বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯, ১২:২৩
Home > বিশেষজ্ঞ কলাম > বাংলাদেশের বীজশিল্প
2097_ACS_1627_19-Poultry_Dairy-Ad
বাংলাদেশের বীজশিল্প

বাংলাদেশের বীজশিল্প

কৃষিবিদ মো. আজিম উদ্দিন, প্রধান বীজ প্রযুক্তিবিদ, কৃষি মন্ত্রণালয়: বাংলাদেশের বীজশিল্প। বীজ প্রযুক্তিবিদ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদাপূরণ করে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত সুখী সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে উন্নীত করার লক্ষ্যে বীজ শিল্প ও প্রযুক্তিতে গতিশীলতা আনয়নসহ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে বীজ প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষির উন্নয়নে বীজই প্রধান ও মুখ্য উপকরণ। বীজ ভাল না হলে অন্যান্য উপকরণের ব্যবহার ফলপ্রসু হয় না, কখনও  কখনও একেবারেই অপচয় হয়। এটা পরীক্ষীত যে, মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারে শতকরা ১৫-২০ ভাগ উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।

সুতরাং মানসম্পন্ন বীজকে কেন্দ্র বিন্দু ধরেই স্থিতিশীল খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে উন্নত জাত ও মানের বীজের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই দেশে মানসম্পন্ন বীজের ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মানসম্পন্ন বীজের গুরুত্ব অনুধাবন করে এবারের জাতীয় বীজ মেলা, ২০১৯ এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখবে মানসম্পন্ন বীজের ব্যবহার।

বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে না জমি। মানুষের খাদ্য চাহিদা ক্রমাগত বেড়েই চলছে, বর্ধিত জনসংখ্যার স্থিতিশীল খাদ্য ও পুষ্টি  নিরাপত্তা বর্তমান সময়ে কৃষির মূল চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৬০.৭৫ মিলিয়ন, ধারণা করা হচ্ছে ২০২০ সালের মধ্যে তা বেড়ে গিয়ে হবে ১৭০ মিলিয়ন।

এমতাবস্থায়, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ৫-৬ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে হলে দরকার বীজ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ। বাড়ছে মানুষ, কমছে জমি। এমতাবস্থায় কম জমিতে অধিক ফলন পেতে হলে সকল চাষের জমিতে পর্যায়ক্রমে মানসম্মত বীজ ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ এখন নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে; আগামী ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান পাবে। ফলে দ্রুত গতিতে আমাদের শিল্পেরও উন্নতি হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষিতে নানাবিধ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদনশীলতা পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে এবং কৃষিতে যান্ত্রিকরণ হচ্ছে।

অর্থাৎ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় কৃষি কাজে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা কমে গেছে। মানুষ কৃষি পেশাকে বাদ দিয়ে অধিক আয়ের জন্য শহরমুখী হয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ দানাদার খাদ্যশস্যে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে; জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এর তথ্যমতে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বে ৪র্থ, পাট উৎপাদনে ২য়, আলু উৎপাদনে ৮ম, সবজি উৎপাদনে ৩য়, চা উৎপাদনে ৪র্থ, আম উৎপাদনে ৮ম স্থান অর্জন করেছে। এ উৎপাদনের পিছনে ভালবীজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

বীজ প্রযুক্তির ব্যবহার: পৃথিবীর অনুন্নত, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে বীজ কর্মসূচি রয়েছে; যা থেকে কৃষিতে ভাল বীজের ব্যবহার হচ্ছে। বীজ ব্যবহারের পরিমাণ ও মান নির্ভর করে সেদেশে ব্যবহৃত বীজ প্রযুক্তির উৎকর্ষের উপর। যে দেশ যত উন্নত সে দেশে ভাল বীজের ব্যবহারও তত বেশী।

 কৃষি মন্ত্রণালয় হতে বীজ ব্যবসার জন্য ৩২,০০০ বীজ ডিলারকে নিবন্ধন প্রত্যয়ন প্রদান করা হয়েছে। প্রায় ৯০,০০০ চুক্তিবদ্ধ চাষির মাধ্যমে সারাদেশে সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরে বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের চাষিদের হাতের নাগালে এখন উন্নত জাত ও মানের বীজ পাওয়া যাচ্ছে।

বর্তমান বাংলাদেশেও হাজার হাজার টন বীজ ব্যবহার হচ্ছে, অনেক বড় বড় দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানি বীজ ব্যবসা করছে। বীজ ব্যবসার সফলতার মূল ভিত্তি হলো “বীজ প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন’।

বীজকে নিয়ে এখন শিল্প গড়ে উঠেছে। এ শিল্পের উৎপাদিত পণ্য হচ্ছে ভাল বীজ। বীজ প্রযুক্তি প্রয়োগ করে ভাল বীজ পাওয়া যায়। তাই বীজ শিল্পের অন্তর্নিহিত চালিকাশক্তি হচ্ছে বীজ প্রযুক্তি। বিভিন্ন ফসলের বীজে বীজ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বীজ শিল্পের জন্য ভাল বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। সভ্যতা শুরুর আদি প্রযুক্তি হচ্ছে বীজ প্রযুক্তি।

সভ্যতার সময় বিকাশের সাথে বীজ তথা বীজ প্রযুক্তির অবস্থান অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং সুদৃঢ় হয়েছে। উদ্যান সভ্যতার উন্নততর হতে উন্নততর স্তরে নিয়ে বীজ প্রযুক্তি বিষয়ক নব নব আবিষ্কার বীজ প্রযুক্তিকে উন্নত হতে উন্নততর স্তরে নিয়ে যাচ্ছে। তাই বীজ প্রযুক্তির ব্যবহার আগামীতে সভ্যতার স্তরের সাথে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেই বেড়ে চলবে।

ফসল চাষের জন্য ব্যবহৃত গাছের যে কোন অংগকে সাধারণভাবে কৃষিকাজে বীজ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। যেমন ধান বা গমের দানা, গোল আলু, আদা, রসুন, কচুর কন্দ, কলা গাছের গুঁড়ি ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে এর সব কটিই বীজ নয়। ধান বা গমের দানা প্রকৃত বীজ। অন্যগুলো রূপান্তরিত কাণ্ড বা মূল। এ পরিপ্রেক্ষিতে কৃষিকাজে ব্যবহৃত বীজকে বীজ না বলে কৃষিবীজ বলা যেতে পারে। দেশের বীজ আইনেও বীজকে সংজ্ঞায়িত করে দেয়া হয়েছে।

`বীজ’ অর্থ মাদকদ্রব্য অথবা চেতনানাশক হিসাবে ব্যবহার ব্যতীত, পুনঃউৎপাদন এবং চারা তৈরিতে সক্ষম নিম্নবর্ণিত যে কোনো জীবিত ভ্রূণ বা বংশ বিস্তারের একক (প্রপাগিউল), যেমন:-খাদ্য-শস্য, ডাল ও তৈল বীজ, ফলমূল এবং শাক-সবজির বীজ, আঁশ জাতীয় ফসলের বীজ, চারা, কন্দাল, বাল্ব (Bulb), রাইজোম, মূল ও কান্ডের কাটিংসহ সকল ধরনের কলম এবং অন্যান্য অঙ্গজ বংশ বিস্তারের একক।

ফসল উৎপাদনের পরিমাণ ও মান বৃদ্ধির জন্য ভাল বীজ ব্যবহার করার এবং ভাল বীজের ব্যবহার বৃদ্ধি করার গুরুত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। ভাল বীজ ব্যবহার করা এবং ভাল বীজের ব্যবহার বৃদ্ধি করার জন্য গৃহীত সমুদয় কাজকে একত্রে বীজ প্রযুক্তি বলা যেতে পারে।

অন্যভাবে বলা যায় বীজপ্রযুক্তি হচ্ছে এমন কতকগুলি প্রক্রিয়ার সমষ্টি যে প্রক্রিয়াগুলো প্রয়োগ করলে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ ও মান বৃদ্ধির জন্য ভালবীজ ব্যবহার করা এবং ভাল বীজের ব্যবহার বৃদ্ধি করা অব্যাহত রাখা যায়। ভাল বীজ সম্পর্কে জ্ঞান বীজ প্রযুক্তির ভিত্তি। বীজের বিভিন্ন গুণ ও গুণাবলি সংরক্ষণ সম্পর্কিত জ্ঞান এবং ভাল বীজ ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য গৃহীত কার্যক্রম এসব নিয়ে বীজ প্রযুক্তি নির্মিত।

বীজ প্রযুক্তির কার্যাবলি: একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য সাধারণত ধাপে ধাপে এগুতে হয়। ফসল উৎপাদনে ভাল বীজ ব্যবহারের জন্যও এমনি ধাপে ধাপে কিছু কাজ করতে হয়।

