ইউসুফ আলী সুমন, মহাদেবপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি: মরুকরণের পথে বরেন্দ্র অঞ্চল। দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে ভূ-গর্ভের পানি। সরকারি একটি সংস্থার জরিপে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। তীব্র পানি সংকটে দেশের খাদ্যভান্ডারে থেমে যেতে পারে জীবন-জীবিকা। বাস্তবায়িত অপরিকল্পিত প্রকল্পের সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ করেন বিশেষজ্ঞরা। এটিকে সরকারি অর্থ লোপাট ও অপচয়ের অভিনব কৌশল হিসেবেই দেখছেন তারা।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর তথ্য মতে, এ অঞ্চলে গড় বৃষ্টিপাত প্রায় এক হাজার ১০০ মিলিমিটার। ১০ বছর আগে রাজশাহীতে বছরে গড় বৃষ্টি হতো এক হাজার ৫০০ মিলিমিটার। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমার পাশাপাশি কৃষিতে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বছরে এখানে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে প্রায় পৌনে এক ফুট।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহীর তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল ও নওগাঁর সাপাহার, পোরশা উপজেলার ১২৫টি ইউনিয়নের ৫০টি জায়গায় জরিপ চালিয়েছে। তানোর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ মূল্যায়ন খসড়া প্রতিবেদন উপস্থাপন করে সংস্থাটি।

পড়তে পারেন: রাজশাহীতে আড়াই কোটি টাকার পাতকুয়া কাজে আসছে না কৃষকের

তারা জানায়, তানোরের সব ইউনিয়নেই পানির স্তর অনেক নিচে। তার মধ্যে বাধাইড় ইউনিয়নের উচ্চাডাঙ্গা গ্রামের পানির অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। উচ্চাডাঙ্গা গ্রামের ১২০ থেকে ১২৬ ফিট পর্যন্ত বোরিং করে পানি পাওয়া গেছে কিন্তু সেখানে পানির সঙ্গে চিকন ও মিহি বালু রয়েছে। তারপর ১ হাজার ৪৬০ ফুট পর্যন্ত পানির কোনো জলাধার (অ্যাকুইফার) পাওয়া যায়নি। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ১৯৮৫-১৯৮৬ সাল থেকে গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলে সেচ কাজ চালাচ্ছে। রাজশাহী বিভাগে তাদের আট হাজার ৮২৬টি নলকূপ চালু রয়েছে। প্রতিবছর যে পরিমাণ নিচে নেমে যাচ্ছে, তা আর পুনর্ভরণ হচ্ছে না।

নওগাঁর পোরশা উপজেলার উপর শিশা মৌজার আব্দুল লতিফসহ বিএমডিএ’র ৫০-৬০টি গভীর নলকূপ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানান, আগের মতো এখন পানি ওঠে না, স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। সেচ খরচ বাড়ছে। পানির সাথে নুড়িপাথর, আর্সেনিকসহ বিভিন্ন ধাতব পদার্থ ওঠছে বলে অভিযোগ করেন তারা। এতে কৃষি জমির ঊর্বরা শক্তি নষ্ট হচ্ছে ও ফসল উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা। ভূ-গর্ভস্থ উৎস থেকে প্রতিদিন ৯৫ হাজার ঘনমিটার পানি তুলছে রাজশাহী ওয়সা। এতে অতিমাত্রার ধাতব পদার্থসহ ডায়রিয়ার জীবাণু ফেকাল কোলিফর্ম ব্যাকটোরিয়া রয়েছে বলে দাবি অভিজ্ঞ মহলের।

পড়তে পারেন: মহাদেবপুরে কোটি টাকার সেচ প্রকল্পে সুফল পাচ্ছে না কৃষক

রাজশাহী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: রোকনুজ্জামান জানান, হেভি মেটাল পাওয়া গেলেও ভূ-গর্ভস্থ পানি ছাড়া রাজশাহীতে বিকল্প কোনো পানির উৎস নেই। এদিকে, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ব্যারেজের কারণে শুকিয়ে যাচ্ছে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম নদ-নদী ও তার শাখা-প্রশাখা।

ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ, সেচ কাজে ব্যবহার ও ভূ-গর্ভস্থ পানির রিচার্জ বৃদ্ধিতে “বরেন্দ্র এলাকায় পাতকুয়া খননের মাধ্যমে স্বল্প সেচের ফসল উৎপাদন” প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪৫০টি সৌরচালিত পাতকুয়া স্থাপন করেছে বিএমডিএ। এতে ব্যায় হয়েছে ৫ হাজার ৩৪৮ দশমিক ৩৮ লাখ টাকা। ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে শুরু হয়ে প্রকল্পটি শেষ হয় ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে। অপরিকল্পিত এ প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিশেষজ্ঞরা। প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে দৈনিক যায়যায়দিনসহ গণমাধ্যমে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য ওঠে আসে।

পড়তে পারেন: চাঁদপুরে প্রকল্পে অনিয়ম, বঞ্চিত কৃষকরা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ও কৃষিবিদরা জানান, পাতকুয়াগুলো কৃষক ও সাধারণ মানুষের তেমন কোনোই কাজে আসছে না। এর গভীরতার চেয়ে জলাধার অনেক নিচে। যে অল্প যায়গায় ফানেল আকৃতিতে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে তা থেকে খুবই কম বৃষ্টির পানি আহরণ করা যায়।

উত্তরাঞ্চলের প্রকৃতিতে শীত মৌসুমে যে তাপমাত্রা বিরাজ করে তা থেকে সৌরচালিত সোলার প্যানেল দিয়ে সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন অযৌক্তিক ও বিজ্ঞান সম্মত নয় বলে দাবি করেন তারা। পাতকুয়ার (ডাগওয়েল) বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক মো. নাজিরুল ইসলামের সাথে মুুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদকের ফোন রিসিভ করেননি। বর্তমানে তিনি বরেন্দ্র বহুমূখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বে রয়েছেন।

পড়তে পারেন: ধানের জমিতে পানি না পেয়ে কৃষকের আত্মহত্যা

গভীর নলকূপের পানির সাথে হেভি মেটালসহ আর্সেনিক ওঠে কৃষি জমির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বিএমডিএ’র নির্র্বাহী পরিচালক মো. আব্দুর রশীদ জানান, নতুন করে আর কোনো নলকূপ বাসানো হচ্ছে না। প্রি-পেইড সিস্টিমের কারণে কৃষকরা সেচ কাজে এখন অতিরিক্ত পনি ব্যবহার করেন না। নিয়মিত তারা ল্যাবে পানি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আর্সেনিক এর অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। পাতকুয়া প্রকল্পের কার্যকারিতা ও অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে অস্বীকার করেন তিনি।

এই কর্মকর্তা জানান, কৃষকরা বিনামূল্যে সেচ সুবিধা পাচ্ছেন। লক্ষ্যমাত্রার অধিক জমিতে সেচ দেয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। ‘বিএমডিএ এর হাত ধরে মরুকরণের পথে উত্তরাঞ্চল’ প্রশ্নের উত্তরে আব্দুর রশীদ বলেন, এটি সঠিক নয়। এক সময়ের ঠাঁ ঠাঁ বরেন্দ্র এলাকা এখন ফসলে ভরে ওঠেছে।

পড়তে পারেন: নতুন ফসল চিয়ার কেজি ৫’শ টাকা, ভাগ্য বদলাচ্ছে কৃষকের!

জানতে চাইলে পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) মহাপরিচালক মোঃ দেলওয়ার হোসেন মুঠোফোনে জানান, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলায় তাদের একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মেয়াদ শেষে ২০২৩ সালের জুন মাসে বোঝা যাবে ভূ-গর্ভ কি অবস্থায় আছে।

পানির স্তর (লেভেল) নিয়ে মৌজাভিত্তিক নকশা প্রণয়ন করবে সংস্থাটি। এরপর ওয়ারপো পানি আইনের ১৯ ধারা মতে নিরাপদ আহরণ সিমা নির্ধারণ করবে বলেও জানান তিনি। ভূ-গর্ভস্থ পানির সুষ্ঠু ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এ অঞ্চলের লাখো কৃষক ও সাধারণ মানুষ।

এগ্রিকেয়ার/এমএইচ