধান বেশি দামে কেনা থাকলে চাল কমদামে বিক্রি হবে এটা হয়না।

অপরদিকে কৃষকদের ধানের দাম বেশি হবে আমরাও চাই। যাতে তারা পেশা বদল না করে। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যদাম বন্দি। কৃষকরা ৫ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হিমশীতল ঠান্ডায় বোরো চাষ করে। ফসল উঠার পর ১মণ ধানের দাম পায় ৯’শ থেকে ১ হাজার টাকা। লাভ হয় ১’শ থেকে ১৫০ টাকা। আর মাত্র ২ মাস সেই ধান কিনে রেখে প্রতিমণে লাভ করে ৩’শ থেকে ৪’শ টাকা। এটা কোন দেশের কৃষিতে আছে!

অবশেষে ‘সব কথা’ না বলেও যা বোঝা যায় পরিস্কার। তা হলো- চালের দাম বাড়ার পিছনে সরকারের একটি মহলই কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। সরকার অন্যান্য ক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ যেভাবে দ্রুত নিতে পারছে, ঠিক সেভাবে চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে কি কি কারণ রয়েছে তা খুঁজে বের করা সরকারেরই দায়িত্ব। হটাৎ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির অবস্থা বেশ কয়েক বছর ধরে চললেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয় না। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে খাদ্যমন্ত্রী সাধনচন্দ্র মজুমদার মজুদদারদের হুঁশিয়ারি করে বলেছেন, অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কথা সর্বস্ব না হয়ে সরকার ও জনগণ একত্রে সিন্ডিকেট রুখতে ভূমিকা রাখতে হবে। তাহলেই দেশের মানুষ রক্ষা পাবে।

লেখক,
মেহেদী হাসান
নিজস্ব প্রতিবেদক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম
সাংগঠনিক সম্পাদক, রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি।
রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী।