
রবিউল আউয়াল রবি, ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহ জেলায় উঠতি বোরোধানে ব্লাস্ট রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে গৌরীপুরে ও হালুয়াঘাটে এই রোগের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ। এতে কৃষকের মাথায় হাত পড়েছে; ফলনও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এ রোগের আক্রমণে বোরোধানের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। গৌরীপুর উপজেলার অচিন্তপুর ইউনিয়নের লংকাখোলা গ্রামে ব্লাস্ট রোগে উঠতি বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পূর্ব সচেতনতা না থাকায় ও ঠান্ডা-গরম আবহাওয়ার কারণে এই রোগ আক্রান্ত ক্ষেত থেকে পাশের ক্ষেতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
সময় মতো কীটনাশক-ঔষধ প্রয়োগ করলে ব্লাস্ট রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল। ব্লাস্ট রোগের কারণে ব্রি-২৮ ধানের ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি। দূর থেকে মাঠের দিকে তাকালে মনে হবে ধানগুলো পেকে আছে। কিন্তু সামনে গেলেই দেখা যায় ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত ধানের ভেতর চাল হওয়ার পরপরই এগুলো হলুদ রঙ ধারণ করেছে। থোরার ভেতরে কোন দানা নেই, শুধুই চিটা।
পড়তে পারেন: ধানের ৩ ধরণের ব্লাস্ট রোগের সমাধান
ব্লাস্ট রোগ সম্পর্কে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছে, ব্লাস্ট রোগ (Blast) একটি মারাত্মক রোগ। এ রোগ বীজতলায় চারা গাছকেও ধ্বংস করে দিতে পারে। আবার রোপণের পর ধান গাছ এ রোগে আক্রান্ত হলে ফলন ব্যাপকভাবে কমে যায়। আক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করলে সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। ধান গাছের সাধারণত ৩টি অংশে ব্লাস্ট রোগ আক্রমণ করে থাকে।
ধান গাছের তিনটি অংশে মূলত ব্লাস্ট রোগ আক্রান্ত করে থাকে পাতায় ,গিঁটে এবং ৩. নেক বা শীষে। পাইরিকুলারিয়া গ্রিসিয়া (Pyricularia grisea) বা ম্যাগনাপোর্থে অরাইজা (Magnaporthe oryzae) নামক ছত্রাকের আক্রমণে ব্লাস্ট রোগ হয়। এ রোগটি আমন ও বোরো উভয় মৌসুমেই হতে পারে। ধানের চারা অবস্থা থেকে ধান পাকার আগ পর্যন্ত যে কোনো সময় ব্লাস্ট রোগ হতে পারে। তবে ধান গাছের বয়স যতো বাড়ে লিফ ব্লাস্ট বা পাতা ব্লাস্ট রোগের সম্ভাবনা ততো কমে।
বীজ, বাতাস, কীটপতঙ্গ ও আবহাওয়ার মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। ঘন ঘন এবং দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত এবং দিনের বেলা ঠান্ডা পড়লে এ রোগের আক্রমণ বাড়ে।
পড়তে পারেন: গমের ব্লাস্ট রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার
এছাড়া দিন ও রাতের তাপমাত্রার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য যেমন, রাতে ঠান্ডা, দিনে গরম ও সকালে পাতায় পাতলা শিশির জমলে ব্লাস্ট রোগ দ্রুত ছড়ায়। মূলত রাত ও দিনের তাপমাত্রার পার্থক্য খুব বেশি হলেই পাতায় শিশির জমে। মাটিতে রস কম থাকলেও ব্লাস্ট হতে পারে। এ কারণে হালকা পলি মাটি বা বেলেমাটির পানি ধারণক্ষমতা কম হওয়ায় এমন জমির ধানে ব্লাস্ট রোগ বেশি হতে দেখা যায়।
জমিতে মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া সার এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম পটাশ সার দিলেও এ রোগের আক্রমণ বেশি হয়। দীর্ঘদিন জমি শুকনা অবস্থায় থাকলেও এ রোগের আক্রমণ হতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার অনেক স্থানে আগাম রোপন করা বোরো ধান পাঁকতে শুরু করেছে। অনেক স্থানে থোর থেকে শীষ বের হয়েছে। ব্লাস্ট রোগের কারণে এখন কচি শীষের ফুল পড়ে গেছে ও ধানের ভিতরের দুধ শুকিয়ে সাদা হয়ে ধানের শীষ পেকে যাচ্ছে।
