পাঙ্গাশ মাছের গন্ধের কারণ

পাঙ্গাশ মাছের গন্ধের কারণ ও তা দূর করার কৌশল নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন মো. আব্দুস ছালাম প্রাং, সহকারী পরিচালক, মৎস্য প্রশিক্ষণ একাডেমি। এখন পর্যন্ত গন্ধের তখমা পাঙ্গাশ মাছে বিরাজমান আছে। এটি পাঙ্গাশ মাছের নিজ বৈশিষ্ট্যগুণে বটে, তবে পুরোপুরি নয়। এটি প্রধানত চাষ ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণেই ঘটে।

সামগ্রিকভাবে চাষের মাধ্যমে উৎপাদিত মাছের প্রতি মানুষের বিভ্রান্তিমূলক ধারণা আছে, চাষের মাছ স্বাদে কম। এ ধারণা ঠিক না। স্বাদ বিষয়ে পরে, আজ গন্ধ নিয়ে লিখি। পাঙ্গাশ মাছ চাষ করা হয় আধা-নিবিড় অথবা নিবিড় চাষ পদ্ধতিতে।

বিষয়টিকে সহজ করে বললে, অধিক ঘনত্বে, অধিক খাদ্য প্রয়োগ করে , অধিক উৎপাদন এবং অধিক লাভ করার উদ্দ্যশ্যে, সাধারণত পাঙ্গাশ মাছের চাষ পদ্ধতি সাজানো হয়। এটিই পাঙ্গাসের আধা নিবিড় বা নিবিড় চাষ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে তেলাপিয়াসহ অন্যান্য মাছও চাষ করা হচ্ছে।

আধা নিবিড় অথবা নিবিড় চাষ ব্যবস্থাপনায় সঠিক পরিকল্পনা বা চাষ ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে মাছ চাষের পুকুর বা জলাশয়ে ব্লু-গ্রীণ অ্যালজি ও এক্টিনোমাইসিটিস জন্মে।

এরা পুকুরের পানিতে জিওসমিন (C12H22O) নির্গত করে (Gerber and lechevalier, 1965 ; Medser et al, 1968 ; Safferman et al,1967) এবং ২- মিথাইল-আইসো-বরনিয়ল (MIB) (C11H20O) নিসৃত করে (Rosen et al. , 1970)।

জিওসমিনের গাঠনিক সংকেত ( C12H22O)। ২- মিথাইল -আইসো-বরনিয়ল (MIB) এর গাঠনিক সংকেত C11H22O । জিওসমিন ও MIB এর গাঠনিক সংকেত প্রায় একই রকমের। জিওসমিন ও MIB এর আঁশটে ও মেটে ( Earthy-Muddy odor) গন্ধ আছে।

পুকুর বা জলাশয়ে চাষের সময় বিশেষ করে কার্প ও ক্যাটফিস জাতীয় মাছের শরীরে, এই জিওসমিন ও MIB প্রবেশ করে। ফলে এই মাছ রান্না করে খাওয়ার সময় গন্ধ করে।

মানুষ, এই জিওসমিন ও MIB এর গন্ধের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ দুটি উপাদান, মাছের শরীরে, এমন কি পানিতে, অতি স্বল্প পরিমাণে উপস্থিত থাকলে, তা মানুষের নাকে ধরা পরে।

যে সকল মাছের গন্ধ হয়: ১) জিওসমিনের কারণে কার্প ও ক্যাট ফিশ জাতীয় মাছের গন্ধ হয়। ২) পাঙ্গাশ মাছের ত্বক তৈলাক্ত, শরীরে ডার্ক মাসল (dark muscle) আছে।

মাছের তৈলাক্ত ত্বকে, চর্বিতে ও লাল বা হলুদ বা ধুসর বর্ণের পেশী ( Dark muscle) তে, সাধারণত বেশি পরিমাণ জিওসমিন ও MIB জমে থাকে। সে জন্যই মূলত অন্য মাছের চেয়ে পাঙ্গাশ মাছ বেশি গন্ধ করে।

পাঙ্গাস মাছের গন্ধ দূরিকরণে , চাষবাদ পর্যায়ে চাষির করণীয়: ১) চাষের পুকুরে পরিমিত পরিমাণ খাদ্য দিতে হবে। প্রয়োজনের অধিক খাদ্যই, পানিতে গন্ধ সৃষ্টিকারী অনুজীব উৎপন্ন করে। ২) পুকুর বা জলাশয়ের অগভীর অংশে খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে।

