ইলিশ ধরছেন জেলেরা। ছবি: সংগৃহীত।

নিজস্ব প্রতিবেদক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে নাজেহাল মানুষ। প্রাণঘাতী ভাইরাস রোধে গতবছর থেকে দফায় দফায় চলেছে লকডাউন। আমদানি রপ্তানিতে পড়েছে ভাটা। বাঙ্গালির ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখেও লকডাউন, তেমন নেই ইলিশের ব্যবহার। এরই মধ্যে সুখবর সারাবিশ্বে ইলিশ আহরণ ও উৎপাদনে শীর্ষে এখন বাংলাদেশ!

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন গত ১২ বছরে বেড়েছে। মাছের আকার ও ওজন বাড়ছে। সবমিলিয়ে দীর্ঘ ১ যুগে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৭৯ শতাংশ। সারাবিশ্বের ১১টি দেশের মধ্যে ১০টিতে ইলিশের উৎপাদন কমেছে। এদিকে আশ্চর্যজনকভাবে একমাত্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশেই প্রতি বছর বাড়ছে ইলিশ। মৎস্য বিভাগের বিভিন্ন কর্মসূচি ও জাটকা নিধন রোধে ব্যাপক তৎপরতাসহ বেশ কিছু উদ্যোগের কারণেই এমনটি হচ্ছে।

চলতি এপ্রিল মাসে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ইলিশ উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। হিসাবে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার টন। এ ছাড়া ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩ লাখ ১৩ হাজার, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩ লাখ ৪০ হাজার। এর ১০ বছরের মাথায় ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ টনের ওপরে ইলিশের উৎপাদন হবে বলে আশা করছে।

বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রথম; দ্বিতীয় স্থানে ভারত। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৮৬ শতাংশ বাংলাদেশের। পাঁচ বছর আগে আগে এ পরিমাণ ছিল ৬৫ শতাংশ। প্রতিবেশী ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে ইলিশের উৎপাদন কমেছে। পাঁচ বছর আগে ভারতে বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ ইলিশ উৎপাদিত হতো। তবে চলতি বছর তাদের উৎপাদন প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশে নেমেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা মিয়ানমারে উৎপাদন হয়েছে ৩ শতাংশের মতো। ইরান, ইরাক, কুয়েত ও পাকিস্তানে উৎপাদন হয়েছে বাকি ইলিশ। মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের তথ্যে এসব জানা যায়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ইলিশ। যা দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইলিশের অবদান ১ শতাংশ। প্রায় ৫ লাখ মানুষ ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তাদের সারাবছরের মোট আয়ও বেড়েছে।

ইকো ফিশ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে জেলেদের মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় ৮৪ হাজার ৬৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮১৮ টাকা হয়েছে। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ১৫ ভাগ।

মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ইলিশের উৎপাদন বাড়ার কারণ হিসেবে জানান, ইলিশ রক্ষায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও নৌবাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। ইলিশের প্রজনন মৌসুম ছাড়াও সারাবছরই বিভিন্ন সচেতনতামূলক ও জাটকা নিধন রোধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে কয়েকটি দপ্তর একাসাথে কাজ করে। ফলে জাটকা সংরক্ষণ ও মা ইলিশ রক্ষা পায়।

জাটকা নিধন রোধের কারণেই ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। ইলিশ মাছের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে বেশ কয়েক বছর ধরে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বছর নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত আট মাস জাটকা (২৫ সেন্টিমিটারের নিচে) ধরা নিষিদ্ধ। এর মধ্যে মার্চ-এপ্রিল দুই মাস জেলেদের ছয়টি অভয়াশ্রম এলাকায় নদীতে নামতে দেওয়া হয় না। এ ছাড়া বর্ষার শেষদিকে প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে। এ সময় সরকার তালিকাভুক্ত জেলেদের আর্থিক সহায়তা করা হয়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা ও জাটকাবিরোধী অভিযান বেশ কঠোর হওয়ায় আগামীতে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়াবে। গ্রামের অনেক মানুষ ইলিশের স্বাদ নিতে পারে না। তারা পর্যাপ্ত ইলিশ খাওয়ার সুযোগ পাওয়ার পর রপ্তানির কথা ভাবা যেতে পারে বলে মনে করি। পরিস্থিতি এখনকার মতো চললে আগামী দুই বছরের মধ্যে ইলিশের উৎপাদন সাত লাখ টনে পৌঁছবে বলে মনে করেন তিনি।

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও এ সম্পদের উন্নয়ন টেকসই করার লক্ষ্যে ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যস্থাপনা প্রকল্প’ মৎস্য অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে। মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষার্থে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে ২৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এছাড়াও জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন এবং উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় ‘সাসটেইন্যাবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রওনক মাহমুদ বলেন, সরকারের নানা উদ্যোগে ইলিশের উৎপাদন ঊর্ধ্বমুখী। সামনে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৬ লাখ টন হতে পারে বলে আশা করছি।

চাঁদপুরের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক মো. আনিছুর রহমান বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়ার পেছনে ২২ দিনের ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞাটি সবচেয়ে কার্যকরী। এখন প্রচুরসংখ্যক ইলিশ আসছে; আকারেও বেশ বড়।

উল্লেখ্য, ১৫ বছর আগে দেশের ২৪টি উপজেলায় বহমান নদীতে ইলিশের বিচরণ ছিল। এখন দেশের অন্তত ১২৫টি উপজেলায় বহমান নদীতে ইলিশের বিচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এগ্রিকেয়ার/এমএইচ