ডেস্ক প্রতিবেদন, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর থেকে বোরো ধান রোপণের আগ পর্যন্ত যে সময়টুকু জমি পতিত পড়ে থাকে, সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষ কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। এই অতিরিক্ত ফসল চাষের ফলে পতিত জমির ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমনি বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি কমছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, এ পদ্ধতি টেকসই ও লাভজনক শস্যক্রম গঠনে সহায়ক হতে পারে।

গত সোমবার কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার ৫ নম্বর কেওয়ার জোর ইউনিয়নের কুড়ারকান্দি এলাকায় আয়োজিত এক মাঠ দিবসে গবেষণার এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে প্রধান গবেষক হিসেবে বক্তব্য দেন কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মমিনুল ইসলাম। সহযোগী গবেষক ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. পারভেজ আনোয়ার।

কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসানের সভাপতিত্বে মাঠ দিবসে উপস্থিত ছিলেন গবেষণা ব্যবস্থার পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান, সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পরেশ কুমার সাহা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম খান অপু, অতিরিক্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব আলমসহ স্থানীয় কৃষকেরা।

জানা গেছে, ‘কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বিদ্যমান পতিত-বোরো-পতিত ফসল ক্রমে সরিষা প্রবর্তন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৩ সাল থেকে মিঠামইন উপজেলার হাওর এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে। গবেষণা ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

গবেষকেরা জানান, এ অঞ্চলে উচ্চফলনশীল বোরো ধান উৎপাদনের প্রধান বাধা আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি ও খরা।

বোরো ধান চাষে ঠান্ডাজনিত চাপও বড় সমস্যা। ডিসেম্বরের আগে ধান রোপণ করলে প্রজনন পর্যায়ে ঠান্ডার কারণে শীষে দানা বন্ধ্যা হয়ে যায়। আবার ডিসেম্বরের পরে রোপণ করলে ধান পাকার সময় আগাম আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে হাওর অঞ্চলে বোরো ধান উৎপাদন জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প ও নিরাপদ শস্যক্রম খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে হাওর অঞ্চলে সবচেয়ে প্রচলিত শস্যক্রম হলো পতিত-বোরো-পতিত, যা মোট আবাদি জমির প্রায় ৪০ শতাংশজুড়ে। এতে রবি মৌসুমে বিপুল জমি অনাবাদি থাকে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এবং বোরো ধান রোপণের আগের সময়ে স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষের মাধ্যমে একটি অতিরিক্ত ফসল অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এতে কৃষকেরা অন্তত একটি ফসল নিশ্চিতভাবে ঘরে তুলতে পারেন, এমনকি বোরো ধান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও।

গবেষণার প্রথম বছর (২০২৩–২০২৪) ছয়টি স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাত তিনটি বপন সময়ে (১০, ২০ ও ৩০ নভেম্বর) পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, ২০ নভেম্বর বপনে বিনা সরিষা-৯ সর্বোচ্চ ফলন দেয়। এর কাছাকাছি ফলন দেয় বারি সরিষা-১৭। সরিষার পরবর্তী ধান (ব্রি ধান-১০০) গড়ে প্রতি হেক্টরে ৬ দশমিক ২ টন ফলন দেয়, যা শস্যক্রমকে লাভজনক হিসেবে তুলে ধরে।

দ্বিতীয় বছর (২০২৪–২০২৫) নির্বাচিত দুটি জাত—বিনা সরিষা-৯ ও বারি সরিষা-১৭—বিভিন্ন সার ও বীজ হার ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা করা হয়। প্রস্তাবিত বীজ হার (৮ কেজি/হেক্টর) ও সার মাত্রা (১০০ শতাংশ) প্রয়োগে বিনা সরিষা-৯ থেকে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়। সরিষার পর হাইব্রিড বোরো ধান (সবুজ সাথী) গড়ে প্রতি হেক্টরে ৬ দশমিক ৪ টন ফলন দেয়। পুরো শস্যক্রমে ধান সমতুল্য ফলন দাঁড়ায় ১০ দশমিক ১ টন প্রতি হেক্টর। গবেষণার তৃতীয় বছর (২০২৫–২০২৬) বর্তমানে চলমান। গবেষকেরা আশা করছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে হাওর অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয় বাড়বে এবং জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

সরিষা চাষের প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে গবেষকেরা বলেন, প্রতি বছর একই সময়ে পানি না নামায় বপনের সময় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। হাওরের সব জমিতে সরিষা চাষ সম্ভব নয়; উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি তুলনামূলক উপযোগী। অক্টোবরের শেষদিকে বা নভেম্বরের শুরুতে অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি সরিষার বপন ও প্রাথমিক বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও স্বল্পমেয়াদি ও দ্রুত পরিপক্ব সরিষার জাত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী জমি থেকে সেচের পানি ঢুকে সরিষা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জমির ধরন ও ঝুঁকি বিবেচনায় কৃষকদের নিয়ে কমিউনিটি ফার্মিং চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরিষা-বোরো শস্যক্রম জনপ্রিয় করতে প্রণোদনা, মানসম্মত বীজ সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

গবেষণার অংশ হিসেবে বিনা সরিষা-৯ চাষ করা কৃষক হাসন রাজা বলেন, হাওরের কিছু উঁচু জমিতে আগে ভুট্টা চাষ করতেন, কিন্তু ক্ষতির মুখে পড়েন। এখন সরিষা চাষে লাভের আশা করছেন। তাঁর দেখাদেখি অনেকেই সরিষা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।

অতিরিক্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব আলম বলেন, হাওরের উন্নয়নে কৃষি বিভাগ আন্তরিক। কেউ ধানের পরিবর্তে সরিষা চাষ করতে চাইলে বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়া হবে। সরিষা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং উৎপাদন বাড়লে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।

গবেষণা ব্যবস্থার পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান বলেন, গত ১৫ বছরে হাওরের কৃষিতে পরিবর্তন এসেছে। আগে শুধু ধান চাষ হলেও এখন ভুট্টা ও সরিষাও হচ্ছে। জমির বহুমুখী ব্যবহার বাড়ালে উৎপাদনও বাড়বে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ গবেষণার মাধ্যমে হাওরের সরিষা চাষ সারা দেশে বিস্তার লাভ করবে।