৩) সবুজ প্লাংক্টন ও প্রাকৃতিক খাদ্য বেশি হলে সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে। বদ্ধ পানিতে পাঙ্গাশ মাছ সর্বভুক হয়। এসময় পাঙ্গাশ মাছ প্রাকৃতিক খাদ্যও খেয়ে থাকে। ৪) পানির গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

৫)মাছচাষের পুকুর বা জলাশয়ে প্রোবায়োটিক হিসেবে ব্যাসিলাস সিরিয়াস (Bacillus cereus) ব্যাকটেরিয়া নিয়মিত প্রয়োগ করতে হবে। এতে জলাশয়ের এক্টিনোমাইসিটিস জৈবিকভাবে দমন হবে। তাতে চাষকৃত পাঙ্গাশ মাছের পুকুরের পানি ও মাছের গন্ধ থাকবে না।

৬) চাষের জলাশয়ের পানি, প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে। এতে মাছের বৃদ্ধি ভালো হবে, মাছ বড় হবে এবং গন্ধ হবে না।

৭) পানি বেশি সবুজ হলে মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে তুঁতে (CuSo4 , 2 H2O) প্রয়োগ করা যেতে পারে। তুঁতে প্রয়োগে পুকুর বা জলাশয়ে অক্সিজেন স্বল্পতা দেখা দিতে পারে, এজন্য সতর্ক থাকতে হবে।

৮) প্রয়োজনে তলদেশের খাদ্য গ্রহণ করে ( Bottom feeding) এমন প্রজাতির , মাছ ছেড়ে পানির ঘোলাত্ব বাড়িয়ে, সবুজ প্লাংক্টন নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। তবে লাভজনকভাবে , পাঙ্গাশ মাছচাষ পদ্ধতিতে, এটি তেমন ফলপ্রসূ নয়।

পাঙ্গাশ মাছ বাজারজাত করণের পূর্বে চাষির করণীয়: ১) বাজারজাত করার পূর্বে মাছের গন্ধ আছে কি না তা পরীক্ষা করতে হবে।

পরীক্ষা: পুকুর বা জলাশয় থেকে একটি মাছ নিয়ে, ড্রেসিং করে, নাড়ীভুঁড়ি ও মাথা আলাদা করতে হবে।

কোন রকম মসল্লা না দিয়ে ত্বকসহ মাছকে, এলুমিনিয়ামের ফোয়েল পেপার দিয়ে মুড়িয়ে ২০০-২৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ৫ ( পাঁচ) মিনিট সিদ্ধ বা রান্না করতে হবে। এ ওভেন, ভিতরের উপাদানগুলোর ভাইব্রেশনের মাধ্যমে তাপের সৃষ্টি করে। এটিই এক্ষেত্রে উত্তম।

পাঁচ মিনিট পর ওভেন থেকে বের করে, সিদ্ধ করা মাছ, নাকের নিকট ধরলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে মাছে গন্ধ আছে কি না।

জিওসমিন ও MIB এর গলনাঙ্ক ২৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। গলনাঙ্কের কাছাকাছি তাপমাত্রায় সিদ্ধ বা রান্না করার কারণে, জিওসমিন ও MIB গলে মাছ থেকে বের হয়ে আসে এবং ফোয়েল পেপার খুললেই মানুষের নাকে, এর গন্ধ সহজেই ধরা পরে।

গলে যাওয়ার কারণে জিওসমিন ও MIB এর গন্ধের কোন পরিবর্তন হয় না। উল্লেখ্য নির্দিষ্ট একটি জলাশয়ের একটি মাছ পরীক্ষা করার অর্থ, ঐ নির্দিষ্ট জলাশয় বা খামারের সমস্ত মাছ পরীক্ষা করা বুঝাবে।

২) টেষ্টে গন্ধ পাওয়া না গেলে ১০০% নিশ্চয়তা দিয়ে এই পুকুর বা খামারের সমস্ত মাছ বাজারজাত করা যাবে। এতদবিষয়ে প্রয়োজনে স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তার প্রত্যয়ন নেয়া যেতে পারে।

৩) টেষ্টে গন্ধ পাওয়া গেলে, এ মাছগুলোকে সরিয়ে নিয়ে পরিস্কার বা স্বচ্ছ পানির অন্য পুকুরে ৫-১৫ দিনের জন্য মজুদ করতে হবে। এসময় এ জলাশয়ে প্রতিদিন পরিমিত পরিমানে খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে, যাতে মাছের ওজন কমে না যায়।

