মেহেদী হাসান, রাজশাহী: রাজশাহীতে মাস খানেক আগেও পাইকারিতে লাল ডিম বিক্রি হয়েছে ৭ টাকা; সাদা ডিম ৬ টাকা। এ দামে খামারিদের কিছুটা লাভ হতো। বর্তমানে রমজানে ডিমের চাহিদা তলানিতে। ফলে ডিমে অস্বাভাবিক দরপতন হয়েছে। প্রতিপিস লাল ডিম পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৬ টাকা ৮০ পয়সা এবং সাদা ডিম ৫ টাকা ৮০ পয়সা। এতে ডিম উৎপাদনকারী পোল্ট্রি খামারিরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।

খামারিদের দাবি, খাদ্য ও মেডিসিনের দাম বাড়তে থাকায় মুরগি হয়ে উঠেছে গলার কাঁটা। বর্তমান বাজারদরে উঠছেনা ডিমের উৎপাদন খরচ। জেলার বিভিন্ন উপজেলার খামারিরা খামার বিক্রি করার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন আবার কেউ লাখ লাখ টাকা লোকসানে খামার বন্ধ ঘোষণা করছেন ইতোমধ্যে।

নতুনভাবে ডিম উৎপাদনে আসা খামারিরা একেবারে ভেঙে পড়েছেন। গত দেড় বছর রাজশাহীতে ৬০ ভাগ ডিম উৎপাদনকারী খামার বন্ধ ছিল। এতে কয়েকশ কোটি টাকার বিনিয়োগ হারিয়েছেন খামারিরা। এছাড়া গত শীতে ৫০ শতাংশ মুরগি মারা গেছে বলে জানিয়েছে পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন। তবে, খামার বৃদ্ধি না হলেও চাহিদা কমে যাওয়া ডিমের দরপতনের মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছেন পোল্ট্রি রক্ষা পরিষদ।

পড়তে পারেন: সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পোল্ট্রি শিল্প

পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের রাজশাহী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক জানান, সিন্ডিকেটের কবলে পোল্ট্রি খাত ধ্বংশের পথে। বাজারে প্রতিপিস ডিম ৮ টাকা বিক্রি করছেন খুচরা বিক্রেতারা। আর খামারিদের দাম দিচ্ছেন ৭ টাকারও কম। হাতবদলে ৬ টাকার ডিম ৯ টাকা। একদিকে করোনা অন্যদিকে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে খামারিরা সর্বস্বান্ত। প্রতিডিস ডিমে সাড়ে ৬ টাকা উৎপাদন খরচ। আর বিক্রি হচ্ছে ৬ টাকা ৭০ পয়সায়। সাদা ডিমের দাম আরোও কম।

চার মাস আগেও রাজশাহীতে মুরগির ডিম উৎপাদনকারী লেয়ার মুরগির খামার ছিল দুই হাজার। এসব খামারে মুরগির সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লাখ। গত ডিসেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে মুরগির ডিমের দামে উঠানামা চলছে। এখন ডিমপ্রতি এক থেকে দেড় টাকা দাম কমেছে। তার ওপর নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে মুরগি। ফলে ইতোমধ্যে অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে ।

পড়তে পারেন: ডিম-মুরগির দাম নির্ধারণ করে কারা, কেন ধরা খায় খামারিরা?

রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা গ্রামের লেয়ার খামারি আলম বলেন, ভাই পোল্ট্রি ব্যবসা সিন্ডিকেটের ব্যবসা। আমরা খামারিরা কারো কাছে নালিশ দিতে পারিনা। যাব কার কাছে। লকডউনের দু-মাসেই ৬০ হাজার টাকা নাই হয়ে গেছে। আমার ২ হাজার লেয়ার খামারে যা ঔষুধ লাগে, খাদ্য লাগে তাতে লাভ তো দুরের কথা বাড়ি ভিটে বেঁচে দিয়ে চলে যেতে হবে। ইজ্জত নিয়ে টিকে থাকা যাবে না ভাই। মিডিয়ার কোন তৎপরতা নাই। আমারদের কষ্টের কথা তুলে ধরে না।

একই এলাকার লেয়ার খামারি সুজাত বলেন, ডিমের মুরগিতে কোন ব্যবসা করতে পারলাম না। ডিমের দাম নেই আর অন্যদিকে তিন দফায় বাড়লো খাদ্যের দাম। ৬ টাকা থেকে সাড়ে ৬ টাকার মধ্যে ডিমের দাম উঠনামা করছে। এ দামে তো আর টিকে থাকা যায় না। সাদা ডিম সর্বনিম্নে ৭ টাকা আর লাল ডিম সাড়ে ৭ টাকা হলে কোনমতে লোকসান না দিয়ে চলবে।

পড়তে পারেন: সোনালী মুরগির কেজি ২৮০, ব্রয়লার ১৬০ টাকা

জেলার পবা উপজেলার হরিয়ান ইউপির মল্লিকপুর গ্রামের লেয়ার মুরগির বড় খামারি রেজাউল করিম জানান, মাস ছয়েকের মধ্যে রানীখেত এবং সালমোনেলাতে আক্রান্ত হয়ে চার হাজার মুরগি মরে গেছে। আমার মুরগি ছিল ১৩ হাজার। কিছু মুরগি বিক্রি করেছি। এখন খামারে মাত্র দেড় হাজার মুরগি রয়েছে। এসব রোগ হলে মুরগির খাওয়া কমে যায়, পাতলা পায়খানা হয় এবং ডিম পাড়া বন্ধ করে দেয়। একপর্যায়ে ওজন কমে মুরগি মারা যায়।

তিনি বলেন, খামার তৈরি খরচ বাদ দিয়ে বাচ্চা থেকে ডিমপাড়া পর্যন্ত এক হাজার মুরগির জন্য ব্যয় হয় ৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু খাবারই লাগে চার লাখ টাকা। এছাড়া রয়েছে ওষুধ, শ্রমিক এবং বিদ্যুৎ বিলসহ আনুষঙ্গিক খরচ। বর্তমানে সাদা ডিম আমরা আড়তদারদের কাছে সাড়ে ৫ থেকে ৫ টাকা ৮০ পয়সায় বিক্রি করছি। আর লাল ডিমের দাম সাড়ে ৬ থেকে ৬ টাকা ৮০ পয়সা। প্রতিটি সাদা ডিমে সাড়ে পাঁচ টাকা এবং লাল ডিমে সাড়ে ছয় টাকা উৎপাদন ব্যয় হয়। ফলে প্রতিটি সাদা এবং লাল ডিমে আমাদের কতটাকা লাভ হচ্ছে হিসেব মিলিয়ে নেন। ইতোমধ্যে আমার প্রায় ২০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বর্তমানে যে অবস্থা, তাতে অচিরেই খামার বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছি।

মহানগরীর মাস্টারপাড়া এলাকার বড় ডিম ব্যবসায়ী রেজাউল করিম মিঠু জানান, একশ লাল ডিম সাড়ে সাতশ এবং সাদা ডিম সাড়ে ছয়শ টাকা করে বিক্রি করছেন। এক মাস আগেও একশ লাল এবং সাদা ডিমের দাম একশ থেকে ১৩০ টাকা বেশি ছিল। তবে দোকানে খুচরা ব্যবসায়ীরা হালি প্রতি লাল ডিম ২৮ থেকে ৩০ টাকা এবং সাদা ডিম ২৬-২৭ টাকা দামে বিক্রি করছেন।

এগ্রিকেয়ার/এমএইচ