গবেষণা জাত উন্নয়ন: জাত হচ্ছে বীজ প্রযুক্তি বাস্তবায়নের চাবি। সঠিক চাবি না থাকলে তালাবদ্ধ ঘরে প্রবেশ করা কষ্টসাধ্য। তেমনি একটি নির্দিষ্ট জাত না হলে বীজপ্রযুক্তির অন্য কাজগুলি বাস্তবায়ন শুরু করা যায় না। এজন্য দরকার জাত উন্নয়নের মাধ্যমে সঠিক জাত উদ্ভাবন এবং বাছাই করা। বাংলাদেশে জাতীয় গবেষণা সিস্টেমের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি পর্যায় হতে জাত গবেষণা ও উন্নয়ন করা হয়।

বীজ পরিবর্ধন: কাঙ্খিত জাতের সামান্য পরিমাণ বীজ প্রজননবিদ অতি যত্নের সাথে উৎপাদন করে। এ অল্প পরিমাণ বীজ চাষ করে পরিমাণে বৃদ্ধি করা হয়। এভাবে দু’তিন বছর ধরে পরিমাণ বৃদ্ধি করে তা কৃষকের নিকট ফসল ফলানোর জন্য বিতরণ বা বিক্রয় করা হয়।

বর্তমানে প্রজনন বীজকে ভিত্তি, প্রত্যায়িত ও মানঘোষিত এ চারটি শ্রেণিতে পরিবর্ধন করা হয়। মানঘোষিত শ্রেণির বীজ ছাড়া অন্য তিনটি শ্রেণির বীজকে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি মাঠমান এবং বীজমান যাচাই করে জাতীয় বীজবোর্ডের নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রত্যয়ন দিয়ে থাকে; প্রকৃতপক্ষে প্রত্যায়িত বীজই ভাল বীজ।

প্রক্রিয়াজাতকরণ: পরিবর্ধিত বীজের মধ্যে নানারকম খড়কুটো, অবীজ, চিটা, পোকা ইত্যাদি থাকতে পারে। তাই পরিবর্ধিত বীজ সরাসরি চাষে ব্যবহারের যোগ্য হয় না। তাছাড়া বীজ সংগ্রহের পর পরবর্তী ফসল চাষের মৌসুম পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হয়। বীজ পরিষ্কার করা, সংরক্ষণ করা, প্যাকিং করা ও শোধন করা এ কাজগুলি একত্রে বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ।

মান নিশ্চিতকরণ: বীজমান নিশ্চিত করতে না পারলে সে বীজ ভাল বীজ হয় না। তাই মান নিশ্চিতকরণ বীজ প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এজন্য বীজ ফসলের মাঠ পরিদর্শন এবং পরিবর্ধিত বীজ গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়।

এসব পরীক্ষার মাধ্যমে মান নিশ্চিত করা হয় এবং নিম্ন মানসম্পন্ন বীজ বিপণন করা হয় না। মান নিশ্চিতকরণের কাজ বীজ প্রযুক্তির অন্তর্গত কাজগুলোর সব কটিতে প্রয়োগ করতে হয়।

বীজের মান নিশ্চিত করণের জন্য বীজ ফসলের মাঠমান এবং বীজ সংরক্ষণাগারে বীজের বীজমান বজায় রাখতে হয়। মাঠমান বলতে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির কর্মকর্তা কর্তৃক পৃথকীকরণ দূরত্ব বীজ ফসলের রোগ পোকা-মাকড়ের উপস্থিতি, অন্য জাতের উপস্থিতি ইত্যাদি পরিদর্শন করা বোঝায় এবং বীজমান বলতে বীজের ন্যূনতম অংকুরোদগমক্ষমতা বীজের মধ্যে পানির সর্বোচ্চ পরিমাণ বীজের সজীবতা, বীজের বিশুদ্ধতা এবং জাতের বিশুদ্ধতা ইত্যাদি বুঝায়।

বীজ বিপণন: বীজ প্রযুক্তি সিঁড়ির শেষ ধাপ হচ্ছে বীজ বিপণন। বীজ বিপণনের মাধ্যমে কৃষক ভাল বীজের সরবরাহ পায় এবং ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষক তা ব্যবহার করে থাকে। বীজ বিপণন সুষ্ঠু না হলে ভালবীজ সঠিক সময়ে, সঠিক মোড়কে, সঠিক মূল্যে কৃষকের নিকট সরবরাহ সম্ভব হয় না।

অন্যান্য কার্যাবলি ফলপ্রসূ করতে বীজ বিপণন অপরিহার্য। বর্ণিত কার্যাবলি ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করতে হয়। জাত না পেলে যেমন অন্যান্য ধাপের প্রয়োগ সম্ভব নয় তেমনি সরাসরি বীজ বিপণন করা সম্ভব নয় তেমনি সরাসরি বীজ বিপণন করা সম্ভব নয় যদি ভাল বীজ পরিবর্ধন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ না করা যায়।

