
নিজস্ব প্রতিবেদক, এগ্রিকেয়ার২৪.কম: বাংলাদেশে গরু পালন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কোরবানিতে বিক্রির উদ্যেশ্যে গরু মোটাতাজাকরণ খামারের সংখ্যা হটাৎ বেড়ে যায়। ৩ মাসের প্রজেক্ট হাতে নিয়ে মোটা অংকের লাভ হওয়ায় অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করে থাকেন। তবে, কোরবানিতে বিক্রির জন্য গরু পালনের যেসব কৌশল তা অনেকেই জানেন না। জানলে লাভবান হওয়ার বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়।
বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসেবে মতে বাংলাদেশে এখন প্রায় সাত লাখের বেশি খামার রয়েছে। গত পাঁচ বছরে তার অর্ধেক থেকে দ্বিগুণ বেড়েছে। এসব খামারে মূলত গরু লালন-পালন করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে , কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে পেশা হিসেবে গরুর খামার তৈরি করাকে বেছে নিয়েছে। তারা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।
পড়তে পারেন: চাকরি ছেড়ে গরুর খামারি, মাসিক আয় দেড় লাখ টাকা
কোরবানির ঈদ উপলক্ষ্যে যেসব গরু লালন-পালন করা হয় সেগুলোর মূল গন্তব্য থাকে ঈদ-উল-আযহার পশুর বাজার। গবাদি পশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরু মাংস উৎপাদনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনেক খামারি পর্যায়ে নেই। বিজ্ঞানসম্মতভাবে গরু মোটাতাজা করলে বিনিয়োগে ভালো ফল পাওয়া যায় এবং গরুর মাংস উৎপাদন অনেকাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব।
পশু ক্রয় এবং নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোন ধরণের পশু কিনলে নিশ্চিত হওয়া যায় এ পশু মোটাতাজাকরণের মাধ্যমে লাভবান হওয়া যাবে। এ ধরণের পশু চেনার কয়েকটি উপায় আছে। যে ধরণের পশু কিনলে লাভ হবে শতভাগ, কীভাবে চিনবেন! সে বিষয়ে জানিয়েছেন এফ.ডি.আই.এল. মানিকগঞ্জের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এম এ সবুর।
ডা. সবুর বলেন, পশু ক্রয়ের ক্ষেত্রে পশুর বয়স ২-৩ বছরের মধ্যে হলে সহজে মোটাতাজা করা যায়। বয়স্ক গরু মোটাতাজাকরণের জন্য খুব বেশি উপযোগী নয়। গরু সাধারণত ষাড় হওয়া ভালো। ষাড় গরুর মাংসের মূল্য এবং চাহিদা বেশি।
পড়তে পারেন: ব্রোডি গেমের ২টি থেকে ৩০০টি গরুর খামার যেখাবে
গরু নির্বাচনের সময় খেয়াল রাখবেন প্রাণীটির দেহের কাঠামো যেন একটু বড় হয়।
যেমন লম্বা এবং উচ্চতা এ দুটো বিষয়ই খেয়াল রাখতে হয়।
বড় আকারের একটি কংকালসার গরুর গায়ে বেশ মাংস উৎপন্ন করা যায়।
প্রাণী ক্রয়ের সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন প্রাণীটির বাহ্যত কোনো সংক্রামক রোগ আছে কি নেই।
এ ক্ষেত্রে আমরা মূলত লক্ষ করতে বলি ‘ক্ষুরারোগ’ আছে কি নেই। কারণ ক্ষুরারোগ প্রাণীর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ এ কারণে যে অল্প বয়স্ক রুগ্ন পশুতে ক্ষুরারোগ থাকলে তা পশুর মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। সুতরাং তাপ দেখবেন, ক্ষুরার ক্ষত দেখবেন, প্রাণীটি অস্থির কিনা তা দেখবেন, চোখ লাল এবং ছলছল করছে কিনা সেটাও দেখবেন।
যদি এসব লক্ষণ দেখেন তবে বুঝবেন প্রাণীটির ক্ষুরারোগ থাকতে পারে। এরপর পশু পাতলা পায়খানা করছে, রক্ত আমাশয় আছে, পশু হাড্ডি কংকালসার এসব যতো সমস্যাই থাক এগুলো সবকিছু নিরাময় করে মোটাতাজাকরণকে লাভজনক করা যায়। মোটাতাজাকরণ কার্যক্রমটি একজন ভেটেরিনারি ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে করবেন। তিনি এসব সামান্য রোগব্যাধি নিরাময়ের ব্যবস্থা নেবেন।
পড়তে পারেন: গরু মোটাতাজাকরণ: বাস্তবতা ও করণীয়
পশু ক্রয় করার পর তার গোবর পরীক্ষা করান। দেখা যাবে সেখানে প্রচুর কৃমির ডিম পাওয়া যাবে, এছাড়া পশুটি লম্বা সময় পুষ্টিহীনতার কারণে তার পরিপাকতন্ত্রের কার্যক্রম দুর্বল থাকতে পারে। দীর্ঘদিন পশু অপুষ্টিতে ভুগলে তার ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়।
কৃষক ভাইদের প্রাথমিক ধারণা থাকার জন্য বলছি ভেটেরিনারি ডাক্তার সাধারণত কী কী করেন।
১. তিনি মল পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে কৃমির ওষুধ দেন;
২. পেটে কোনো জীবাণু সংক্রামণ থাকলে সেখানে শুধু পেটে অথবা পরিপাকতন্ত্রে কাজ করে এমন অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করেন। এতে পাতলা পায়খানা চলে যায়;
৩. যদি আমাশয় থাকে, সেক্ষেত্রে মেট্রোনিডাজল গ্রুপের যে কোনো ভালো ওষুধ দিয়ে তা দূর করেন। খাদ্য হজমটি ভালোভাবে হলে প্রাণীর স্বাস্থ্য ভালো হতে বাধ্য।
পড়তে পারেন: গরু মোটাতাজা করণে যেসব খাবার দিবেন
সবাইকে মনে রাখতে হবে গবাদিপশু মোটাতাজা করতে ৪-৫ মাস সময় লাগে। হঠাৎ করে স্টেরয়েড খাইয়ে গরু মোটাতাজা করা যায়। তবে কাজটি অনৈতিক, নিষিদ্ধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। স্টেরয়েডের ব্যবহারের কারণে খামারেই গরুর মৃত্যু ঘটে এমন নজির প্রচুর আছে। কারণ স্টেরয়েড প্রাণীর স্বাভাবিক মেটাবলিজমকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংগ যেমন লিভার, লাং, হৃদপি- এসব স্বাভাবিক নিয়মে কাজ করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্টেরয়েড খাওয়ানো গরু হাইপারটেনশনে বেশি মারা যায়।
এ ছাড়া স্টেরয়েড মানব দেহের জন্যও যথেষ্ট ক্ষতিকর। সুতরাং মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ার কোথাও স্টেরয়েডের প্রয়োজন হয় না। যদি তা স্বাভাবিক সময় এবং নিয়ম জেনে করা হয়। তবে মোটাতাজাকরণের সময় চিকিৎসকরা সহনীয় মাত্রায় ভিটামিন, মিনারেল ব্যবহার করেন। যা প্রাণীর জন্যও ক্ষতিকর নয়, মানুষের জন্যও ক্ষতিকর নয়। এ হচ্ছে সাধারণ রোগব্যাধির প্রতিকার। সংক্রামক রোগ আছে এমন প্রাণী ক্রয় করা যাবে না। দ্বিতীয়ত প্রাণী ক্রয়ের পর পর ক্ষুরা, তড়কা এবং গলাফুলা রোগের টিকা দেয়া বাঞ্ছনীয়।
পড়তে পারেন: গরু মোটাতাজাকরণে আধুনিক কৌশল
গরু মোটাতাজাকরণ খামার মূলত কয়েক ধরণের বা মেয়াদের হয়ে থাকে। সেসব খামারের মেয়াদ সাধারণত তিন মাস, চার মাস, ছয় মাস কিংবা এক বছরের জন্য গড়ে তোলেন। চাষি পর্যায়ের খামারিরা বছরে তিন থেকে চারবার গরু কেনা বেচা করেন।
বাংলাদেশ প্রানি সম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পারভীন মোস্তারী গণমাধ্যমকে বলেন, গরু মোটাতাজা করা এক ধরণের প্রযুক্তি এবং এটি বিজ্ঞানসম্মত। নির্দিষ্ট বয়সের কিছু গরুকে যদি নির্দিষ্ট কিছু খাবার দেয়া হয় তাহলে গরুগুলো দ্রুত মোটাতাজা হয়।
এই কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, গরু পালনের চারটি ধাপ রয়েছে। গরু নির্বাচন, কৃমিমুক্তকরণ, খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং বাজারজাতকরণ। সাধারণত গরু মোটাতাজা করার জন্য দুই হতে পাঁচ বছরের গরু নির্বাচন করা হয়। গরু সংগ্রহ করার দেড় থেকে দুইমাস পরে উন্নত পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করা হয়। গরু মোটাতাজা করার জন্য যেসব খাবার দেয়া হয় তার মধ্যে রয়েছে আঁশ জাতীয়, দানাদার মিশ্রন এবং সবুজ ঘাসভিত্তিক খাদ্য ফর্মূলা।
পড়তে পারেন: গরু মোটাতাজাকরণ ও ছাগল, ভেড়া, গাভী পালনে মিলবে কৃষি ঋণ
বাংলাদেশে যেসব জেলায় বেশি গরুর খামার রয়েছে তার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুষ্টিয়া জেলা অন্যতম। জেলা পানিসম্পদ অফিসের হিসেব অনুযায়ী কুষ্টিয়া জেলায় গরুর খামার আছে ১০ হাজার এবং ছাগলের খামার আট হাজার।
কুষ্টিয়া জেলা পানিসম্পদ কর্মকর্তা মো. সিদ্দিকুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, যারা খামার করে কিংবা করতে আগ্রহী তাদের প্রশিক্ষণ দেয় পানিসম্পদ অধিদপ্তর। গরু মোটা তাজাকরার জন্য আমরা কিছু টেকনিক্যাল পরামর্শ দিয়ে থাকি। গরু যাতে মারা না যায়। খামার করার আগে কিছু প্রাথমিক ধারণা নিতে হবে। একেবারে না জেনে করলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গরু মোটাতাজারকরণ খামার করতে গেলে সর্বপ্রথম খামারের অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে সেজন্য গবাদি পশুর জন্য ঘর নির্মাণ পদ্ধতি – যেমন উচ্চতা কতটুকু হবে, ঘরের মেঝে কেমন হবে, খাবার পাত্র কেমন হবে, পানির পাত্র কেমন হবে এগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। এছাড়া কী ধরণের গরু ক্রয় করা যায় এবং তাদের কী ধরণের খাবার দেয়া হবে – এগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে নিয়মিত পরামর্শ নিতে হবে।
এগ্রিকেয়ার/এমএইচ
