গৌরীপুরের লংকাখোলা গ্রামের কৃষক আব্দুল বারেক বলেন, ৫০ শতক জমিতে ব্রি (ধান ২৮) লাগিয়েছিলাম কিন্তু ব্লাস্ট রোগের হানায় আমার সব ধান শেষ। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি।
ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ নিয়ে কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ৭০ শতক জমিতে বোরোধান চাষ করে নিয়মিত ঔষধ স্পে করেও ধান বাঁচাতে পারলাম না।
পড়তে পারেন: ধানে ব্লাস্ট রোগ আক্রমণ করলে যা করতে হবে
গৌরীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লুৎফুন্নাহার জানান, আবহাওয়া অনুকুলে না থাকায় উপজেলার সকল ইউনিয়নেই ব্রি ২৮ ধানের ব্লাস্ট রোগে কমবেশী ক্ষতি হয়েছে, যে কৃষক সাথে সাথে ঔষধ দিয়েছে তাদের ফসলের ক্ষতি হয়নি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবছর গৌরীপুর উপজেলায় চলতি মৌসুমে ২০ হাজার চারশ পয়ত্রিশ হেক্টর জমিতে বোরোধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ হেক্টর জমিতে ব্লাস্ট রোগ হানা দিয়েছে।
অপরদিকে হালুয়াঘাট উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার মধ্যে ধারা, আমতৈল, বিলডোরা, নড়াইল ইউনিয়নে ব্রি-২৮ জাতের ধান চাষ করে ব্লাস্ট রোগের কারণে লোকসানে পড়েছেন প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা। তারা বলছেন, আগাম ফসল উঠে যায় এই কারণে ব্রি-২৮ জাত বেশ জনপ্রিয়। এবারো ফলনের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছিল এই জাতের ধান। আগামী দু-এক সপ্তাহের মধ্যেই উপজেলার অধিকাংশ এলাকার পাকা বোরো ধান মাড়াইয়ের পর্যায়ে চলে যাবে। শেষ পর্যায়ে এসে আঘাত হানল ছত্রাক জনিত ব্লাস্ট রোগ।
স্থানীয় কৃষক মোফাজ্জল হোসেনসহ একাধিক কৃষক জানান, ধানের শীষে কোন ধান নেই। আছে চিটা। ধান কেটে গরু-মহিষের খাবার খড় ছাড়া আর কিছুই করা যাবে না। হঠাৎ এমন ক্ষতিতে কোন ভাবেই হিসাব মেলাতে পারছিনা। এবার হয়তো ফসল ঘরে তুলতে পারবো না। ফসল কাটার উপযুক্ত সময়ে এসে ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হয়ে এখন অনেক কৃষক দিশেহারা। পরিচর্যা করেও কোন লাভ হয়নি।
অন্যদিকে কৃষি অফিস বলছে, ধানে ব্লাস্ট রোগের যে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে তা পরিমাণে খুব কম। এতে উৎপাদনে তেমন একটা প্রভাব পড়বে না। চাষে নিরুৎসাহিত করার পরও যেসব কৃষক ব্রি-২৮ অননুমোদিত জাতের ধান চাষ করেছেন সেই ক্ষেতগুলোতেই কেবল ব্লাস্ট রোগ আক্রমণ করেছে।
হালুয়াঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান বলেন, নিয়ম মতো ওষুধ স্প্রে করলে ব্লাস্ট রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু কৃষকরা কোনো পরামর্শ বা যোগাযোগ রাখেন না। এতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আমরা কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের এ জাতের ধান রোপণ করতে নিষেধ করি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবছর হালুয়াঘাট উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ২২ হাজার ৮’শত হেক্টর জমিতে। এসব জমিতে কৃষকরা উচ্চ ফলনশীল ব্রি-৩৬, ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, ব্রি-৭৪, ব্রি-৮১, গুটি স্বর্ণা ও স্থানীয় জাতের ধান আবাদ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) শোয়েব আহমেদ জানান, ব্লাস্ট একটি পুরাতন রোগ। জেলার প্রায় ৪৮ হেক্টর জমির বোরোধানে এই রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা বোরোধান লাগানোর শুরু থেকেই সব উপজেলায় সচেতন করার চেষ্টা করেছি। এখনো এই ছত্রাক দমনে কাজ চলছে।
এগ্রিকেয়ার/এমএইচ
