আবার মান নিশ্চিতকরণ ধাপ পালিত না হলে অন্যান্য ধাপ কোন কাজে আসে না। তাই কাজগুলো শুধু সম্পাদন করা নয় ধারাবাহিকভাবে করলে ফলপ্রসূ হয়।

বীজ ব্যবস্থাপনা: বাংলাদেশে বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের সর্ববৃহৎ সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)। এ সংস্থাটি ১৯৬২-৬৩ সালে প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে মাত্র ১৩ মে. টন বীজ সরবরাহের মাধ্যমে  বীজ কর্মসূচি শুরু করে। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ বেড়ে যায়।

তখন বীজের গুণগতমান রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এপ্রেক্ষিতে বীজের মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রত্যয়নের জন্য ১৯৭৪ সালে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে নার্সভুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হতে জাতীয় বীজবোর্ড কর্তৃক ছাড়কৃত জাতের প্রজনন শ্রেণির বীজ সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিএডিসি ও বেসরকারী উদ্যোক্তাদের সরবরাহ করা হয়। বিএডিসি ও বেসরকারি কোম্পানি/বীজ ডিলার ও এনজিও অনুমোদিত জাতের ভিত্তি, প্রত্যায়িত ও মানঘোষিত শ্রেণির বীজ উৎপাদন করে কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করে।

বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত মাঠমান ও বীজমান অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উৎপাদিত নিয়ন্ত্রিত ফসলের (ধান, গম, আলু, পাট, মেস্তা ও কেনাফ) বীজের মাঠ ও গুদাম পরিদর্শন করে প্রজনন, ভিত্তি ও প্রত্যায়িত শ্রেণির বীজের প্রত্যয়ন করে। মানঘোষিত শ্রেণির বীজ উৎপাদক নিজেই প্রত্যয়িত মানের প্রত্যয়ন দিয়ে থাকে।

এক্ষেত্রে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির প্রত্যয়নের প্রয়োজন হয় না। বর্তমানে আনুষ্ঠানিক বীজ ব্যবস্থাপনা হতে সকল ফসলের গড়ে ২৬%গুণগতমানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ করা হয়, উপআনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা হতে ৩৬% এবং অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ কৃষকের নিজস্ব উৎপাদিত বীজ গড়ে ৩৮%ব্যবহার করা হয়।

অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় এগিয়ে চলছে বাংলাদেশের কৃষি। এই দ্রুত ধাবমান কৃষি প্রযুক্তির যুগে বীজ প্রযুক্তিও কোনো ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই; সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের চাষিরা বেশী মাত্রায় গুণগতমানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশে গড়ে সকল ফসলের বীজ প্রতিস্থাপনের হার ২৬%। যেখানে শ্রীলংকা, পাকিস্তান, নেপাল ও ভারতে ২০% এর কম। বাংলাদেশের প্রায় ৭৫% আবাদি জমি ধান চাষের আওতাভুক্ত, স্বাভাবিকভাবেই ধান প্রধান ফসল হিসাবে এর জন্য বীজের প্রয়োজন ও বেশি লাগে।

তিন মৌসুমে ধান চাষ করা হয়। আউশ মৌসুমে প্রায় ৬০% মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করা হয়, আমনে ৩০% এবং বোরো মৌসুমে ১০০% মানসম্পন্ন বীজ চাষিরা ব্যবহার করে।

গম বাংলাদেশের দ্বিতীয় ফসল; এক্ষেত্রে ৫০% বীজ মানসম্পন্ন। ভুট্টার ক্ষেত্রে ৯৮% জমিতে আমদানীকৃত হাইব্রিড ভুট্টা বীজ ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও পাটের ক্ষেত্রে ৯৩% মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করা হয়।

আলু বীজের ক্ষেত্রে চাষিরা ১৩% মানসম্পন্ন প্রত্যায়িত বীজ ব্যবহার করে। সবজি বীজের ক্ষেত্রে ৮৫% জমিতে চাষিরা হাইব্রিড সবজি বীজ ব্যবহার করে।

সরকারের নানামুখী বাস্তব কর্মসূচির কারণে কৃষক পর্যায়ে ভাল বীজের ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে। ২০০৫-০৬ সালে সরকারিভাবে বিএডিসি’র মাধ্যমে যেখানে ৫৩,০০০ মে. টন বীজ সরবরাহ করা হয়, সেখানে ২০০৮-০৯ সালে ৮০,০০০ মে. টন বীজ বিএডিসি’র মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।

