
মেহেদী হাসান, রাজশাহী এগ্রিকেয়ার২৪.কম: ‘আঠার-বিশ বছর পদ্মায় মাছ ধরি। এর আগে জমি-জিরাত ছিল। আবাদ-ফসল করতাম। পদ্মায় সব ভাইসা নিয়া গেছে, এখন দিন চলে না। বছরের প্রায় পুরো সময়ে মাছ ধরি। এবারে একদম মাছ পাইনি।’
শরীর রোদে পুড়ে চকচকে কালো হয়ে গেছে। হাত পায়ের আঙ্গুলগুলো বাঁকা হতে শুরু করেছে অনেকটাই। চুল-দাড়ি যেন শুকনো সাদা পাটের গুচ্ছ। হাঁটতে পারেন না ঠিকমতো, দাঁড়াতেই পা টলে। বয়স তো আর কম হলো না ৬০ পেরিয়েছে গত শীতে। বলছিলাম রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর এলাকার বাসিন্দা আবু তাহেরের কথা।
দু-দশক আগে ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দায়িত্বের বোঝা নামিয়েছেন। বাড়ি জুড়ে বুড়ো-বুড়ির বাস। একবেলা না খেয়ে থাকলেও খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। করোনা মহামারিতে নাজেহাল তাহের। মাঝেমধ্যে দু-একদিন অপরের কামলা দিলেও বয়সের ভারে ভারী কাজ করতে পারেন না। তাই এখন আর কেউ কাজে ডাকে না।
জীবনের সাথে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বৃদ্ধ বয়সে মাছ ধরতে নেমেছেন পদ্মায় । পুঁটি, ভেটকি, মলা, বেলে, চিংড়ি, আইড়সহ নানা ধরনের ছোট মাছ ধরেন ‘দোহাড়’ দিয়ে। বাঁশের কঞ্চি আর সুতি জালের সমন্নয়ে তৈরি দোহাড়। সম্মুখভাগ ফাঁপা বড় এবং পর্যায়ক্রমে ছোট ছোট তিন প্রকোষ্টে বিভক্ত। জালের চিকন গোল সুড়ঙ্গ দিয়ে শেষ প্রান্তে গিয়ে জমা হয় মাছ।
এবছর বন্যার মৌসুমে ২৩ টি দোহাড় তৈরি করেছেন নিজ হাতে। বাজার থেকে কিনে নিয়ে আসেন জাল, সুতা, বাঁশ। এরপর বাড়িতে বসে দোহাড় তৈরি করেন তাহের। এসব কাজে সাহায্য করেন তাঁর স্ত্রী। প্রতিটি দোহাড় বাজারে কিনতে লাগে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। নিজ হাতে মাছ ধরার এ উপকরণ তৈরি করায় প্রায় ২০০ টাকার মতো খরচ হয় তাঁর।
চলতি বছরে তাহের মাছ তেমন পাননি। আগের বছরগুলোতে ৬ মাসে আয় করতেন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এবার তিন-চার মাস পেরিয়ে গেলেও দেখা মেলেনি মাছের। আগে দিনে ৫০০ টাকার বেশি আয় হলেও এখন দিনে একশ-দেড়শ টাকার মতো পান। এবার দোহাড়ে মাছ ধরা পড়ছে না। মাছগুলো যেন চালাক হয়ে গেছে পদ্মার ঘোলা পানিতে।
করোনাকালে সরকারি সহযোগিতা পাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তাহের বলেন, ‘ চাল-ডাল দিয়েছিল সিটি করপোরেশন থেকে। খুব বিপদে পড়েছিলাম। যাই-দিক তা কাজে লেগেছে।’
তিনি বলেন, ‘আঠার-বিশ বছর পদ্মায় মাছ ধরি। এর আগে জমি-জিরাত ছিল। আবাদ-ফসল করতাম। পদ্মায় সব ভাইসা নিয়া গেছে, এখন দিন চলে না। বছরের প্রায় পুরো সময়ে মাছ ধরি। কয়েকদিন মাছ পাইনা। ছয় মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা আয় হতো। সেই টাকা দিয়ে বছরের অন্য সময়ে দুটো মানুষ খেয়ে পরে দিব্যি চলে যেতো। এবার মনে হয় তা আর হবে না। অন্য বছরে এসময় অনেক মাছ ধরা পড়ত। দিনে পাঁচশ ছয়’শ টাকা ইনকাম হতো। এবার এক-দেড়শ টাকার মতো হয়’
পদ্মার ছুটে চলা স্রোতের দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, আমার জমি ছিল চরে। আবাদ ফসল করতাম। সব ভেঙ্গে চলে গেছে। এখন মাছ ধরা ছাড়া কোনো উপায় নাই। জীবন চালাতে হবে, বাঁচতে হবে। আর ছেলে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি আর চিন্তা নাই। এভাবেই একদিন চলে যাব।
নগরীর ৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মতিউর রহমান এগ্রিকেয়ার২৪.কম কে জানান, শ্রীরামপুর এলাকায় শতাধিক জেলের বাস। যাদের জীবন মাছ ধরার আয় থেকেই চলে। শতাধিক জেলের মধ্যে মৎস্য অধিদপ্তরের তালিকায় নাম আছে মাত্র ৩৮ জনের। আমি বলব, যদি সবগুলো জেলেকে এ তালিকায় আনা হয় তাহলে তাদের উপকার হয়।
করোনাকালে জেলেদের জন্য নির্ধারিত কোন সাহায্য সহযোগিতা আসেনি। সাধারনের মতো জেলেদেরও ১০ কেজি চাল, ডাল, তেলসহ বিভিন্ন সাহায্য- সহযোগিতা করা হয়েছে।
এগ্রিকেয়ার/এমএইচ
