এ পুকুরে প্রতিদিন ১/২ বার স্বচ্ছ পানির প্রবাহ দিলে এবং তাপমাত্রা বেশি থাকলে, ৭/৮ দিনের মধ্যেই মাছ গন্ধমুক্ত হবে। এরপর ১০০% গন্ধমুক্ত মাছ, এ নিশ্চয়তা দিয়ে সমস্ত মাছ বাজারজাত করা যাবে।

সন্দেহ থাকলে টেষ্ট করে নিশ্চিত হয়ে নতুবা আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করে, তারপর মাছ বাজারজাত করা যাবে।

৪) চাষকালীন সময়ে পুকুর বা জলাশয়ের পানি মাঝে মাঝে পরিবর্তন করা হলে সে পুকুর বা জলাশয়ের মাছে গন্ধ থাকবে না। এসব মাছ ১০০% গন্ধমুক্ত, এমন নিশ্চয়তা দিয়ে বাজারজাত করা যাবে। এক্ষেত্রে কোন পরীক্ষার প্রয়োজন হবে না।

আড়তদার খুচরা বিক্রেতার করণীয়: চাষি অথবা খামারের মালিকের নিকট থেকে ১০০% গন্ধমুক্ত মাছ ক্রয় করবেন। পরে ১০০% গন্ধমুক্ত পাঙ্গাশ মাছ, এ সংক্রান্ত একটি ব্যানার টানিয়ে তা বিক্রয় করবেন।

ক্রেতার করণীয়: ১) ১০০% নিশ্চয়তা নিয়ে, বাজার থেকে মাছ ক্রয় করে বাসায় নিয়ে আসবেন।

২) গন্ধমুক্ত মাছের নিশ্চয়তা পাওয়া না গেলে, সেক্ষেত্রে ১.৫ কেজি বা তার চেয়ে বেশি ওজনের পাঙ্গাশ মাছ ক্রয় করে বাসায় নিয়ে আসবেন। পানির গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করে মাছ বড় করা হয় বিধায় গন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

৩) বড় মাছ বা নিশ্চিত গন্ধমুক্ত মাছ পাওয়া না গেলে , যে কোন ধরনের পাঙ্গাশ মাছ ক্রয় করে বাসায় নিয়ে আসতে পারবেন।

রাধুনীর করণীয়: ১) নিশ্চিত গন্ধমুক্ত মাছ হলে, নিজের ইচ্ছেমতো পদ্ধতিতে তা রান্না করতে পারবেন।

২) মাছে গন্ধ থাকতে পারে এমন মনে হলে, মাছগুলো কেটে ধুইয়ে নিতে হবে। এরপর মাছগুলো ভিনেগার অথবা সিরকা দিয়ে ১/২ ঘন্টা মাখিয়ে রাখবেন।

এরপর মাছ ধুইয়ে সেই মাছগুলো ইচ্ছেমতো পদ্ধতিতে রান্না করতে পারবেন। ভিনেগার বা সিরকার বিকল্প হিসেবে লেবু অথবা টক দইও ব্যবহার করা যাবে। জিওসমিন ও MIB এর গাঠনিক সংকেত এসিডের প্রভাবে ভেঙ্গে যায়, তখন আর এদের গন্ধ থাকে না।

সকলের জন্য সতর্কতা: সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা না গেলে, আধা নিবিড় ও নিবিড় চাষ পদ্ধতি অত্যন্ত বিপদজনক। এই উন্নত পদ্ধতিই, উৎপাদনের ক্ষেত্রে, বিশ্বে আমাদের দেশীয় বর্তমান অবস্থান, নিচে নামিয়ে দিতে পারে।

তাই পাঙ্গাশসহ সকল প্রজাতির মাছচাষের প্রযুক্তিভিত্তিক আলাদা আলাদা প্রটোকল তৈরি করে, খামারিসহ সকলকে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে মৎস্য কর্মকর্তাগণের সহায়তা নিতে হবে।

পাঙ্গাশ মাছের গন্ধের কারণ ও তা দূর করার কৌশল শিরোনামের লেখাটির লেখক মোঃ আব্দুস ছালাম প্রাং, সহকারী পরিচালক, মৎস্য প্রশিক্ষণ একাডেমি, সাভার, ঢাকা।