গত ২০১৮-১৯ মৌসুমে বিএডিসি সর্বমোট ১,৪০,০০০ মে. টন উচ্চফলনশীল বিভিন্ন ফসলের গুণগতমানসম্পন্ন বীজ চাষি পর্যায়ে সরবরাহ করে। অন্যদিকে বেসরকারি পর্যায় হতে ২০০৫-০৬ সালে ১৩,৫০০ মে. টন বীজ সরবরাহ করা হয়, ২০০৮-০৯ সালে বীজ সরবরাহ করা হয় ৬২,০০০ মে. টন; যা ২০১৮-১৯ সালে ১,২১,৭০০ মে. টনে উন্নীত হয়েছে।

এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ বীজ সরবরাহের পরিমাণ দ্বিগুণ হবে এবং বীজ প্রতিস্থাপনের হার ৫০% হলে উৎপাদনশীলতাও অনেক বেড়ে যাবে। অনেকের ধারণা বাংলাদেশের বীজ ব্যবস্থা আমদানি নির্ভর কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়।

কারণ আমরা আমাদের জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফসল-ধান, গম ও আলুর বীজ আমদানি করি না। আমরা পাট বীজ এবং ভুট্টা বীজ আমদানি করি, কারণ ফসল আমদানি করার চেয়ে বীজ আমদানি করা ভাল, কারণ বীজ উৎপাদন করতে হলে ফসলকে দীর্ঘদিন মাঠে রেখে দিতে হয়, ফলে ফসল উৎপাদনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।

এছাড়াও বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রচুর পরিমাণে হাইব্রিড ধান ও সবজি বীজ চুক্তিবদ্ধ চাষিরা উৎপাদন করছে। বাংলাদেশের ‍উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া সকল ফসলের বীজ উৎপাদনও সম্ভব নয়, সে কারণে কিছু ক্ষেত্রে হাইব্রিড সবজি বীজ, ভুট্টা বীজ ইত্যাদি আমদানি করা হয়।

আরও পড়ুন: কৃষকের ভালো মানের বীজ ব্যবহারের দিকে লক্ষ্য রাখার আহ্বান

আবার কোনো কোনো ফসলের বীজ রপ্তানিও করা হয়।  বাংলাদেশের বীজ ব্যবস্থা অনেক দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে।

বর্তমানে সরকার বেসরকারি সেক্টরকে সকল ফসলের বীজ গবেষণার সুযোগ দিয়ে বাস্তবসম্মত যুগোপযোগী “বীজ আইন, ২০১৮” প্রণয়ন করেছে।

‍উদ্ভিদের জাত সুরক্ষা ও জাতের অধিকার প্রদানের জন্য উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ আইন, ২০১৯ প্রণয়ন করেছে। বীজ আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য “উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন, ২০১১ ও বিধি, ২০১৮”প্রণয়ন করা হয়েছে।

এছাড়াও দেশে বিদেশে প্রতিযোগিতাসম্পন্ন একটি যুগোপযোগী বীজ নীতি, ২০১৯ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা অচিরেই গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিকট সংরক্ষিত জার্মপ্লাজমগুলো সংরক্ষণ  ও ডকুমেন্টেশনের জন্য ন্যাশনাল প্ল্যান্ট জেনেটিক রিসোর্স ইনস্টিটিউট আইন প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে।

আগামী কয়েক বছরে আইনগুলোর সফল বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের বীজ শিল্প এশিয়া মহাদেশের মধ্যে একটি স্থায়ী অবস্থান অর্জন করবে। বাংলাদেশের বীজশিল্প লেখাটি লিখেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রধান বীজ প্রযুক্তিবিদ কৃষিবিদ মো. আজিম উদ্দিন।

About এগ্রিকেয়ার২৪.কম

Check Also

প্লাস্টিকের চাল আর নকল ডিম! উভয়ই গুজব ও অপপ্রচার

কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: প্লাস্টিকের চাল এবং নকল ডিম নিয়ে  ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বত্ব © এগ্রিকেয়ার টোয়েন্টিফোর.কম (২০১৭-২০১৯)
সম্পাদক: কৃষিবিদ মো. হামিদুর রহমান। নির্বাহী সম্পাদক: মো. আবু খালিদ।
যোগাযোগ: ২৩/৬ আইওনিক প্রাইম, রোড ২, বনানী, ঢাকা ১২১৩।
Email: agricarenews@gmail.com, Mobile Number: 01831438457, 01717622842